Share |

মহান শহীদ দিবস : বাংলা বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব কার?

বাঙালির ভাষা সংগ্রামের ইতিহাসমণ্ডিত দিন মহান একুশে ফেব্রুয়ারী আমাদের সামনে এসে হাজির হয়েছে। মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদে গর্জে ওঠা বাঙালি এদিনটিতে বুকের রক্ত দিয়ে শাসকশ্রেণীর মসনদ নাড়িয়ে দিয়েছিলো। উর্র্দূই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে - পাকিস্তানী শাসকদের এই সিদ্ধান্ত সেদিন বাংলাভাষী জনতা রুখে দিয়েছিলো। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারীর ঘটনা সংগ্রামী বাঙালীদের পরবর্তীতে আরো বড় অর্জনের পথে প্রেরণা যুগিয়েছিলো। বলা যায়, ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়েই পরিণতি পেয়েছে বাঙালির স্বাধীন ভূখণ্ড। লাল-সবুজ পতাকার বাংলাদেশ।  কিন্তু ৬৬ বছর পরে প্রশ্ন জাগে, আমাদের পূর্বপুরুষের রক্ত দিয়ে রক্ষা করা নিজের ভাষা মর্যাদা আজ বাংলা দাবিদার জনগোষ্ঠীর মাঝে কোথায়? স্বাধীন বাংলাদেশেই বা কী এর হাল? চিত্রটা যে খুব সন্তোষজনক তা কিন্তু নয়। অথচ যুদ্ধ করে রক্ষা করা ভাষার এমন বেহাল দশা হবার কথা ছিল না। বাঙালির ভাষা সংগ্রামের ইতিহাস এতই তাৎপর্যপূর্ণ যে প্রায় পঞ্চাশ বছর পর বিশ্বসভায় একুশে ফেব্রুয়ারি স্থান করে নিয়েছে। তারপর থেকে প্রতি বছরই বিশ্বের দেশে দেশে আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে এই দিবসটি মর্যাদার সাথে পালিত হয়ে আসছে। এটা বাঙালি হিসেবে বাংলাভাষী মানুষ হিসেবে আমাদের জন্য গর্বের যে, আমাদের ঐতিহাসিক সংগ্রামের রক্তস্নাত দিনটি বিশ্ববাসী তাদের নিজ নিজ মাতৃভাষাকে সম্মান জ্ঞাপনের দিন হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে।
একই সাথে সেই গর্ব চুরমার হবার ঘটনাও যে নেই তা কিন্তু নয়। বাংলার যে দশা বাংলাদেশে তা নতুন করে বর্ণনার প্রয়োজন নেই বললে চলে। সর্বস্তরে বাংলা চালুর যে দাবী এবং প্রতিশ্রুতি ছিলো স্বাধীন বাংলায় তা হয়নি ছয় দশক পেরিয়ে যাবার পরও। বরং দিন দিন মায়ের ভাষার প্রতি অবজ্ঞা, অবহেলা  আর অনাদর বৃদ্ধি পেয়েছে। আর মূল জায়গাতেই যখন বাংলা ভাষার এই দশা তখন বিদেশের বাঙালি কমিউনিটিতে ভালো কিছু আশা করা কি যায়? বাংলাদেশে এখন যে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চলছে তাতে নিজ ভাষাকে অগ্রাহ্য করে ইংরেজি আর হিন্দির দাপটের কাছে বাংলা হার মানছে। বিদেশীরা যখন বাংলাদেশকে হিন্দি ভাষার বিকাশের উর্বর ক্ষেত্র বলে প্রকাশ্যে মন্তব্য করে তখনই বোঝা যায় নিজ ভাষার মর্যাদা সম্পর্কে বাঙালি কত উদাসীন হয়ে পড়েছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশের জনগণকে নিজ জাতি এবং নিজ ভাষার মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।  বিদেশে বিশেষ করে ব্রিটেনে বাংলাদেশী কমিউনিটির অপেক্ষাকৃত শক্ত অবস্থান দীর্ঘদিনের। তারপরও এখানে বাংলা চর্চা কিছু মিডিয়া আর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই সীমিত চর্চাও এখন হ্রাস পাচ্ছে। নতুন প্রজন্মকে বাংলার প্রতি আকৃষ্ট করতে বাংলাভাষা শেখাতে তেমন কোন উদ্যোগ নেই। আগের প্রজন্ম এখানে বড় হয়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের জন্য নিজের শেকড়ের ভাষাটা শিখিয়ে দেওয়ার জন্য বাংলা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তীতে সেগুলোর উন্নয়ন দূরে থাক বন্ধ হয়ে যাওয়াও ঠেকাতে পারেননি কমিউনিটির হর্তাকর্তারা। প্রশ্ন হলো, শেখার পথ বন্ধ হয়ে গেলে প্রজন্মান্তরে বাংলাভাষা টিকবে কী করে? আর ভাষা না টিকলে বাঙালি সংস্কৃতি থাকবে না- কারণ, ভাষা হচ্ছে সংস্কৃতির বাহন। এই ভাষা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাটি বিদেশে বাঙালি কমিউনিটির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত।  একুশে পালন যদি শুধু শহীদ মিনারে ফুল আর খালি পায়ে হাঁটায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে বাংলা ভাষার অতীত সংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে এই প্রজন্ম শুধু বড়াই-ই করবে কিন্তু তা আগামী প্রজন্মকে শেকড়সম্পৃক্ত রাখতে কোন কাজে আসবে না।
 সুতরাং, এবারের একুশে পালনে আমাদের দৃঢ় প্রত্যয় হোক- বাংলা ভাষার মান-মর্যাদা রক্ষায় এবং এর বিকাশে আমরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাবো।