Share |

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বরূপ

মোফাজ্জল করিম
আমি সব সময় বিশ্বাস করি, যে জাতি একটি রক্তস্নাত অসম যুদ্ধে জয়ী হয়ে মাত্র ৯ মাসে নিজের দেশকে শত্রুমুক্ত করতে পেরেছে, ছিনিয়ে আনতে পেরেছে স্বাধীনতার রক্তলাল সূর্য, সে জাতির অসাধ্য কিছু নেই। স্বাধীনতার পর গত প্রায় অর্ধ শতাব্দীতে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আমাদের যেসব অর্জন, তা একটু গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে আমার এ বক্তব্যের সত্যতা কিছুটা হলেও প্রমাণিত হবে। একাত্তরে যখন দেশ স্বাধীন হলো, তখন আমাদের কী ছিল? একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, সাড়ে সাত কোটি মানুষ ও তাদের সাড়ে সাত হাজার সমস্যা আর সেসব সমস্যা শুধু অর্থনৈতিক সমস্যাই নয়, একের পর এক রাজনৈতিক দুর্যোগও দেশটাকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। মাত্র ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের একটি দেশে না ছিল উল্লেখ করার মতো কোনো খনিজসম্পদ, না শিল্প-কলকারখানা, না প্রশিক্ষিত জনশক্তি। আয়তনে ক্ষুদ্র দেশটি জনসংখ্যার চাপে নুয়ে পড়েছিল শুরু থেকেই। বন্যা, খরা, সাইক্লোন ও দুর্ভিক্ষ ছিল যেন তার ললাটলিখন। সেই অবস্থা থেকে দেশটির শুধু উত্তরণই ঘটেনি, আজ বিশ্বের দরবারে সে নিজেকে একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে তুলে ধরতে যাচ্ছে। আজ তার পরিচিতি আর অনুন্নত বা স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে নয়, এখন সে একটি যথেষ্ট সম্ভাবনাময় উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছে।
এখানে আমরা স্বাধীনতা-পূর্বকালে এই ভূখণ্ডের যে অবস্থা ছিল তার কথা স্মরণ করব। তখন পূর্ব পাকিস্তান নামক পাকিস্তানের কলোনিসদৃশ একটি প্রদেশ ছিল এই দেশ, বিশ্বসভায় যার কোনো মর্যাদাশীল পরিচিতি ছিল না। সবাই জানত, পাকিস্তানের উচ্ছিষ্টপুষ্ট দুর্যোগপ্রবণ এই অনুন্নত প্রদেশের মানুষ লাঞ্ছনা-বঞ্চনার শিকার হয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামে সতত নিয়োজিত। তখন কে ভেবেছিল এ দেশের মানুষ একদিন পাকিস্তান নামক সিন্দাবাদের ভূতকে এক ঝটকায় ঘাড় থেকে ছুড়ে ফেলে দেবে। সেটা যেমন সম্ভব হয়েছিল বাঙালির অভূতপূর্ব দেশপ্রেম ও অমিত শক্তি-সাহসের কারণে, তেমনি স্বাধীনতা-উত্তরকালে সেই বাঙালিই দুঃখজয়ের শপথে বলীয়ান হয়ে একে একে দূর করেছে দুর্লঙ্ঘ্য বাধার বিন্ধ্যাচল। স্বাধীনতার পর দুমুঠো অন্নের জন্য যারা চাতকদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত বহির্বিশ্বের দিকে, দুর্ভিক্ষের করাল ছায়া যাদের গ্রাস করতে চেয়েছে সত্তরের দশকে, আজ তারাই সেদিনকার জনগোষ্ঠীর দ্বিগুণ জনগোষ্ঠীর আহার জুগিয়ে উদ্বৃত্ত তণ্ডুল বিদেশে রপ্তানি করার দ্বারপ্রান্তে। সাক্ষরতার হার বেড়েছে তিন গুণ, মাথাপিছু আয় সত্তরের দশকের ৮০/৯০ ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে এখন ১৬ শ ডলারের ওপর, আর প্রবৃদ্ধির ঘোড়ার প্রদৃপ্ত পদক্ষেপে বিশ্ববাসী মুগ্ধ। এই সবই সম্ভব করেছে সেই বাঙালি জাতি, যারা একাত্তরে অকাতরে বুকের রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিল। সেই কৃষক শ্রমিক জেলে তাঁতি কামার কুমার। সেই বাংলার অগণিত খেটে খাওয়া মানুষ। এটা কোনো একটি সরকারের অর্জন নয়, এটা সব সরকারের, সব মানুষের অর্জন। মুক্তিযুদ্ধে যেমন একজন নিয়মিত সৈনিক জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিল, তেমনি করেছিল অগণিত গণযোদ্ধা, যারা জীবনে কোনো দিন একটি যুদ্ধাস্ত্রের ছবিও দেখেনি। তাদের সবার মধ্যে কাজ করেছে একটিই চেতনা, সেটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশকে স্বাধীন করার চেতনা। আর এখন যারা দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে, শিল্পে সমৃদ্ধ করতে, জাতিকে শিক্ষিত করে তুলতে, দেশকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে একাগ্রচিত্তে পরিশ্রম করে চলেছে তারাও, আমি মনে করি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েই কাজ করে যাচ্ছে। তারা কাজ করে নীরবে-নিঃশব্দে, লোকচক্ষুর আড়ালে। কেউ তাদের শ্রম দিচ্ছে মাঠে ফসল ফলাতে, কেউ দিচ্ছে দেশের শিল্পায়নে। কেউ বা আবার শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে। এরা জনসমক্ষে এসে বক্তৃতা-বিবৃতি আর গলাবাজি করে না-তারা মনে করে, ওটা তাদের কাজ নয়। বক্তৃতা করে মাঠ গরম করার চেয়ে শ্রম দিয়ে, নিষ্ঠা দিয়ে সবুজ শস্যে মাঠ ভরিয়ে দেওয়া, কলকারখানা স্থাপন করে সেই কারখানার চাকা সচল রেখে দেশের মানুষের চাহিদা পূরণ করা, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা, দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া-এটাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। এটাই তাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। যাঁরা উঠতে-বসতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে মুখে ফেনা তোলেন, আর বাস্তবে কাজ করেন দেশবিরোধী, তাঁদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংজ্ঞা আর এদের সংজ্ঞা এক নয়। আর এই দুই শ্রেণির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে, এক দল বিশ্বাস করে কর্মযজ্ঞে, আর আরেক দলের হাতিয়ার তাদের বাকসর্বস্ব আস্ফালন।
কর্ম দ্বারা কিছু অর্জন করতে হলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন একটি ইস্পাতকঠিন সদিচ্ছা। সদিচ্ছা কিছু করার, সমাজকে ও দেশকে কিছু দেওয়ার। আর সেই সদিচ্ছা বাস্তবে রূপ পায় তখনই, যখন তার বাস্তবায়নের জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সততার সঙ্গে, নিষ্ঠার সঙ্গে বিরামহীন-বিশ্রামহীনভাবে পরিশ্রম করা হয়। ‘দেশকে স্বাধীন করব’ বলে একাত্তরে জোয়ান ছেলেটি ঘরে বসে থাকেনি, কিংবা মিটিং-মিছিল করেনি; ছুটে গেছে যুদ্ধক্ষেত্রে, হাতে তুলে নিয়েছে অস্ত্র। আর ৯টি মাস আহার-নিদ্রাকে হারাম জ্ঞান করে লড়াই করেছে জীবন বাজি রেখে। বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) কামরুল হাসান ভূঁইয়ার কথায় ‘বিজয়ী হয়ে ফিরব, নইলে ফিরবই না’। তখন কিছু পাওয়ার চিন্তা মুক্তিযোদ্ধার মাথায় আসেনি, তাঁর চাওয়া ছিল একটাই : দেশকে শত্রুমুক্ত করে স্বাধীন করা।
একটি কথা এখানে জোর দিয়ে বলতে চাই। যুদ্ধক্ষেত্রেই হোক আর রাষ্ট্রজীবন-সমাজজীবনেই হোক, বিজয় অর্জন করতে হলে লড়াই করতেই হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের চিহ্নিত শত্রু ছিল পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী। আমরা সেই পশুশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়লাভ করেছি। আর স্বাধীনতার পর এখন আমাদের চিহ্নিত শত্রু আর কোনো একটি বা দুটি পশুশক্তি নয়, হাজারো পশুশক্তি আমাদের ঘিরে ধরেছে। একটা তো অবশ্যই স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি। আর অন্যগুলোর মধ্যে আরো হাজারটা পশুশক্তির নাম করা যায়। যারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সমাজে বিভেদ-বিভাজন সৃষ্টি করে, যারা দুর্নীতির পর্বতশৃঙ্গে বসে সততা-সাধুতার বুলি আওড়ায়, লুটপাট আর সন্ত্রাস যাদের পেশা এবং নেশার মতো-এ রকম শত শত শত্রু আমাদের রক্তের দামে কেনা দেশটার অস্তিত্বকে আজ হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই সব শত্রুর মোকাবেলা করতে হলে চাই ঐক্যবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল প্রতিরোধ। দুঃখজনক হলেও সত্যি, স্বাধীনতার পর আজ প্রায় অর্ধশতাব্দী পার হতে চলল, অথচ আমরা দেশ থেকে অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলা দূর করতে পারলাম না। যদি পারতাম, তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সত্যিকার অর্থে বিশ্বাসী যে বিশাল কর্মীবাহিনী আমাদের ফসল ফলায়, কলে-কারখানায় কাজ করে, তাদের সংগঠিত করে আরো এগিয়ে যেতে পারতাম।
এর জন্য কতকগুলো মৌলিক বিষয়ের প্রতি অতীব জরুরি ভিত্তিতে আমাদের দৃষ্টি দেওয়া দরকার। প্রথমেই আসে সুশাসন ও ন্যায়বিচার। আমাদের সংবিধানে আছে-আইন সকলের ওপর সমভাবে প্রযোজ্য, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয় ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখি? বাস্তবে আইনের প্রয়োগ তো শুধু ‘চিকন আলিদের’ ওপরই হয়। তাদের ক্ষেত্রে পান থেকে চুন খসলেই আইনের খড়গ তাদের ঘাড়ের ওপর পড়ে। আর ‘মোটা মিয়ারা’ সাত খুন, তারপর সাত দুগুণে চৌদ্দ খুন করলেও আইনের রক্ষকরা চোখ বুজে থাকেন। কৃষিঋণের পাঁচ হাজার টাকা শোধ না করলে একজন প্রান্তিক চাষির দফা রফা হয়ে যায়, অথচ ধান্দাবাজ ধড়িবাজ তৈলবাজ বহু মোটা মিয়া শুধু খুঁটির জোরে ব্যাংকের পাঁচ হাজার কোটি টাকা মেরে দিয়েও দিব্যি খোশ হালতে থাকে।
দ্বিতীয়ত, আমাদের রাস্তাঘাটে, হাটে-বাজারে, অফিস-আদালতে নিয়ম-কানুন-শৃঙ্খলার যে চরম লঙ্ঘন দেখা যায়, তার প্রতিকারের কথা আমরা সিরিয়াসলি চিন্তা করি না। রাস্তায় গাড়ি চলবে, পথচারী যাতায়াত করবে কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন মেনে। উন্নত দেশে কাউকে তা বলে দিতে হয় না। প্রত্যেক পথচারী অথবা যানবাহনের চালক নিজ দায়িত্বে নিয়ম মেনে চলে। অথচ আমাদের দেশে ট্রাফিক সিগন্যাল, সেই সঙ্গে পুলিশ, ইদানীংকালে কোথাও কোথাও কমিউনিটি পুলিশ, সব কিছু থাকা সত্ত্বেও অনেকে অবলীলাক্রমে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে। কারণ সেই আইন অমান্যকারী জানে তার কিছু হবে না। কেন? এর উত্তর, লোকটি অমুকের গাড়ির চালক, অথবা আরোহী হুজুর একজন হোমরা-চোমরা কেউ, আর না হয় কোনো বিশেষ দলের কারো সাথে তার লাইন আছে। সেই কিংবদন্তির ‘জানো আমি কে?’ ফ্যাক্টর। যাঁরা রাস্তাঘাটে ট্রাফিক আইন প্রয়োগ করেন, তাঁদের আগে স্থির করতে হবে তাঁরা প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাছবিচার করবেন, না তা সমভাবে প্রয়োগ করবেন। তারও আগে তাঁরা নিজেরা কোনো অবস্থায়ই আইন ভঙ্গ করবেন না-এরূপ মুচলেকা দিতে হবে। তেমনি অফিসের বড় সাহেব রোজ দেরিতে অফিসে গিয়ে আশা করতে পারেন না তাঁর অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সবাই সময়মতো অফিসে আসবেন। ‘আপনি আচরি ধর্ম পরকে শিখাও’ কথাটি এসব ক্ষেত্রে খুবই প্রযোজ্য।
মৌলিক বিষয়াদির মধ্যে আরো আসে কিছু কিছু অতি সাধারণ অথচ অতীব জরুরি বিষয়। যেমন রাস্তাঘাটে যেখানে-সেখানে মলমূত্র ত্যাগ, কফ-থুথু ফেলা ইত্যাদি। স্বাস্থ্যবিধির কথা তো আছেই, বিষয়টা যে কীরূপ দৃষ্টিকটু ও অরুচিকরও তা খুব কমসংখ্যক লোকই মনে হয় অনুধাবন করেন। এগুলো আইন করে বন্ধ করা যাবে মনে করলে ভুল হবে। এগুলো মজ্জাগত অভ্যাসের ফসল। শৈশবে পরিবারে বা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এগুলো শিক্ষা দিতে হয়। নইলে ছেলেবেলা থেকে গড়ে ওঠা এসব বদভ্যাস কোনো দিন পরিত্যাগ করা যায় না। সেই সঙ্গে আরো দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে। এর একটি শৃঙ্খলা ও অপরটি নিয়মানুবর্তিতা। শৃঙ্খলার মূল কথা হচ্ছে, আইনের প্রতি, নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে যেকোনো কাজ সুন্দরভাবে সুষ্ঠুভাবে গুছিয়ে করা। নিজের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই অধিকার প্রয়োগের সময় অন্যের অধিকার যাতে ক্ষুণœ না হয় সে ব্যাপারে সজাগ থাকা। গান শোনা যেমন আমার নাগরিক অধিকার, তেমনি গান শুনতে গিয়ে মাইকে বিকট আওয়াজ তুলে অন্যের শান্তি বিনষ্ট না করাও আমার দায়িত্ব। এ বিষয়গুলো আমাদের সমাজে চিরকাল অবহেলিত। আমরা চেঁচিয়ে কথা না বললে মনে হয় কথা বলে যেন সুখ পাই না। কিন্তু এতে যে পাশের মানুষটির অসুবিধা হচ্ছে, সেদিকে খেয়াল নেই। অথচ উন্নত বিশ্বের সব দেশে আস্তে কথা বলাটাই ভদ্রতা। ওটাই নিয়ম। ওই সব দেশে নিয়ম মেনে চলাটাই যেমন নিয়ম, আমাদের দেশে যেন নিয়ম ভাঙাটাই নিয়ম। কোথাও সবাই লাইন করে দাঁড়িয়ে আছে কাউন্টার সেবা পাওয়ার জন্য বা বাসে ওঠার জন্য। হঠাৎ দেখা গেল কেউ কেউ এসে সবাইকে ঠেলেঠুলে সামনে চলে গেলেন। এঁরা মনে করেন, লাইনে না দাঁড়িয়ে সামনে চলে যাওয়া এক ধরনের স্মার্টনেস। বড় রকম বাহাদুরি। এঁদের ধারণা, লাইনে দাঁড়ানোর নিয়ম তাঁদের জন্য নয়, ওটা যদু-মধু-কদুদের জন্য। তাঁরা হচ্ছেন নানা গুণে গুণান্বিত বিশিষ্ট ব্যক্তি, সব নিয়ম-কানুনের ঊর্ধ্বে। একটু ভেবে দেখলে দেখবেন, সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন এঁরাই। এঁদের না ঠেকালে সমাজ এগোবে না। এঁরা সব সময় যতিচি?