Share |

বেলাল ভাইকে ভোলা অসম্ভব

তবারুকুল ইসলাম
বিপদেই নাকি বন্ধুর পরিচয় মেলে। কিন্তু বেলাল ভাইয়ের সাথে সম্পর্কের শুরুটাই হয়েছে আমার এক দুঃসময়ে। বয়সের পার্থক্যটা বিশাল। ছিলেন অভিভাবকতূল্য। কিন্তু তাঁর সঙ্গে এতটাই আন্তরিক সম্পর্ক ছিল যে তাঁকে বন্ধু না বললে যেন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালবাসাটা ঠিকমত প্রকাশিত হয় না। তাঁর সঙ্গে যতটা আড্ডা দিয়েছি, যতটা সুখ-দুঃখ শেয়ার করেছি- লন্ডনে আমার সমবয়সী অন্য বন্ধুদের সাথেও ততটা করা হয়নি।
অথচ বেলাল ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয় ২০১৩ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে। সে হিসাবে কেবল ৪ বছরের জানাশোনা। এত অল্প সময়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন।
২০১৩ সালের ঘটনা। এক নাটকীয় ঘটনায় লন্ডনের একটি বাংলা পত্রিকা থেকে আমার চাকরি গেল। আমি ছিলাম ঘটনার শিকার। বিষয়টি বাংলা গণমাধ্যম পাড়ায় বেশ আলোচিত ছিল। সাপ্তাহিক পত্রিকা অফিসে বেলাল ভাই ওইসব শুনে আমার জন্য কিছু করতে বিচলিত হয়ে পড়লেন। তাঁর ওইদিনের একটি কথা আমার এখনো বেশ কানে বাজে। তিনি বলেছিলেন- সিলেটি হইলে তো আত“ীয়-স্বজন কারও কাছে গিয়ে এক বেলা খেয়ে আসতে পারতি। কিন্তু তোর তো কেউ নাই। বললেন, তুই তো একা মানুষ আমার বাসায় খাবি।  
তাঁর প্রস্তাবে আমি রাজি হলাম না। বললাম, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আমার আছে। পারলে চাকরির ব্যবস্থা করেন।   
ওইদিন বেলাল ভাইয়ের আন্তরিকতা দেখে আমি সত্যিই অবাক হয়েছিলাম। সেই থেকে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি বেড়ে যায় বহুগুনে।  
কিছুদিন পর জনমতে কাজ শুরু করলাম। পাশপাশি যোগ দিলাম সাপ্তাহিক পত্রিকায়। এই দুই পত্রিকা অফিসেই ছিল বেলাল ভাইয়ের নিত্য যাতায়াত। ধীরে ধীরে তাঁর সঙ্গে হৃদ্যতার ব্যপ্তি আরও গভীর হলো। কেবল অফিসের আড্ডায় নয়, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও বেলাল ভাইকে নিয়ে দলবেঁধে যেতাম।  
তাঁর উপস্থিতি যে কোনো আয়োজনকে জাগিয়ে তুলতো। অলস সময়কে করে তুলতো প্রাণচঞ্চল।
 প্রাণের উচ্ছাসে ভরপুর এই লোকটাকে দেখে বিন্দুমাত্র অনুমান করা যেত না যে জটিল সব ব্যাধি তিনি শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন। বিগত প্রায় ২৭ বছর ধরে তিনি রোগে আক্রান্ত। হাসপাতালে তাঁর নিত্য আসা-যাওয়া। গত কয়েক বছর তাঁকে প্রায়ই হাসপাতালে থাকতে হতো।  
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেই তিনি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন আড্ডায়। নিজের নানা ব্যধিকে উপেক্ষা করে ঝাঁপিয়ে পড়তেন অন্যের যে কোনো প্রয়োজনে।
প্রচণ্ড প্রাণশুক্তিতে ভরপুর বেলাল ভাই রীতিমত জীবন নিয়ে খেলেছেন। হাসপাতালের বেড়ে শুয়ে তিনি রোগ নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেই মহা উদ্যমে দাপিয়ে বেড়াতেন সবকিছু। বলতেন, মনের জোরটাই আসল।  
বেলাল ভাইয়ের মত এতটা মানবিক লোক বিরল। তাঁকে ভোলা আমার পক্ষে অসম্ভব। ওপারে ভাল থাকুন বেলাল ভাই- প্রাণভরে এই দোয়া করছি।  
লেখক : রিপোর্টার, সাপ্তাহিক পত্রিকা