Share |

কাছের মানুষ দূরের যাত্রী

মোহাম্মদ এমদাদুল হক চৌধুরী
রয়েল লন্ডন হাসপাতালে শাহাব উদ্দিন বেলাল ভাইকে দেখতে গিয়েছিলাম ১৬ জানুয়ারি। তাঁর কেবিনে হাতে লেখা নোটিশ টাঙানো ‘ক্লোজ ফ্যামেলি অনলি।ম্ব দরজার বাইরে ভাবীর সাথে কথা বলে এক রকম জোর করেই ঢুকে পড়লাম। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের নিয়মিত বাসিন্দা বেলাল ভাইকে এর আগে হাসপাতালে দেখতে যাওয়া হয়নি। কেননা, চিকিৎসার জন্যে  হাসপাতালে বেশি দিন তাঁর থাকা হতো না।  তবে খবর নিতাম তাঁর শরীরের প্রায় প্রতি সপ্তাহেই।
আমাকে দেখে চোখ মেলে তাকালেন। সামান্য কথাবার্তার পর চলে আসার সময় তাঁর স্বভাবসুলভ কণ্ঠেই বললেন, এমাদ সবাইকে ফোন করে বলে দাও আমাকে দেখতে কেউ যেন হাসপাতালে এসে ভিড় না করে। শুধু দোয়া করতে বলো। আমার খটকা লাগলো। মানুষের সাথে তিনি থাকতে এতো ভালোবাসতেন আজ তাঁর মুখে এই কথা!
এবার হাসপাতালে ভর্তির পর ফোনে একদিন কথা হয়েছে। শরীর কেমন জিজ্ঞেস করতেই বললেন, এবার আর বোধ হয় সহজে ছাড়া পাবো না। তিনি কি আন্দাজ করতে পেরেছিলেন, সময় শেষ হয়ে হয়ে যাচ্ছে? হয়তো বা। 
গত বৃহস্পতিবার ২৫ জানুয়ারি হঠাৎ করেই এক সহকর্মীর ম্যাসেজ এলো- ডাক্তার সময় বেঁধে দিয়েছেন। ছুটে গেলাম পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ বেলাল ভাইকে নিয়ে। দেখলাম, তাঁর বেডের পাশে দাঁড়িয়ে তেলাওয়াত করছেন স্বজনরা। একবার চোখ মেলে তাকিয়ে আবার চোখ বুজলেন। মনে হচ্ছিলো, সময় সহায় নয় এবার। চলে আসতে মন চাইছিল না। ঘন্টা দুয়েক থেকে রাত ১০টার দিকে চলে এলাম। মনে একটা ক্ষীণ আশা- বেলাল ভাই সব জরা-ব্যাধিকে কাবু করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন আবারো। কিন্তু পরদিন শুক্রবার তিনি পাড়ি দিলেন অনন্তলোকে। বেলাল ভাইকে আমি চিনি কয়েক দশক ধরে। কিন্তু তাঁর সাথে আমার জানাশোনা, ঘনিষ্ঠতা মাত্র ৮/৯ বছরের। পত্রিকায় আসার পর থেকে কেমন করে যে তিনি আমার এতো কাছের মানুষ হয়ে গেলেন তা আজ আর বলতে পারবো না। আসলে পত্রিকাকে ঘিরেই তাঁর সাথে আমার কিংবা আমাদের ঘনিষ্ঠতা। কোন কোন দিন একাধিক বার তাঁর আসা-যাওয়া অফিসে। 
বেলাল ভাইয়ের বর্ণাঢ্য জীবনে তিনি রাজনীতি, সাংবাদিকতা এবং সমাজকর্মের বহুক্ষেত্রে নানা অবদান রেখে গেছেন। তাঁর সহকর্মীরা বিস্তারিত লিখেছেন এসব ব্যাপারে। তবে তাঁর চরিত্রের একটি বিশেষ দিক আমাকে আকৃষ্ট করতো। সেটি হচ্ছে- কারো কোন উপকার করার সুযোগ পেলে সেটি হাতছাড়া না ককতেন না। সেটি গাড়িতে করে লিফট দেয়া হোক, বাসা খুঁজে দেয় হোক কিংবা কারো সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়ার কাজ হোক। কাউকে কোন জিনিস দেবেন বললে তা ভুলে যেতেন না। মনে আছে, আমাকে একবার একটি জিনিস দেওয়ার কথা ছিলো তাঁর। বাসা থেকে সেটা হাসপাতালে কাউকে দিয়ে আনিয়েছেন। পরে আমার এক সহকর্মী তাঁকে দেখতে গেলে তার হাতে সেটি দিয়ে বলেছেন, এটা এমাদকে পৌঁছে দিও। পত্রিকা অফিসের এক সেট চাবি তাঁর কাছে রক্ষিত থাকতো। অসময়ে কারো দরকার হলে রাত-বিরেতে হাসিমুখে তা তুলে দিতেন আমাদের কারো হাতে। কাজ শেষে গভীর রাতে আমরা আবার লেটারবক্স দিয়ে তা ফেলে আসতাম। বেলাল ভাই তা আবার নির্দিষ্ট জায়গায় তুলে রাখতেন। এরকমই নির্ভরযোগ্য মানুষ ছিলেন তিনি। 
