Share |

এক প্রবীণতরুণের জীবনাবসান

ফায়সাল আইয়ূব
যুক্তরাজ্যে পাঁচ বছর এক মাস সাত দিনের জীবনে সাপ্তাহিক লন্ডন বাংলা, জনমত, পত্রিকা ও দেশে কাজ করেছি। পত্রিকা ও দেশ-এ বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব আমাকে বহুকিছু যেমন শেখার সুযোগ করে দিয়েছে, তেমনি অনেক সময় হাঁপিয়ে তাড়িয়ে নাড়িয়ে ছেড়েছে। বিশেষ করে কাগজগুলো সপ্তাহের যে রাতে প্রিন্টে যেত সে রাতে তো দম ফেলার ফুরসত মিলতো না। সাপ্তাহিক জনমতে তো প্রতি বুধবার সকাল দশটা থেকে রাত দুইটা তিনটা পর্যন্ত কাজ করতে হতো। অপরাপর সকল কাজের পর ঘাড়ে চাপতো সম্পাদকীয়; এটি যেমন জনমত, তেমনি পত্রিকা ও দেশ-এ আমাকে আঞ্জাম দিতে হয়েছে প্রায় শতভাগ।  
মনে পড়ে, সাপ্তাহিজ জনমতের কোনও এক ডেডলাইন নাইট তো ফকফকা ভোর হয়ে গিয়েছিল! সকাল সাতটার কিছু পরে ফাইনাল পিডিএফ প্রেসে পাঠিয়ে আমরা সদলবলে ব্রিকলেনের আন্ডারগ্রাউন্ড অফিস থেকে ‘মুক্তি’ পেয়েছিলাম। পূবের আকাশে ‘সূয্যিমামা’র হাসি দেখতে দেখতে পত্রিকাটির তখনকার বার্তা সম্পাদক মোসলেহ উদ্দিন ভাই (আমার জন্মমাটি বহরগ্রামের লোক) আমাকে তার গাড়িতে করে ইস্টহাম পৌঁছে দিয়েছিলেন। একটানা একুশ ঘণ্টা কাজের ওটিই ছিল আমার কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা। আফসোস, বাড়তি ওই সময়টুকুর কোনও বিনিময়মূল্য ছিল না; এমনকি এ জন্যে কর্তৃপক্ষের বুকের জমিন ভেদ করে মুখের বাগানে গজিয়েও উঠতো না কোনও প্রকার দরদের চারাগাছ। বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি সাপ্তাহিক জনমতে ওটিই ছিল আমার জীবনের প্রথম ও শেষ দীর্ঘকর্মঘণ্টা। এমন এনার্জি হয়তো বাকি জীবনে আর পাবো না এবং পেলেও এভাবে করবো না আর। কারণ, এটা অন্যায়; তখন বুঝতে না পারলেও এখন তা অনুধাবন করতে পারি।  
জানি, অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি পৃথিবীর অগণিত মানুষকে অবাঞ্ছিত অনেক কিছু সহ্য করতে বাধ্য করে ফেলে এবং অনেক চতুরপ্রাণ সেই পরিস্থিতির শিকার অসহায় মানুষের কাঁধে বোঝার স্তূপ তুলে দিয়ে নিজেদের মহান দায়িত্বশীল কর্মমানব ভাবার প্রয়াস পায়। যা হোক, ওই জনমতেই আমার সাথে প্রথম পরিচয় হয় শাহাবুদ্দিন আহমেদ বেলাল ভাইয়ের। জানতে পারি তিনি ও আমি একই নদী কুশিয়ারার একই পারের মূল বাসিন্দা; ব্যবধান শুধু সামান্য উজান ভাটির।  
বেলাল ভাই ২০১০ এ সাপ্তাহিক জনমতে ‘রাতের পর রাত’ নামে একটি কলাম লিখতেন, প্রায় নিয়মিত। আমার সহকর্মী সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ভাই প্রায় প্রতি সপ্তাহে বেলাল ভাইর লেখাটিতে চোখ বুলিয়ে নাহাস ভাই কিংবা মোসলেহ ভাইর কাছে পাস করে দিতেন। নির্ঝর ভাই খুব ব্যস্ত হলে কোনও কোনও সপ্তাহে আমি সেটি একবার দেখে দিতাম। তখন বেলাল ভাই শিশুর মতো পাশের চেয়ারে বসে থাকতেন। আমি তখন যুগপৎ পয়ষট্টি বছর ঊর্ধো একজন মানুষের মনের এবং কলমের জোর দেখে অবাক হতাম। সদাহাস্য ওই প্রবীণতরুণ বেলাল ভাই আজ আর আমাদের মধ্যে নেই, ভাবলেই বুকের ভিতর এক শূন্যতা অনুভূত হয়; স্বজন ছাড়া কারো পক্ষে তা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।  

