Share |

প্রতিবাদই বেশি জুটলো সৌদি যুবরাজের কপালে

পত্রিকা রিপোর্ট
লন্ডন, ১২ মার্চ : ব্রিটেনে আসবেন বলে বেশ প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছিলেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। যুক্তরাজ্যে তাঁকে স্বাগত জানানোর আহবান জানিয়ে বড় বড় বিল বোর্ড টাঙ্গানো হয় লন্ডনে। অনলাইনে ঢুঁ মারলেই চোখে পড়ে যুবরাজের লন্ডন আগমনের বিজ্ঞাপন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মোহাম্মদ বিন সালমানের লন্ডন আগমনের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ মানুষের প্রতিবাদই বেশি চোখে পড়লো। 
গত ৯ থেকে ১১ মার্চ ব্রিটেন সফর করেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। সালমানের সফরকে কেন্দ্র করে ব্রিটেনজুড়ে প্রতিবাদ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠে। 
রক্ষণশীল ধারার ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি তাকে লালগালিচা অভ্যর্থনা দিয়েছে। তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় মোহাম্মদ বিন সালমানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন বিরোধী দল ও মানবাধিকার কর্মীরা। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রচারণাও চালানো হচ্ছে সফররত যুবরাজের বিরুদ্ধে।
যুবরাজের সফরকালে দুই দেশের মধ্যে বিপুল অঙ্কের একাধিক চুক্তি হয়। মানবাধিকারকর্মীদের উদ্যোগে ডাউনিং স্ট্রিটে এই সফরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়। প্রতিবাদকারীরা প্রচারণা গাড়ি নিয়ে লন্ডনের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছেন। প্রচারণা গাড়িতে লাগানো পোস্টারে লেখা হয়েছে, ‘যুদ্ধাপরাধী মোহাম্মদ বিন সালমানকে যুক্তরাজ্যে স্বাগত জানানো উচিত নয়।’
যুক্তরাজ্যের হাজার হাজার মানুষ সালমানের সাথে বৈঠক বাতিল করার জন্য প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মের কাছে অনলাইনে আবেদন দাখিল করেন। তাদের বক্তব্য, মে যেন সালমানের কাছে মানুষ হত্যা বন্ধের দাবি জানান। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারকারীরা এমন ছবিও দিয়েছেন, যেখান দেখা যচ্ছে যুবরাজকে স্বাগত জানিয়ে প্রচারণা গাড়ি বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করছে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন অবশ্য ৩২ বছর বয়সী যুবরাজের প্রশংসা করেছেন তার ‘ভিশন ২০৩০’-এর জন্য। তিনি মনে করেন, সৌদি আরবকে আধুনিক করতে সংস্কার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন যুবরাজ। ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে বরিস লিখেছন, সৌদি আরবের এখন যুক্তরাজ্যের সমর্থন দরকার। 
উল্লেখ্য, যুবরাজ সালমান সৌদি আরবে নারীদের গাড়ি চালানো ও দেশটিতে চলচ্চিত্র দেখার ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা বাতিল করেছেন। ভালোবাসা দিবস উদযাপনও শুরু হয়েছে সেখানে। 
কিন্তু মানবাধিকার কর্মীদের বক্তব্য : যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়নক এই দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি এখনো খুব খারাপ।
সৌদি যুবরাজের দৃশ্যমান সংস্কার কর্মসূচি দেখেও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কমেনি মানবাধিকার কর্মীদের। প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টিও সোচ্চার মানবাধিকার হরণের বিরুদ্ধে। দলের শীর্ষনেতা জেরেমি করবিন প্রতিবাদকারীদের সাথে সুর মিলিয়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী মের উচিত যুবরাজকে জানিয়ে দেয়া, সৌদির নেতৃত্বে ইয়েমেনে যে ‘ভয়াবহ’ বোমাবর্ষণ হচ্ছে তা চলতে থাকলে ব্রিটেন আর তাদের অস্ত্র সরবরাহ করবে না। তার বক্তব্য, ‘মের জানানো উচিত সৌদি আরবজুড়ে ব্যাপক মাত্রায় যেভাবে মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার ক্ষুণœ করা হয় তার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান ব্রিটেনের।’ ২০১৫ সালের মার্চ মাস থেকে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সেনারা ইয়েমেনে বোমাবর্ষণ শুরু করলে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গরিব দেশটিতে মানবিক পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়। ইয়েমেনে অন্তত ১০ হাজার মানুষ ইতোমধ্যে মারা গেছে।
যুক্তরাজ্যের অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কয়েকটি সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী। যুক্তরাজ্য সরকার হাজার হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র সৌদি আরবে রফতানি করার অনুমতি দিয়েছে গত তিন বছরে। 
বেডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল রজার্স বলেছেন, যুক্তরাজ্য সরকার সৌদি আরবকে অস্ত্রের অনেক বড় বাজার হিসেবে দেখে। সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিশেষ কোনো চিন্তা নেই এই সরকারের। 
আরব শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে পারবে কাতার
এদিকে রিয়াদে অনুষ্ঠেয় আরব শীর্ষ সম্মেলনে (আরব সামিট) অংশ নিতে কাতারের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে না, বলে জানিয়েছেন সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। চলতি মাসের শেষের দিকে এ সামিট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। চলতি সপ্তাহে মিসরে গিয়েছিলেন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। সে সময় মিসরের স্থানীয় পত্রিকার সম্পাদকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি ওই মন্তব্য করেন। গত বুধবার আল শুরুক পত্রিকায় এ সংক্রান্ত একটি খবর প্রকাশিত হয়।
উল্লেখ্য, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মিসর গত বছরের জুন মাসে কাতারের সাথে সম্পর্ক ছেদ করে। দেশগুলোর অভিযোগ, কাতার বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীকে সমর্থন দেয়ার পাশাপাশি ইরানের সাথে সম্পর্ক রা করে চলছে। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ইরান, তুরস্ক ও সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোকে ‘সমকালীন শয়তানের ত্রিভুজ’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, ইরান, রাশিয়া ও সিরিয়ার সাথে সম্পর্ক রহিত করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সৌদি আরব।