Share |

এক ছক্কায় শেষ বাংলাদেশের স্বপ্ন

১৮ মার্চ : সাকিব সে রুমালটা কি যতœ করে রেখে দিয়েছিলেন কোথাও? ২০১২ সালের এশিয়া কাপে সাকিব যে রুমাল দিয়ে অশ্রু মুছেছিলেন? এক হাত দিয়ে মুখ আড়াল করছেন সাকিব, তাঁর বুকে মাথা রেখে অঝোরে কাঁদছেন মুশফিক, এ ছবিটা ৬ বছর পরও আমাদের চোখের কোণে অশ্রু এনে দেয়। যে ছবিটা আমাদের বুকে অব্যক্ত এক হাহাকারের জন্ম দেয়, সে ছবিটা আজও মোছা গেল না। শেষ বলে কার্তিকের এক ছক্কায় ৪ উইকেটে হেরে গেল বাংলাদেশ।
ফাইনাল ম্যাচ হলে এমনই হতে হয়! একটি ম্যাচ জমাতে যা দরকার হয়, সবই যেন ছিল। ১৬৭ রানের লক্ষ্য, ফাইনালের মতো চাপের ম্যাচে যেন আদর্শ। ১৮০ কিংবা ২০০ হলে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকত, আবার ২০ রান কম হলে ভারত। উত্তেজনা জিইয়ে রাখতেই যেন বাংলাদেশ ঠিক মাপে মাপেই রানটা করেছিল!
ভারতের রান তাড়ার প্রতিটি পদক্ষেপও যেন ঠিক সেই মাপেই হলো। ঝোড়ো শুরুতে মাত্র ১৫ বলেই ৩২ রান ভারতের। বাংলাদেশের কাঁধগুলো মাত্র ঝুলতে শুরু করেছিল, এমন অবস্থায় আউট ধাওয়ান! রানটা নড়ার আগেই সুরেশ  রায়না আউট। ৩২ রানে ২ উইকেট হারাল ভারত। বাংলাদেশই তো এগিয়ে গেল, তাই না?
ভুল, রোহিত শর্মা যে উইকেটে ছিলেন। চার-ছক্কা মারতে লাগলেন নিজের ইচ্ছামতো, অন্য প্রান্তে তাঁকে অনুসরণ করলেন লোকেশ রাহুল। দশম ওভারেই তাই লক্ষ্যের অর্ধেক তুলে ফেলল ভারত। ২ উইকেটে ৮৩ রান, পরিষ্কার এগিয়ে ভারত। এমন অবস্থায় ওভারের তৃতীয় বলে রুবেলের বাউন্সার। হুক করতে গিয়ে সাব্বিরের হাতে ধরা পড়লেন রাহুল। জমে উঠল ম্যাচটা।  ম্যাচটা তবু জমছিল না। ওই যে রোহিত যে আউটই হচ্ছিলেন না। ক্যারিয়ারের ১৪তম ফিফটি পেয়ে গেছেন, ইনিংসের ১০ ওভারও পেরিয়ে গেছে। ইনিংসের দ্বিতীয় ভাগেই যে বেশি ভয়ংকর এই ওপেনার। ১৪তম ওভারে তাই ম্যাচটা জমালেন নাজমুল ইসলাম। তাঁর সৃষ্ট নাগিন নাচটা বিখ্যাত হয়ে গেলেও পুরো টুর্নামেন্টে নাজমুলের উদযাপন দেখা যাচ্ছিল না। আগের চার ম্যাচে যে একটা উইকেটও পাননি! ফাইনালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উইকেটটা তাঁর ভাগ্যে ছিল বলেই হয়তো। লং অন দিয়ে ছক্কা মারতে গিয়ে মাহমুদউল্লাহর কাছে ধরা পড়লেন রোহিত। ভারত তখন জয় থেকে ৬৯ রান দূরে, হাতে ৪০ বল।
এভাবেই চলল ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্ত। এক মুহূর্তে মনে হচ্ছে ভারতই জিতবে, পরের মুহূর্তেই বাংলাদেশ! সেটা বাংলাদেশের দিকে ঘুরিয়ে দিলেন মোচ্চাফিজ। ৩ ওভারে ৩৫ রান দরকার ছিল ভারতের। মোস্তাফিজ এলেন, প্রথম ৪ বলই ডট! পরের বলে ১ রান। শেষ বলে আউট মনীষ পান্ডে। ম্যাচ তো বাংলাদেশের!