 কীভাবে আমার স্বজন  
সাপ্তাহিক পত্রিকা অফিসে দুই হাজার এগারো থেকে দুই হাজার তেরো, তিন বছর কাজ করি। মাঝেমধ্যে দুপুরের খাবার খেতে চারটা/পাঁচটা বেজে যেত। একদিন একাই কাজ করছিলাম; সাড়ে চারটা অথবা পৌনে পাঁচটা নাগাদ বেলাল ভাই ‘ফয়সল কিতা কররায়? এমাদ আবো আইছোইন না নি?’ বলে আস্তে আস্তে অফিসে ঢুকলেন। কিছুক্ষণ পর ভাত-তরকারি গরম করে প্লেট ও পানির গ্লাস হাতে পেছনের রুম থেকে যখন বার্তাকক্ষের টেবিলে ফিরছিলাম, পিসি কম্পিউটারে বসা বেলাল ভাই মুহূর্তে বলে উঠলেন, ‘ফয়সল, আবো খাইছো নানি! অতো লেইট করি খাইয়ো না! ইতা ঠিক নায়। বয়স অইলে বুঝবায়, ইতায় খুব ছাতায়।’ তাঁর সেই কথাগুলো আজও মনের কানে পরিস্কার শুনতে পাই। সেদিন থেকেই বেলাল ভাই আমার ‘আপনার কেউ’ হয়ে যান। কারণ, এমন প্রেমার্দ্র সুরে আমাকে এতো মমত্ববোধে উদ্দীপিত উপদেশ এর আগে কেউ দেয়নি। যদিও এমন ঘটনা প্রায়ই অনেকে দেখতেন, দেখেছেন; হয়তো উপলব্ধিও করেছেন, কিন্তু মুখে তার প্রকাশ ঘটানো থেকে সজ্ঞান বিরত থেকেছেন!  

 বাংলা মিডিয়ার প্রিয়জন  
শাহাবুদ্দিন আহমেদ বেলালের শত্রু আছে বা থাকতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করতে পারি না। বিশেষ করে লন্ডনের বাংলা মিডিয়া বেলাল ভাইয়ের যে অকৃত্রিম ভালোবাসায় স্নাত হয়েছিল, কথায় ও কর্মে অদূর কিংবা সুদূর ভবিষ্যতে তেমন ভালোবাসার প্রকাশ ঘটানো আর কারো পক্ষে সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। জনমত, সুরমা, পত্রিকাসহ প্রতিনিধিত্বশীল সহযোগী অন্য প্রায় সকল সাপ্তাহিক পত্রিকায় রমজান মাসে বেলাল ভাই নিজের ঘর থেকে যে বিশাল আয়োজনে সুস্বাদু ইফতার নিয়ে হাজির হতেন, আগামী রমজানে তা থেকে আমরা সবাই বঞ্চিত হবো; তাকে ভীষণ মিস করবো।  
আমার তো প্রায়ই মনে হয়, লন্ডনের বাংলা মিডিয়ায় তাঁর থেকে বেশি সমাদর পাওয়া নবীন বা প্রবীণ আরেকজন নেই। সব বয়সের সাংবাদিকদের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল সবার উপরে। যাকে যতটুকু সম্মান দেবার, উপদেশ দেবার এমনকি ভালোবেসে গালমন্দ করার, বেলাল ভাই অকুণ্ঠচিত্তে তা দিতে বা করতে কখনোই পিছপা হতেন না। বোধকরি, অন্যের কাছ থেকে সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পাওয়ার এটি একটি অনন্যসুন্দর চর্চা।   

রসিক মানুষ বেলাল ভাই  
জীবনাভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ বেলাল ভাই আমাদেরকে অনেক সময় তুমুল হাসিয়ে ছাড়তেন। কোনোদিন খোশগল্পে আমরা মেতে উঠলে বেলাল ভাই তাতে নেয়ামক শক্তি সঞ্চার করতেন। প্রসঙ্গক্রমে হঠাৎ বলে উঠতেন, ‘ছিনালে ছিনাল চিনে, উলোশে চিনে খাতা, মালিয়ায় মালিয়া চিনে, কাখোইরে চিনে উকোইনালা মাথা। অথবা, উঁচুনীচুর পার্থক্য বুঝাতে নদীর স্রোতের মতো বলতেন ‘কই মহারাণী আর কই ছুতমারানি।’ তাঁর এমত কথার প্রতিটি শব্দেবাক্যে অনেকেই একপ্রকার বিমূর্ত রসের ক্ষরণ দেখতে পেতেন। এমন একজন রসিক মানুষ আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গেছেন, বিশ্বাস হয় না।

