Share |

‘হেই একটা পত্রিকা দেও’

শাহ শামীম আহমেদ
সাপ্তাহিক পত্রিকা অফিসে কাজ করতে গিয়ে যে আড্ডার পরিবেশ পেতাম সেটা শাহাব উদ্দিন আহমদ বেলাল ছাড়া পরিপূর্ণতা পেতো না। কাজে একগেয়েমি বা অলস সময় যাচ্ছে না, বেলাল ভাইকে ফোন করে নিয়ে আসো। সহজ কথায় তো আসবেন না,সারওয়ার কবির ফোন করে বলতে অভ্যস্ত ছিল কিভাবে তাকে আনতে হবে। কিংবা আমরা পত্রিকার ডেটলাইনের কাজ নিয়ে ব্যস্ত তিনি এসে হাজির,তাঁর ‘প্রবাসে বাংলাদেশ’ অনলাইনের নিউজের জরুরী কাজ করে দিতে হবে।যেমন মাতিয়ে রাখতেন তেমন জ্বালাতনও করতেন।
এই নিয়মিত আড্ডার মানুষ,বড়ভাই কিন্তু বন্ধু, তিনি আর নেই। গত ২৬ জানুয়ারি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। সবাই জানতো, বা ভাবতো সাপ্তাহিক পত্রিকা অফিস তাঁর অফিস। সাপ্তাহিক জনমত অফিসেও ডেডলাইনের দিনে প্রতি বুধবার তিনি থাকবেন।দিনরাত আড্ডা দিতেন,সেই সঙ্গে তাঁর সম্পাদিত ‘প্রবাসে বাংলাদেশ’ অনলাইন পোর্টালের নিউজ আপলোডের কাজ করতেন। লেপটপ নিয়ে যে কোনো টেবিল জুড়ে বসে কাজ করতেন। রাত গভীর হলে সারওয়ার, তবারক কিংবা জনমতের সাঈম চৌধুরী ও অপু রায়কে গাড়ি দিয়ে পৌছে দিতেন তাদের বাসায়। তিনি অসুস্থ। কিন্তু প্রাণশক্তি এমন, তিনি যেন অসুস্থ নন। 
পত্রিকা অফিসের চাবি থাকতো তাঁর কাছে, তাঁর বাসায়। যে আগে আসতেন সে-ই তাঁর বাসায় গিয়ে নিয়ে আসতেন। আমরাও গভীর রাতে চাবি দিয়ে আসতাম তাঁর বাসার একটি নির্দিষ্ট জায়গায়। বাসার সব ঘুমে, কাউকে না-জাগিয়েই চাবি দেয়া চলতো। 
চির আড্ডাবাজ শাহাব উদ্দিন বেলালের পরিচয় বহুমাত্রিক। সাংবাদিক, রাজনীতিক ও সমাজকর্মী হিসেবে তাঁর অবস্থান সমানে সমান। মেইনস্ট্রীম রাজনীতির ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের স্বনামধন্য কাউন্সিলার। তাঁর মেয়াদকালে তিনি ছিলেন জননন্দিত ও জনবান্ধব। কোনো সমস্যা নিয়ে কেউ তাঁর কাছে গেলে সাধ্যমত সাহায্য করতেন,বহু লোক উপকৃত হয়েছেন। সত্তর আশির দশকে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনে তিনির ভূমিকা অবিস্মরণীয়।
রাজনীতিক শাহাব উদ্দিন বেলাল ছিলেন আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে তিনি ছিলেন আপসহীন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে তিনি ছিলেন সোচ্চার। লন্ডনে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হলে তিনি অগ্রসৈনিকের ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক জনমত প্রতিষ্ঠায় তাঁর বলিষ্ঠ কণ্ঠ অনেক ম্রিয়মানকে সাহসী পদক্ষেপ নিতে উৎসাহ যুগিয়েছে। লন্ডনে মৌলবাদী গোষ্ঠীর আস্ফালন ও সাম্প্রদায়িকতা রুখতে প্রবাসীদের সংগঠিত করতে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রণী।
অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাজনীতিতে বিশ্বাসী বন্ধুবৎসল শাহাব উদ্দিন আহমেদ বেলাল দীর্ঘদিন হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়েও উ?ো আমরা কে কি রকম আছি তিনিই আগ বাড়িয়ে খোঁজ খবর নিতেন। 
দৃশ্যত, আমরা তাকে হারিয়েছি। তাঁর তিরোধান আমাদের মাঝে এক অভাবনীয় শূন্যতা ও ক্ষত সৃষ্টি করেছে। ভাবতেই পারি না শাহাব উদ্দিন আহমেদ বেলাল পত্রিকার আড্ডায় আর উপস্থিত হবেন না। পত্রিকা অফিসের পেছনে গাড়িতে বসে ফোন করে আর বলবেন না- ‘হেই একটা পত্রিকা দেও’।
লণ্ডন, ২৯ জানুয়ারি, ২০১৮
লেখক : কবি, সাংবাদিক, সাপ্তাহিক পত্রিকা।