কিন্তু রুবেলের ৩ বলেই আবারও ভারত ফেবারিট! প্রথম বলেই ছক্কা, পরের বলে চার, আবার ছক্কা! ১২ বলে ৩৪ রান থেকে ৯ বলে ১৮ রানের দূরত্বে ভারত। রুবেলের ওভারে এল ২২ রান। শেষ ওভারে মাত্র ১২ রান লাগবে ভারতের। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের ঠিক ১২ রানই দরকার ছিল। সমস্যা একটাই, বাংলাদেশের মূল বোলারদের আর কারও ওভার বাকি নেই!  সৌমের প্রথম বলটা ওয়াইড। ৬ বলে ১১ রান। ডট, ১। ৪ বলে ১০ রান! আবারও ১, ৩ বলে ৯ রান। চতুর্থ বলে দুর্ভাগ্যক্রমে ৪, ২ বলে ৫ রান। পরের বল, উড়িয়ে মারলেন শংকর। দুই ফি?ার ধাক্কা খেলেন, তবে বল হাতছাড়া হলো না। আউট! ১ বলে ৫ রান দরকার ভারতের। বাংলাদেশের দরকার ৪-এর নিচে যেকোনো কিছু! এমন চাপ নিয়ে কখনো কি বল করেছেন সৌম্য? বাংলাদেশের কোনো বোলার?
কার্তিকের এক ছক্কায় শেষ হয়ে গেল! ৮ বলে ২৯ রানের এক ইনিংসে বাংলাদেশের সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। অভিনন্দন বাংলাদেশ...
চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য সব সময় শিরোপা উঁচু করে তুলে ধরতে হয় না। চ্যাম্পিয়ন হিসেবে মানুষের হৃদয়ের আসনে জায়গা করে নেওয়া যায় শিরোপা না জিতেই। ভারতের বিপক্ষে হেরে নিদাহাস ট্রফির চকচকে ট্রফিটা নাই-বা হাতে তুলতে পারলেন সাকিব-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহরা। কিন্তু দুর্দান্ত লড়াইয়ে মানুষের হৃদয়টা তো জয় করে নিয়েছেন তাঁরা! শিরোপা তো তাঁরা প্রায় জিতেই গিয়েছিলেন। কিন্তু ক্রিকেটীয় রোমাঞ্চের কাছেই পরাজিত তাঁরা। এমন হারও তো অনেক গৌরবের, অনেক আনন্দের। বাংলাদেশকে অভিনন্দন। নিদাহাস ট্রফিতে যাত্রাটাই তো ছিল অনেক শঙ্কা নিয়ে। ঘরের মাঠে ত্রিদেশীয় সিরিজে শিরোপা জিততে না পারার ব্যর্থতার সঙ্গে যোগ হয়েছিল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি সিরিজের হার। গোটা দলের মানসিক অবস্থা ছিল বিধ্বস্ত। টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের চোট দলের আত্মবিশ্বাসটাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল ভালোভাবেই। সেই অবস্থা থেকেই তারা লঙ্কানদের বিপক্ষে দুটি দুর্দান্ত জয় উপহার দিল দেশের মানুষকে। ফাইনালে উঠে ভীতি ছড়াল শক্তিশালী ভারতীয় শিবিরে। খেলায় একজনকে হারতে হবে বলেই যেন ফাইনালে হারল বাংলাদেশ। আরও একবার ফাইনালে হারের কষ্ট পেতে হলেও ক্রিকেটপ্রেমীরা গর্বই করছেন ক্রিকেটারদের নিয়ে। ফাইনালে যেন দুটি প্রতিপক্ষের সঙ্গেই লড়তে হয়েছে বাংলাদেশকে। শুক্রবারের ম্যাচে নানা নাটকীয় ঘটনা আর শেষ পর্যন্ত মাহমুদউল্লাহর বীরত্বে শ্রীলঙ্কাকে হারানোতেই হয়তো স্বাগতিক দর্শকেরা চলে গিয়েছিল বিপক্ষে। পরাক্রমশালী ভারতীয় দলের সঙ্গে লড়াইটা হয়েছে কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামের গ্যালারি ভর্তি দর্শকের সঙ্গেও। ভারতীয় দলের ড্রেসিংরুমকে শেষ বল পর্যন্ত উৎকণ্ঠায় রাখাও তো কম কথা নয়। অনেক ব্যবহারে কথাটা ক্লিশে শোনাতে পারে, কিন্তু সত্যিকার অর্থেই কাল দিনের শেষে জিতেছে ক্রিকেটই। ক্রিকেটকে জেতানোর জন্য কৃতিত্ব দুই দলেরই। এর মধ্যে বাংলাদেশ নিজেদের অংশটা নিয়ে গর্ব তো বোধ করতে পারেই।
এ নিয়ে পাঁচটি ফাইনাল হারল বাংলাদেশ। দুঃখ হচ্ছে? কষ্ট হচ্ছে? হতাশ আপনি? আশা রাখুন। কে জানে, ছোট ছোট এই ফাইনালগুলো হেরেই হয়তো অনেক বড় ফাইনাল জয়ের জন্য তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশ। সে দিনটার জন্য অপেক্ষা কিন্তু আনন্দেরই। বাংলাদেশ এখন ভয়ডরহীন এক দল: রোহিত ঘাম দিয়ে জ্বর ছুটেছে রোহিত শর্মার। কাল শেষ বলে ছক্কাটা না হলে ভারতজুড়ে তাঁর মুণ্ডুপাত যে হতো না, জোর দিয়ে বলা কঠিন। বাংলাদেশের কাছে হার এখনো ভারতের কেউ মানতে পারে না। আমজনতা থেকে শুরু করে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ বা মিডিয়া। আর ফাইনালে হার হলে তো ছিল আরেক বিপদ। কিন্তু ড্রেসিংরুমে উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে থাকা রোহিত দেখলেন, ১২ বলে ৩৪ রানের সমীকরণ কী অবিশ্বাস্যভাবে মিলিয়ে দিলেন দিনেশ কার্তিক, খোদ অধিনায়কই যাঁর ওপর আস্থা না রেখে আগে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়েছিলেন বিজয় শংকর নামের অনভিজ্ঞ তরুণকেই! কার্তিকের প্রশংসা করছেন, তবে বাংলাদেশকেও প্রাপ্য প্রশংসা দিতে ভোলেননি রোহিত, ‘ওরা ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলে, এটা সব সময়ই ভালো। কখনো কখনো এতে হিতে বিপরীত হয় বটে, যখন সবকিছু আপনার পক্ষে থাকে না। কিন্তু এটাই ওদের ক্রিকেটের ধরন। তারা অবশ্যই দারুণ ভালো একটা দল। গত তিন বছরে আমার দেখেছি ওরা কতটা বদলে গেছে। ওদের বেশ কজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার আছে, যারা উঠতি ক্রিকেটারদের পথ দেখাচ্ছে।’
কাল ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে রোহিত শেষ ওভার প্রসঙ্গে সৌম্যের পাশেও দাঁড়ালেন, ‘আমরা জানতাম সৌম্য ওদের আসল বোলার নয়। বেশির ভাগ সময় ওকে এক-আধবার ব্যবহার করা হয়েছে। আর শেষের ওভারগুলোতে বল করা কখনোই সহজ নয়। তখন সব সময় বোলারের ওপর চাপ থাকে, ব্যাটসম্যানের ওপর নয়।’