 বেলাল ভাইর ফেইসবুকচর্চা  
সাপ্তাহিক পত্রিকা অফিসে আমার কর্মজীবনের তিন বছরে বেলাল ভাই একাধিকবার অসুস্থ হয়ে রয়েল লন্ডন হাসপাতালে ভর্তি হন। আমরা তাঁকে দেখতে যাই। তিনি কয়েকদিন পর সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে আবার সহাস্যমুখ ফিরে আসেন।  
যখন তিনি হাসপাতালে যেতেন একটি বিষয় আমাকে খুব প্রাণীত করতো, উজ্জীবিত করতো, উদ্দীপিত করতো; আর সেটি হল তার ফেইসবুকচর্চা। শারীরিকভাবে একটু আরামবোধ করলে হাসপাতালের বিছানায় থেকেই তিনি এটি করতেন। সাংবাদিক সারোয়ার কবির হাসপাতালে তাঁকে দেখতে গেলে তাঁকে দিয়ে একটি দুটি ছবি (হাসপাতালের বিছানায় শোয়া, চারদিকে যন্ত্রপাতি) উঠিয়ে সেগুলো তাঁর ফেইসবুক ওয়ালে ক্যাপশানসহ আপলৌড করে দিতেন। আমি এটিকে একজন প্রবীণতরুণের দীপিত কাজ বলে ধরে পুলকিত হতাম। ভাবতাম, মানুষ বুঝি এভাবেই নানা উপায় অবলম্বন করে সুস্থ হবার, বেঁচে থাকার, স্বজনে ফেরার স্বপ্ন দেখে। বেলাল ভাইর জন্যে তখন খুব মায়া হতো। তার ফেইসবুক প্রোফাইল খুলে পেছনের দিকে গেলে আমরা হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা বেলাল ভাইয়ের এমন অনেক ছবিই দেখতে পাবো; কিন্তু বেলাল ভাইকে আর কোনোদিন দেখতে পাবো না! এর চেয়ে বড় সত্য আর নেই।

 ক্ষমা চাওয়া হল না!  লন্ডন ছাড়ার পর ভাই বোন ছাড়াও যুক্তরাজ্যে বসবাসরত আমার বহু বন্ধুবান্ধব এবং সহকর্মীর সাথে একাধিক মাধ্যমে আমার প্রায়ই যোগাযোগ হয়। দুই হাজার চৌদ্দ সালের একুশ নভেম্বর রাতে ফ্রান্সে চলে আসার কথা অনেককেই বলা হয়ে উঠেনি। সেই অনেকের মধ্যে ছিলেন আমার বেলাল ভাই। গত প্রায় এক মাস থেকে কেন জানি বারবার তাঁর কথা মনে হচ্ছিল। ভাবছিলাম সাপ্তাহিক পত্রিকা অফিসে ফোন করে তার কন্টাক্ট নাম্বার নিয়ে ক্ষমা চেয়ে নেব; হায়, সেই সুযোগটি আমি চিরতরে হারিয়ে ফেললাম!  স্বজনের মনে বাঁচা  
পৃথিবীতে একজন মানবশিশুর জন্মের ঘটনা ততোখানি সত্য নয়, যতোখানি সত্য একজন মানুষের মৃত্যু। বেলাল ভাই আমাদেরকে সেই চিরসত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে আড়াল হয়ে গেলেন। না, তিনি আড়াল হয়ে যাননি; আমাদের মনোভূমে বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন অনেক অনেকদিন। এই বেঁচে থাকার জন্যে জীবনভর যে কর্ম সম্পাদনের কথা ছিল, বেলাল ভাই নি:সন্দেহে তার সব করে গেছেন। সব মানুষ মানুষকে জয় করতে পারে না; বেলাল ভাই পেরেছিলেন। মৃত্যুর পর মানুষের অশ্রু পাওয়া বড় ভাগ্যের ব্যাপার। বেলাল ভাই সেই আলোকিত সৌভাগ্যবানদের একজন, যিনি বহু মানুষকে তার জানাযায় অশ্রু মুছতে বাধ্য করেছেন; এটি তাঁর বড় প্রাপ্তি। আমার পরম শ্রদ্ধেয় বেলাল ভাইয়ের সেই অন্তিম প্রাপ্তিতে মনে পড়ে গেল আমারই একটি কবিতা। যে কবিতায় আমি বলেছিলাম :  
মৃত্যুতে আমার নেই এতোটুকু ভয়  
জীবনের ভয় শুধু ক্ষণে ক্ষণে হয়  
মৃত্যু একদিন আসে  
জীবন প্রত্যহ হাসে  
প্রাপ্তির আনন্দে হোক জীবনের ক্ষয়!  
লেখক : কবি। সাবেক বার্তা সম্পাদক সাপ্তাহিক পত্রিকা ও সাপ্তাহিক দেশ।