Share |

‘বন্ধুর মুখচ্ছবি’

মোহাম্মদ বেলাল আহমদ 
আগের রাতে যখন শুনলাম বেলাল ভাই আছেন আর কয়েক ঘন্টা। বুকটা তখন ধড়াস করে উঠলো। বৃহস্পতিবার ২৫ জানুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় এমাদ (সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদক) ফোনে জানালেন তিনি এক্ষুণি হাসপাতালে যাচ্ছেন। ভাবলাম যাবো কি-না। বাসা থেকে রয়েল লন্ডন হাসপাতালে পৌছুবার আগেই হাসপাতালের ভিজিটিং আওয়ার শেষ হয়ে যাবে। পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত নেই যেতে হবে তাকে দেখতে। হাসাপাতালে পৌছে দেখি প্রচুর লোকজন (আপনজন)। দেখি ২১ নম্বর কেবিনে জীবনচেতনে চেতনাপ্রাপ্ত বেলাল ভাই শুয়ে আছেন অচেতনভাবে। মনে পড়লো, মাত্র গেলো সপ্তাহে তাকে হাসপাতালে দেখতে গেলে দেখি তিনি ঘুমের ঘোরে। বেলাল ভাই বলে ডাক দিতেই তাকালেন। জিজ্ঞাসা করলেন আমরা কোথায় আছি। হাসপাতালে বলার পর বললেন, ও। কোন কিছু খাবেন কিনা জিজ্ঞাসা করতে স্পষ্ট করেই বললেন - এই দুনিয়াত কিচ্ছু খাওয়ার আছেনি। বেলাল ভাইয়ের সাথে এটাই হলো শেষ কথা। শনিবার বেলাল ভাইকে জীবনের শেষ স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে গভীর এক নিরবতায় অভাবনীয় স্তব্ধতায় পত্রিকা অফিসে ফিরি। 
তার সাথে অসংখ্য স্মৃতি। তার পরিচিতি নানা মাত্রায়। সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী। নানা পরিচয় থাকলেও আমার কাছে তাকে একজন পুরোদস্তুর সমাজকর্মীই মনে হতো। রাজনীতি করেছেন ঠিকই কিন্তু থেকেছেন লাভালাভ ও ঘোরপ্যাচের বাইরে। সত্তর বছরের জীবনে নিজের সেরা ও উজ্জল সময়টা দিয়েছেন বাঙালিপাড়া পূর্ব লন্ডনে এবং জনকল্যাণে। বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্দোলনে তিনি বরাবরই থেকেছেন প্রথম কাতারে। পূর্ব লন্ডনের সামাজিক সংগ্রামের যুথবদ্ধ ইতিহাসই যেন শাহাব উদ্দিন বেলাল। 
সহানুভূতি ও মানবিকতার অভাবে যখন নাকাল সমাজের মানুষ তখন বেলাল ভাইয়ের মতো অসাধারণ উদার মানুষের প্রস্থান তো বেদনাক্লিষ্ট করবরাই কথা। অন্যের তরে নিজেকে বিলিয়ে দিতে তাকে কখনো সাবধানী পথে আমি হাঁটতে দেখিনি। 
তিন বছর আগে ২০১৪ সালে এক সন্ধ্যায় সাপ্তাহিক পত্রিকা অফিসে চলছে ধুম আড্ডা। আমি বেরিয়ে যাবো দেখে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন কোথায় যাচ্ছি। মামার (ড. খসরুজ্জামান চৌধুরী) স্বাধীনতা পদকের আবেদনে একজন পদকপ্রাপ্তের স্বাক্ষর প্রয়োজন, যাচ্ছি গাফফার ভাইয়ের কাছে। গাড়ি আনিনি ট্রেনে যাচ্ছি শুনতে পেয়ে এক মূহূর্ত দেরী না করে বললেন চলো আমার সাথে আমি নিয়ে যাচ্ছি। বললেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা খসরু ভাইয়ের জন্য কিছু করতে পারলে খুব ভালো লাগবে। সোজা নিয়ে গেলেন এজওয়ারে। এজওয়ার পর্যন্ত যেতে যেতে স্বাধীনতা পদকের আবেদনের প্রসঙ্গটি নিয়ে তাঁর সাথে কথা বললাম। বেলাল ভাইকে বললাম আবেদনের মাধ্যমে স্বাধীনতার পদক পাওয়া আমার কাছে অসভ্যতা মনে হয়। বেলাল ভাইয়ের পাল্টা প্রশ্ন- আমরা সভ্য কে বলে? আমি নিরুত্তর। 
দীর্ঘদিন রোগশোকের মাঝেও অবিশ্বাস্য প্রাণশক্তি দিয়ে কাজ করে গেছেন সমাজের। বিশেষ করে বিলেতের বাঙালিরা যাতে একটা শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়ায় সেজন্য তার প্রচেষ্টা ছিলো নিরন্তর।
বেলাল ভাইয়ের বচনে ছিলো নিজস্ব স্টাইল। কিছু শব্দ ও নামের উচ্চারণে থাকতো স¡তন্ত্র প্রকাশভঙ্গি। তিনি এমপি টিউলিপ সিদ্দিককে ডাকতেন ‘তুলিপ’। দেশ সম্পাদক তাইসির মাহমুদকে ডাকতেন ‘তাইসুর’। গ্রাফিক ডিজাইনার নান্টুকে ‘নান্টি’। সাংবাদিক উচ্চারণে থাকতো সাম্বাদিক ...... ইত্যাদি। তার প্রকাশের ধরনে কেউ কেউ থমকে দাঁড়ালেও কাছে গিয়ে দেখতে পেতেন কি অপরিমেয় ভালোবাসা থেকে এগুলো উৎসারিত। আমাকে মাঝেমধ্যে কিছু গানে পায়। যখন সেটা হয় তখন কদিন এই গানগুলো অসংখ্যবার শুনি। দুমাস আগে এরকম দুটো গানে (রবীন্দ্রসঙ্গীত) আমাকে পেয়েছিলো। 
“মাটির বুকের মাঝে বন্দি যে জল মিলিয়ে থাকে .... 
এবং আমায় বলো না গাইতে বলো না....।” 
সাপ্তাহিক পত্রিকা অফিসের এক নিয়মিত আড্ডায় এই গান দুটোর কথা (টেক্সট) নিয়ে আলাপ হচ্ছিলো। বেলাল ভাইও তখন উপস্থিত। আমি বলছিলাম, রবীন্দ্রনাথের এই গানের মাঝে বিলেতপ্রবাসী কিছু পদক ব্যবসায়ী ও যশপ্রার্থী খদ্দেরের উপস্থিতি দেখতে পাই। এই গানগুলো সেই কলেজ জীবন থেকে শোনা কিন্তু এখন এর অর্থ আবিষ্কার করছি নতুন করে। পদক ব্যবসা নিয়ে কোন আওয়াজ নেই। ঐ আড্ডায় বেলাল ভাই বললেন-লেখক ও সাংবাদিকের মুখ্য কাজ সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরা। পাছে কে কি বলে সেটা না ভেবে লিখে যাও। 
এরকম অসংখ্য স্মৃতি আছে বেলাল ভাইকে নিয়ে।
শেষ করছি এই লেখার শিরোনাম এবং ‘তুইন’ প্রসঙ্গ দিয়ে। ‘বন্ধুর মুখচ্ছবি’ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রবন্ধ সংকলন থেকে ধার করে নেয়া। বেলাল ভাইকে স্মরণে ভালো শিরোনাম খুঁজতেই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর দ্বারস্থ হওয়া। সত্যিকার অর্থেই তিনি ছিলেন সবার বন্ধু।  বেলাল ভাই তুই কে বলতেন তুইন। তুইন ডাকতেন সারোয়ার আর তবারককে পরম মমতায়। এই তুইন শব্দ আর শুনতে না পাবার কথা ভাবতেই মনটা বড় খারাপ হয়ে যাচ্ছে। 
বিরাট মনের অধিকারী, পরোপকার আর জীবনের গভীর মর্মবোধে যাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল সেই বেলাল ভাইয়ের আত্মার শান্তি কামনা করছি। 
লণ্ডন, ২৮ জানুয়ারি ২০১৮। লেখক : প্রধান সম্পাদক, সাপ্তাহিক পত্রিকা