Share |

বন্ধুর বিদায়

সারওয়ার কবির
শাহাব উদ্দিন আহমদ বেলাল সাবেক কাউন্সিলার, সাংবাদিক, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। তিনি আমাদের আপনজন, আড্ডার সাথী, আত্মার আত্মীয়, বিপদের বন্ধু।
গত শুক্রবার, ২৬ জানুয়ারি মাত্র ৭৩ বছর বয়সে তিনি পরপারে পাড়ি জমান। আমাদের সাথে তাঁর বয়সের পার্থক্য থাকলেও ছিলেন তিনি বন্ধুর মতো। তাঁর প্রত্যেকটি আচরণ মনে হতো কোন বন্ধুর আদেশ, উপদেশ অথবা পরামর্শ। কখনও তিনি আমাদের বড় ভাইয়ের ভূমিকায় থাকতেন আবার কখনও পেয়েছি তাঁর কাছ থেকে পিতার স্নেহ। 
বেলাল ভাই যুক্তরাজ্য যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ৮০র দশকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮১ সালে লন্ডনে জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রথম রাজনৈতিক সমাবেশ সফল করতে তাঁর ভূমিকা ছিলো অনন্য। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের একজন কাউন্সিলার হিসেবেও ৮০র দশকে কমউনিটির উন্নয়নে তাঁর নানা কার্যক্রম প্রশংসার দাবিদার।
২০০৮ সালের অক্টোবর মাসের কোন এক সোমবার তাঁর সাথে আমার পরিচয় কর্মস্থল সাপ্তাহিক পত্রিকা অফিসে। সফেদ পাজামা-পাঞ্জাবী পরা এক ভদ্রলোক সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদক এমদাদুল হক চৌধুরীর সাথে কথা বলছেন। পরিচয়ের প্রথম দিনেই তিনি আমার ফোন নাম্বার চেয়ে নিলেন। সেসময় প্রতিদিনই তাঁর আসা যাওয়া ছিলো পত্রিকা অফিসে। আড্ডা, হই-হুল্লোড় আর গল্পে গল্পে কাটতো আমাদের সময়। বেলাল ভাই আসছেন, যাচ্ছেন তাঁর কোন সময় নির্দিষ্ট নাই। রাত নেই, দিন নেই তিনি আসছেন, যাচ্ছেন। 
পত্রিকা অফিসের সবচেয়ে মধ্যখানের চেয়ারটি ছিলো তাঁর দখলে। এই চেয়ারটি বেলাল ভাইয়ের চেয়ার। টেবিলে ল্যাপটপ রেখেই কি যেনো লিখছেন তিনি। খুব ব্যস্ত, বেলাল ভাই। হঠাৎ করে বলে উঠলেন আমার চা কই? এক ঘন্টা হয়ে গেলো কেউ আমাকে চা দিলো না। আমি আর পত্রিকা অফিসে আসবো না, ঠিক তখনই বেলাল ভাইয়ের চা আসতো। বেলাল ভাই মাঝখানে একবার ফেইসবুকে সংবাদপত্রের পাতা বানিয়ে নিউজ আপলোড করা শুরু করলেন। তো আমরা বুদ্ধি দিলাম তিনি যেনো একটি অনলাইন পোর্টাল খুলে ফেলেন। বেলাল ভাই এইবার মনস্থির করলেন তিনি অনলাইন সংবাদ খুলবেন। তো তাঁর ওয়েবসাইট বানানোর দায়িত্ব দিলেন বাংলাদেশে কাউকে। এজন্য নাকি তাঁর দেশে যেতে হবে। আমরা তো হেসে অস্তির। এইটার জন্য দেশে কেনো যাবেন তিনি। বললেন, তোমরা বুঝবে না। সত্যিই তিনি এই ওয়েবসাইটের জন্য দেশে গেলেন। দেশ থেকে আসার পর তাঁর প্রবাসে বাংলাদেশ ওয়েবসাইটটি চালু করলেন। 
তার সাথে অনেক স্মৃতি। কোনটা রেখে কোনটা বলি। মাঝে মাঝে রাত ২টা, ৩টার দিকে বেলাল ভাইয়ের ফোন পেতাম। বেলাল ভাই কি খবর? উত্তর আসতো তোমার ওয়ালে একটি নিউজ আপলোড করেছি দেখোতো ঠিক আছে কি-না? রাত ৩টায় এমন খবর দেওয়ার জন্য কি বেলাল ভাইয়ের ফোন? মাঝে মাঝে বিরক্ত হতাম, যে বেলাল ভাই কি আর সময় পান না ফোন করার। আবার উপভোগও করতাম তার এমন শিশুসুলভ আচরণ দেখে। 
