Share |

প্রশ্নপত্র ফাঁস কেলেঙ্কারী: পদ্ধতি নয়, মানুষের চরিত্র বদলাতে হবে

বাংলাদেশে একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের কেলেঙ্কারীর পর এবার পরীক্ষায় বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতি বদলানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। গত সপ্তাহে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত মতে, নতুন পদ্ধতিতে পরীক্ষার দিন সকালে একটি ইলেক্ট্রনিক যন্ত্র ব্যবহার কওে দ্বৈব চয়নের মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে প্রশ্নপত্র। পরীক্ষা শুরুর আধঘন্টা আগে পরীক্ষার কেন্দ্রগুলোতে ঐ যন্ত্রের মাধ্যমে প্রশ্ন জানিয়ে দেওয়া হবে। কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত তখন ঐ প্রশ্নগুলো বোর্ডে লিখে তা পরীক্ষার্থীদের জানিয়ে দেবেন। প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে বাংলাদেশের দায়িত্বশীলদের এই চমৎকার আইডিয়া কতটুকু কার্যকর হবে সে প্রশ্ন ভবিষ্যতের জন্য তোলা থাক। তবে এ সিদ্ধান্ত যে যুগান্তকারী তাতে দ্বিমত প্রকাশের সুযোগ কম। কারণ আগামীতে আর কোন পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ছাপা হবে না। পুরো পদ্ধতিটাই নাকি হবে ডিজিটালাইজড। যুগ যুগ ধরে এই বাংলাদেশেই ছাপানো প্রশ্নপত্রে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিয়েছেন। সেই ব্যবহার বিলোপ একটা যুগের অবসানই ঘটাবে বটে।

কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান শ্লোগান ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রতি এই সিদ্ধান্তটি উপহাস হিশেবে প্রতিভাত হতে পারে। কারণ, পুরো পদ্ধতি যেখানে ডিজিটালাইজ করে যন্ত্রের সততার উপর নির্ভরশীলতা বাড়ানো হচ্ছে সেখানে একেবারে শেষ ধাপে এসে কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্তকে বোর্ডে প্রশ্নগুলো লিখে দিতে হবে। পুরো বিষয়টা কেমন যেনো ডিজিটাল থেকে এনালগে প্রত্যাবর্তনের মতো হচ্ছে।

প্রকৃতপক্ষে যন্ত্রের আর পাসওয়ার্ডের উপর পূর্ণ ভরসা করা কিংবা আস্থা স্থাপন করা সমাধান নয়। আমরা কি জানিনা বিশাল ডিজিটাল ব্যাংক চুরির ঘটনাটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ডিজিটাল উপায়েই তো লোপাট হলো। বাস্তবতা হচ্ছে, সব নির্ভরযোগ্য পদ্ধতির পেছনে যেমন মানুষ কাজ করে তেমনি এগুলোর অপব্যবহারের জন্যও মূলত দায়ী সেই মানুষই। সুতরাং মানুষের চরিত্র না বদলালে পুরো পৃথিবী উ?ে দিলেও বাংলাদেশের কোন লাভ হবে না। অসৎ এবং দুশ্চরিত্রের মানুষগুলো ঠিকই অসদুপায় অবলম্বনের ব্যবস্থা উদ্ভাবন করবে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে দুর্নীতি। রাষ্ট্রীয় ও সরকারী পর্যায়ে এমন কোন স্তর আছে কি যেখানে দুর্নীতি গ্রাস করেনি? যারা দেশ চালান, দেশের আইন প্রণয়ন করেন তারা যদি বিনা ভোটে নির্বাচিত হতে পারেন, নানা ঘটন-অঘটনের পরও যদি দায়িত্বপ্রাপ্তরা স্বপদে বহাল থাকেন তাহলে প্রশ্ন ফাঁসের মতো বিষয়টি বাংলাদেশে অগ্রহণীয় হওয়ার কথা নয়।

বলা হচ্ছে, বর্তমান পরীক্ষা ব্যবস্থায় প্রায় ১০ হাজার ব্যক্তি পরীক্ষা গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থাকায় প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা সম্ভব নয়। এটিকে যুক্তি হিসেবে মেনে নিলে তো বলতে হয়, বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের সম্পৃক্ততায় কোন ভালো কাজ কিংবা সৎকর্ম করা সম্ভব নয়।

আমরা মনে করি, বাংলাদেশের দুর্নীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি না বদলালে কোন অন্যায় ও  অসৎ কর্ম প্রতিরোধ সম্ভব নয়। এখানে আরেকটি কথা গুরুত্বপূর্ণ - পদ্ধতি ডিজিটালাইজ করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেলো বলে মনে করা ভুল। কারণ, এতে এটিই প্রমাণের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় যে, মানুষই অসৎ। সুতরাং যন্ত্রই ভরসা। আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশটাই পুরো দুনিয়া নয়।