টাকে সরিয়ে দিয়ে আইন বানাতে পারদর্শী। কোন যতিচি?? গল্পের সেই যতিচি?। সেই যে দেয়ালের গায়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল : এখানে প্রস্রাব করিবেন না, করিলে ৫০ টাকা জরিমানা। এক ব্যক্তি এই বাক্যের ‘কমা’টিকে একটু এগিয়ে নিয়ে এসে বসিয়ে দিল করিবেন শব্দটির পরে। ফলে কথাটি দাঁড়াল এইরূপ : এখানে প্রস্রাব করিবেন, না করিলে... ইত্যাদি। নিজের কাজ হাসিলের জন্য, স্বার্থসিদ্ধির জন্য একশ্রেণির লোক সব আইন-কানুন ভাঙচুর করে ইচ্ছামতো সব কিছু ওলট-পালট করে দিচ্ছে। অথচ যাদের এগুলো রোধ করার কথা, তাদের মুখে রা-টিও নেই। সমাজ রসাতলে কি আর এমনি এমনি যায়।
আর সময়জ্ঞানের কথা যদি বলি, তাহলে সময় না মেনে চলার ব্যাপারে আমরা বোধ হয় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হব। আর এটাও সারা জীবনের অভ্যাসের ফল। এটাও ছোটবেলা থেকে আমরা বড়দের দেখে দেখে শিখি। আমাদের পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠান সময়মতো শুরু না হওয়াটাই যেন নিয়ম। সবখানেই সেই ৯টার গাড়ি কয়টায় আসবের মতো ব্যাপার। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে আপনি কোথাও নির্ধারিত সময়ে গিয়ে হাজির হলে নাকাল হবেন। দেখবেন, হয়তো আয়োজকরাই অনুপস্থিত। অথবা তখনো চেয়ার-টেবিল টেনেটুনে আসর সাজানো হচ্ছে। গ্রামের স্কুলগুলোতে শিশুরা সময়মতো গিয়ে খেলাধুলা, ঝগড়াঝাঁটি, মারামারিতে লিপ্ত হয়। এদিকে শিক্ষক-শিক্ষিকারা তশরিফ আনেন নিজেদের ইচ্ছামতো সময়ে। আর এটা দেখতে দেখতে শিক্ষার্থীরাও মনে করে, কোথাও দেরিতে যাওয়াটাই বোধ হয় নিয়ম। তারা বাড়িতে দেখছে, মা-বাবা বিয়ের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাচ্ছে এক ঘণ্টা দেরিতে। স্কুলে গুরুমহাশয়-মহাশয়ারা আসছেন স্কুল শুরু হওয়ার আধা ঘণ্টা-এক ঘণ্টা পর। এই ছেলে বা মেয়ে এরপর বাকি জীবন ‘লেট লতিফ’ হিসেবে কাটিয়ে দেবে-এ আর বিচিত্র কী। শুরু করেছিলাম মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দিয়ে। সেখানেই ফিরে যাই। যুদ্ধক্ষেত্রে আমাদের ছেলেরা যদি নিয়মকানুন-শৃঙ্খলা না মানত, তাদের দলপতি সামনে যেতে বললে যদি পেছনে যেত, রাত ৩টায় অমুক স্থানে জমায়েত হতে হবে জেনেও ঘুমিয়ে থাকত ক্যাম্পে, তাহলে কী হতো? তাহলে আরো হাজার বছরেও আমরা পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত হতে পারতাম না। আল্লাহর শুকুর, আমাদের ছেলেরা তা করেনি। তারা মাতৃভূমিকে ভালোবেসে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছে, দেশকে করেছে শত্রুমুক্ত। আর তাদের রক্তঋণ আমরা শোধ করছি নিজেদের মধ্যে হানাহানি-মারামারি করে, আইন-কানুন-শৃঙ্খলাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে দুর্নীতিবাজ ব্যাংক লুটেরা কালো টাকার মালিকদের প্রশ্রয় দিয়ে! ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! এটাই কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা? তা, নিশ্চয়ই না। বক্তৃতা-বিবৃতির বস্তাপচা মডেল বাদ দিয়ে সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হলে আমরা অবশ্যই আমাদের সব দুঃখ-দুর্দশাকে জয় করে এগিয়ে যেতে পারব। এটা আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।
 লেখক : সাবেক সচিব, কবি