সারা জীবন রাজনীতির সাথে জড়িয়ে রেখেছেন নিজেকে। বাংলাদেশে নৌকা আর ব্রিটেনে গোলাপ ফুলে তিনি মুগ্ধ। সেই মুগ্ধতাকে কখনও অপমান করেননি। এখানে লেবার পার্টি থেকে কাউন্সিলার হয়েছেন। যখন কাউন্সিলার হতে পারেননি, তখন সব ছেড়ে দিয়ে অন্যপথে হাঁটেননি। বাংলাদেশে সংস্কারপন্থী বলে পরিচিতি পাওয়া নেতাদের সাথে সখ্য আছে সেই কারণে এদেশে যখন নৌকায় তার জায়গা হয়নি তখন তিনি কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু কখনো দলের বিরুদ্ধে যাননি। এই ধৈর্য্য আর আনুগত্য তার ছিলো। বর্তমান রাজনীতির অধঃপতন নিয়ে পত্রিকা অফিসে কথা উঠলেই বেলাল ভাই বলতেন, রাজনীতির এই দুর্দশার কারণ হচ্ছে- এখন মানুষ দল করার আগে কোন্দল করে আর রাজনীতি শেখার বদলে শিখে যায় দুর্নীতি। তাঁর এ বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করা কঠিন। 
আরেকটা বিষয় আমি লক্ষ্য করেছি, বেলাল ভাইয়ের মাঝে। এটি হলো তার অফুরন্ত প্রাণশক্তি। যতদিন বেঁচে ছিলেন সেই প্রচণ্ড প্রাণশক্তি নিয়েই সক্রিয় থেকেছেন। তার মনের জোর ছিলো অবাক করার মতো। হাসপাতালে ভালো লাগছে না। কিন্তু ডাক্তার তাকে বাসায় দেবে না সহসা। হাতে রোগীর ট্যাগ লাগানো অবস্থায় এক বিকেলে পত্রিকা অফিসে হাজির। কি অবস্থা বেলাল ভাই? বললেন, না ছাড়া পেতে এবার দেরী হবে, তাই উইকএণ্ড কাটাতে বাসায় যাচ্ছি। ভাবলাম তোমাদের সাথে দেখা করে যাই। এই হচ্ছেন আমাদের বেলাল ভাই। 
গত আট/দশ বছরে জমা হওয়া হাজারো টুকরো টুকরো কথা, স্মৃতি মনের আয়নায় ভাসছে। তরুণদের সঙ্গ তার খুবই পছন্দ ছিলো। লন্ডনে গত কয়েক বছরে তার একঝাঁক তরুণবন্ধু তৈরী হয়েছে। এদের বকাঝকা করেন, কোথাও যেতে হলে আবার তারা সঙ্গী না হলে তাঁর চলে না। কোন দরকার হলে এরাই তাঁর প্রথম ‘পোর্ট অব কল’। এদের তিনি অপরিসীম স্নেহ করেন। তারাও তাকে ভীষণ ভালোবাসে। আর সেই ভালোবাসার অধিকারে তাকে জ্বালায়ও যখন-তখন। তারা দুষ্টুমী করে তাঁর রাগ তুলে বকুনী খায়। এমন অনেক সময় গেছে, বেলাল ভাই চলে যাচ্ছেন। দরজার কাছে চলে গেছেন। পেছন থেকে তুমুল বিতর্কিত একটি প্রসঙ্গ তুলে তাঁর তরুণ বন্ধু প্রশ্ন ছুঁড়লো। তিনি দরজা থেকে ফিরে এলেন। বসে এক পশলা ঝড় তোলা বক্তৃতা। চা এলো। আরো ঘন্টা দুয়েক পর তিনি উঠলেন। আমার মনে হতো, বেলাল ভাইর এই যে বড় গলার কথাবার্তা আর নিজস্ব প্রকাশ ভঙ্গি, আর কথায় কথায় শ্লোক আওড়ানো- সর্বোপরি তার স্নেহমাখা সান্নিধ্যের সময়টা দীর্ঘ করতেই পরিকল্পনামাফিক এটা তারা করতো।  বেলাল ভাইয়ের সেই সান্নিধ্য আর আমরা পাবো না। কিন্তু তাঁর স্মৃতির উষ্ণতা আমাদের শক্তি যোগাবে বহুদিন।
 তাঁর জানাজায় শতশত মানুষের উপস্থিতি শুধু নয় কবরস্থান পর্যন্ত শতাধিক মানুষের মিছিল বলে দেয়- কত শত মানুষের কত কাছের মানুষ ছিলেন তিনি। কারণ, এদেশে খুব আপনজন না হলে দাফন পর্যন্ত যাওয়া হয়না সাধারণত। গত শনিবার তাঁর সেই আপনজনরা কাছের মানুষেরা তাঁকে দূর যাত্রায় শেষবিদায় জানিয়ে এলেন বুকে একরাশ শূণ্যতা নিয়ে। এই শূণ্যতা বারবারই অনুভূত হবে আমাদের মাঝে। বেলাল ভাই পরপারে গিয়ে ভালো থাকবেন- হাজারো মানুষের দোয়া আর তাঁর সৎকর্মগুলো তাঁর পাথেয় হোক। মহান রাব্বুল আলামিন তাকে যেনো বেহেশতবাসী করেন এই দোয়াই করি। 
 লণ্ডন, ২৯ জানুয়ারি ২০১৮

সম্পাদক, সপ্তাহিক পত্রিকা।