Share |

বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস : মুক্তিযোদ্ধাদের অপমানের অবসান চাই


উনিশ শ’ একাত্তরের ২৬ মার্চ অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে বাঙালির চুড়ান্ত যুদ্ধ-ঘোষণা বিশ্ব ইতিহাসে আলোড়ন সৃষ্টিকারি একটি ঘটনা। জীবনের সর্বস্ব উৎসর্গ করে হলেও দেশ স্বাধীনের প্রত্যয় নিয়ে মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো বাঙালি সেদিন। আকাঙক্ষা ছিলো মুক্তি মিলবে, আশা ছিলো স্বাধীন দেশে আত“মর্যাদা নিয়ে জীবনযাপন। মুক্ত দেশের স্বাধীন নাগরিকের সকল অধিকার বিনা বাধায় এবং?কোন চোখ রাঙানী ছাড়াই ভোগ করা যাবে। কিন্তু একাত্তরে সশস্ত্র যুদ্ধ করে স্বাধীন ভূখণ্ড অর্জন করলেও জাতির প্রকৃত আকাঙক্ষা যে ‘মুক্তি’ তা এই সাড়ে চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আসেনি। 
বছর ঘুরে ফিরে এসেছে ২৬ মার্চ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। কদিন পরেই বাংলাদেশ উদযাপন করবে স্বাধীনতার ৪৭ বছর। দীর্ঘ ২৩ বছরের শোষণ আর দুঃশাসনের পর উনিশ শ’ একাত্তর সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকবাহিনি বাঙালি জাতিকে স্তব্ধ করে দিতে অতর্কিতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। কিন্তু পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের লেলিয়ে দেয়া হানাদার বাহিনির আক্রমণ রুখে দেয় বাঙালিরা বিপুল বিক্রমে। অনিবার্য হয়ে ওঠে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। 
কিন্তু সেই মুক্তিযুদ্ধের লালিত স্বপ্ন ও আকাঙক্ষা পূরণ তো এখন সুদুর পরাহত। মানুষের প্রাণ বাঁচানোই এখন দায়। সরকার ও রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি আর অনিয়ম স্থায়ী আসন গেঁড়ে নিয়েছে। নৈরাজ্যই যেনো এখন বাংলাদেশের প্রতিদিনের নির্মম বাস্তবতা। আর এসব কারণে বিশ্বের মানুষ- বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে সৃজনশীল অনেক অর্জনের দেশ ও জাতি হিশেবে দেখলেও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দেশ হিশেবে দেখতে নারাজ। 
দু:খজনকভাবে বাংলাদেশ বরাবরই হয়েছে দুই গোষ্ঠীর পারস্পরিক হিংসা, জেদাজেদী আর তাদের সংকীর্ণ স্বার্থের বলি। এসবের নেপথ্যে রয়েছে দেশটির অপরাজনীতি। স্বাধীনতার অর্ধ শত বছর পেরিয়ে এসেও বিদেশি মিডিয়ার কাছে বাংলাদেশ হচ্ছে- দুই বেগমের ঝগড়াস্থল। কিন্তু এটি তো জানা কথা, বাংলাদেশে রাজনীতি ঠিক না হলে কিছুই ঠিক হবে না। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি আনয়ন আর উন্নত মূল্যবোধসম্পন্ন জাতি গড়ে তোলা অসম্ভব। কিন্তু স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি তো ছিলো তা-ই। আর এই প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রেখেই সেই মুক্তির স্বপ্ন নিয়েই দেশের কোটি মানুষের মতো প্রবাসে থাকা বাঙালিরাও সমানভাবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অনেকে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। আজ থেকে সাতচল্লিশ বছর আগে বাঙালির এই বীরত্বপূর্ণ ইতিহাসের অংশীদার হয়েছিলেন যেসব প্রবাসী তাদের অনেকেই এখন জীবিত নেই। জীবিতরাও লোকচক্ষুর অনেকটা অন্তরালেই আছেন। বাংলাদেশ সরকার মহান মুক্তিযুদ্ধে বিদেশীদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বর্তমানে সম্মাননা প্রদান করে সম্মানিত করছে। এই উদ্যোগ দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। এই প্রসঙ্গে আমাদের বিগত দিনের আহবান পুনর্ব্যক্ত করে বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাঙালিদের অবদানকে স্বীকৃতি দিলে একটি ঐতিহাসিক মূল্যায়ন সম্পন্ন হতো। এই স্বীকৃতি ব্রিটেনে বাঙালির পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও হবে উদ্দীপনার, বাঙালি হিশেবে হবে গর্বের বিষয়।
এবারে স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে রাজধানীর মহাখালীর জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের মুক্তিযোদ্ধা ওয়ার্ডের যে করুণ চিত্র বেরিয়ে এসেছে তা কলঙ্কজনক বললেও কম বলা হবে। জাতি হিসেবে এ লজ্জা আমরা রাখবো কোথায়? সাংবাদিকদের কাছে মুক্তিযোদ্ধারা জানিয়েছেন, সেখানে তাদেরকে ‘জন্তু জানোয়ার’ বলে মনে করা হয়। তাঁরা প্রশ্ন করেছেন, ‘আমরা কি জন্তু জানোয়ার?’  স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে বাংলার সকল শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সশ্রদ্ধ অভিনন্দন জানিয়ে তাদের এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য আমরা দায়িত্বশীলদের প্রতি আহবান জানাচ্ছি।