একবার বৈশাখি মেলার আগেরদিন তিনি মেলা প্রাঙ্গন ভিজিট করবেন। অফিসে বিকেল থেকেই হইচই শুরু হয়ে গেছে, বেলাল ভাই মেলায় যাবেন। তো তাঁর সঙ্গী হতে হবে আমাকে এবং পারভেজকে। আমরা দুজনেই যাবো বলে ঠিক করলাম। হঠাৎ করে যাবার সময় পারভেজ কোন একটি কাজে ব্যস্ত থাকায় যেতে পারলো না। বেলাল ভাই মেলা প্রাঙ্গণে যাওয়ার আগেই কিছু কলা, চিপস এবং সফট ড্রিংকস কিনলেন। গাড়ি থেকে নেমেই কলা এবং চিপস হাতে নিয়ে বললেন আমার কিছু ছবি উঠিয়ে পারভেজের কাছে পাঠিয়ে দাও, যাতে সে জেলাস ফিল করে। যেই কথা সেই কাজ। সাথে সাথে পারভেজের ফোন, মেলায় তো এখনও কোন স্টল নেই, তোমরা এগুলো পেলে কোথায়। বেলাল ভাই হেসে অস্থির। দেখেছো, আমি জানতাম পারভেজ ফোন করবেই। বেলাল ভাই মাঝে মাঝে এমন করতেন।
 তাঁর সাথে কত স্মৃতি, তবে তাঁর স্নেহ পেয়েছি খুব বেশি। আমাদের প্রতি ছিলো তাঁর অগাধ ভালোবাসা আর বিশ্বাস। জনমতের সাইম চৌধুরী, ইমরান, অপু রায় আর ব্রিটবাংলার আহাদ চৌধুরী বাবু এরা প্রত্যেকই যেনো ছিলো তাঁর সন্তানের মতো। রাত-বিরাতে তাঁর ফোন পেলেই বুঝতাম বেলাল ভাই হয়তো কোন নিউজ আপলোড করেছেন।
গত বছর, ২০১৭ সালের ২৭ মার্চ যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগে বৃটিশ পার্লামেন্টে বৃটেনের প্রায় ৬০ জন এমপিকে নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করে। বিভিন্ন জায়গায় নিউজ ছাপা হলেও কোন কারণে বেলাল ভাইর চোখে পড়েনি অথবা পাননি। রাত্রে আমাকে ফোন দিলে আমি রিসিভ করতে পারেনি। পরদিন অফিসে এসে দেখি, বেলাল ভাই আমার আগেই হাজির। দেখি বেলাল ভাই খুব মুডে আছেন। আমার উপর শুরু হলো ঝড়। আমি কেনো তাঁকে নিউজ না দিয়ে অন্য জায়গায় আগে পাঠালাম। এখন পর্যন্ত তিনি কেনো নিউজ পেলেন না ইত্যাদি। সবশেষে বললেন, তোমার আর আওয়ামী লীগ করা লাগবে না, যারা সময়মতো কাজ করতে পারেনা তারা কেনো আওয়ামী লীগ করবে। সন্ধ্যার দিকে ফোন বেলাল ভাইর, তুমি কোথায়? বাসার নিচে চেয়ে দেখি বেলাল ভাই গাড়ি নিয়ে। বললেন ব্রিকলেন যাবো চানা-পেয়াজু খেতে। ব্রিকলেনে গিয়ে চানা, পেয়াজুর পর এমন ভাব নিলেন যেনো সকালে তাঁর সাথে তাঁর দেখাই হয়নি। এই হচ্ছেন বেলাল ভাই। 
একবার শবেবরাতের আগেরদিন কি নিয়ে কথা হচ্ছিলো। আমি বলছিলাম তোসা শিরনি (হালুয়া) ছাড়া শবেবরাত তো কল্পনাই করা যায় না। শবেবরাতের সন্ধ্যায় বেলাল ভাইয়ের ফোন। দেখি বেলাল ভাই গাড়ি নিয়ে নিচে। নিচে নামতেই আমার হাতে ছোট্ট একটি ব্যাগে তোসা শিরনি দিয়ে বললেন, এই নেও তোমার তোসা শিরনি। তাঁর এ স্নেহ, মায়া-মমতা ভুলবার নয়। 
২০১৭ সালের পর থেকে তিনি খুব একটা ঘর থেকে বেরুতেন না। খুব কম তাঁকে আমরা পেয়েছি গত একবছর। তারপরও মাঝে মাঝে হাসপাতালে গেলে আমরা তাঁকে দেখতে যেতাম। আমাদের একধরনের রুটিন ওয়ার্ক ছিলো এটা। তবে এভাবে তিনি চলে যাবেন, সত্যি বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। ক্রিসমাস ডে তে বেলাল ভাইকে ফোন করলাম যে অফিসে চলে আসেন আমরা সবাই মিলে আপনাকে নিয়ে আড্ডা দেবো। বললেন, শরীর ভালো নেই। গত ৩ জানুয়ারি তাঁর ফোন- আমি হাসপাতালে আমাকে এখনও তুমি দেখতে আসোনি কেনো? আমি বললাম, বেলাল ভাই আমি জানিনা আপনি যে হাসপাতালে। সাথে সাথেই আমার দুই বন্ধুসহ হাসপাতালে চলে গেলোম। দেখলাম তাঁর চুল বড় হয়ে গেছে। চুল কাটানোর কথা বললাম, তিনি বললেন, কোন সেলুন থেকে কাউকে নিয়ে আসতে পারো কি-না দেখো। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করে পরদিন যেনো দুপুর ১টার মধ্যে কাউকে নিয়ে যাই এমনটি কথা হলো। 
পরদিন হোয়াইটচ্যাপেলে দুই-তিনটি সেলুনে গিয়ে কাউকেই হাসপাতালে নিতে পারলাম না। তাদের কারোও নাকি বাইরে গিয়ে চুল কাটবার অনুমতি নেই। কেউ যাবেন না। পরিচিত একটি সেলুনের চুল কাটার মেশিন আর কাপড় নিয়ে আমি নিজেই কাটবার সিদ্ধান্ত নিলাম। বেলাল ভাইকে জানাতেই বললেন, আজকে শরীর আরেকটু খারাপ আজ না আরেকটু সুস্থ হই। যতদিন যায় বেলাল ভাইর শরীর আরো খারাপের দিকে যায়। চুল তো আর কাটানো যায় না। শেষ পর্যন্ত চুল আর কাটানো হলো না তাঁর। 
২০১৬ সালে বাংলাদেশে গেছি। সপ্তাহ খানেক পর শুনি বেলাল ভাই দেশে। ফোন করে বললেন, তিনি টুঙ্গিপাড়ায় যাবেন বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারতে। ঢাকায় নজরুল ইসলাম খান (সাবেক শিক্ষা সচিব) তাঁর জন্য সব প্রস্তুত করে রেখেছেন। ঢাকা থেকে তিনি যেতে পারবেন। আমি যেনো তাঁর সাথে যাই। আমি বললাম, বেলাল ভাই আমি ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে টুঙ্গিপাড়া থেকে ঘুরে এসেছি। আপনি আগামী সপ্তাহে তারিখ ঠিক করেন, আমি যেতে পারবো। সকালেই বললেন, আমি ঢাকা আসছি, তুমি আমার সাথে দেখা করো। বিকেলে সানু ভাইয়ের ফোন, সারওয়ার বেলাল ভাই ঢাকায় আসার কথা ছিলো কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করছেন না। পড়লাম ঝামেলায়। সন্ধ্যার দিকে একজন জানালেন তিনি বেলাল ভাইকে দেখেছেন ঢাকায়, বেইলি রোডে তিনি হাঁটছেন। রাতে আবার তাঁর ফোন, তিনি নাকি ফোন বাসায় রেখে বেরিয়ে পড়েছিলেন। পরদিন জরুরী কাজে আমাকে সিলেট যেতে হলো। বেলাল ভাইয়ের সাথে ঢাকায় দেখা হলো না। তিনি সানু ভাইকে নিয়ে টুঙ্গিপাড়ায় গেলেন। তাঁর সাথে আমার যাওয়া হলো না। সিলেটে তিনি আসলেন, ভাবলাম তাঁর সাথে দেখা করবো। ফোন দিলেই বললেন, আমিতো বিয়ানীবাজারে।
 ২৫শে মার্চ রাত্রে ১১টার দিকে ফোন। সারওয়ার, তুমি কোথায়? আমরা যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাব। আমি তখন আমার গ্রামে সিলেট শহর থেকে অনেক দূরে কানাইঘাটে। বেলাল ভাই চলে আসলেন পরের সপ্তাহে। দেশে তাঁর সাথে আমার দেখা হলো না।  বাংলাদেশে তাঁর সাথে আমার কোনদিন দেখা হয় নাই। অর্থাৎ দেশে তাঁর সাথে আমার কোন স্মৃতি নাই। 
    তাঁর চলে যাওয়ার পর থেকে তাঁকে মিস করছি খুব। স্বজন, সাথী, শুভার্থীরা তাঁর জন্য কাঁদছেন। একজন বড় ভাই, একজন বন্ধু, একজন অভিভাবককে হারালাম। তাঁর মৃত্যু আমাদের কাঁদিয়েছে বেশ। এমন বন্ধু অভিভাবক হারিয়ে বিষাদময় দিন কাটছে। তাঁর স্মৃতি ভুলবার নয়, ভুলবার নয় তাঁর স্নেহ। তাঁর বিদায় আমাদের জন্য বেদনার। 
লেখক : সাংবাদিক, সাপ্তাহিক পত্রিকা।