Share |

দুর্নীতির মামলা : ‘পাস্ট অ্যান্ড ক্লোজড’ বনাম আইনের শাসন

মিজানুর রহমান খান

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) তার একটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় আইনসহ সব নিয়মনীতি লঙ্ঘন, প্রতারণা ও শর্ত ভঙ্গ করেছে। দরপত্র ডেকে সর্বনিম্ন দরদাতা নির্বাচিত করার পর বিনা কারণে তা বাতিল করে কাজ দিয়েছে দরপত্রে অংশ না নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানকে। সর্বোচ্চ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে যে এই কাজগুলো করা হয়েছে ‘অসৎ উদ্দেশ্যে’। কিন্তু অতীতে সংঘটিত হয়ে গেছে (পাস্ট অ্যান্ড ক্লোজড) গণ্য করে এই অপরাধসংক্রান্ত একটি পুনর্বিবেচনার আবেদন সম্প্রতি খারিজ করে এক ব্যতিক্রমী নজির স্থাপন করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

পুনর্বিবেচনার আবেদনকারীর আইনজীবী ছিলেন সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু। তিনি বলেছেন, যা অন্যায় ও অবৈধ, তা সময় পেরিয়ে গেলেও ন্যায় বা বৈধ হয় না। আদালতে তিনি এ যুক্তি দিয়েছিলেন ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের বরাতে। তিনি বলেছেন, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ২০০৭ সালের ওই রায়ে যুক্তরাজ্যের প্রখ্যাত বিচারপতি লর্ড ডেনিংয়ের বরাতে বলা হয়েছে, প্রতারণা করে নেওয়া সিদ্ধান্ত-তা সেটি আদালত বা মন্ত্রী যাঁরই হোক না কেন-কখনো গ্রহণযোগ্য নয়।

কিন্তু বিটিসিএলের অবৈধ কর্ম অতীতে সম্পাদিত হয়ে গেছে মর্মে রিভিউ আবেদন খারিজ করা প্রকারান্তরে অবৈধ কর্মটির আইনি সুরক্ষা কি না, সেই প্রশ্নটি সামনে নিয়ে এসেছে।

দেশে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে ঢাকা থেকে কুয়াকাটা-বেনাপোল-আখাউড়া পর্যন্ত উচ্চ ক্ষমতার ট্রান্সমিশন লিংক স্থাপনের জন্য ২০১৬ সালের এপ্রিলে আন্তর্জাতিক দরপত্র ডাকে বিটিসিএল। মূল্যায়ন শেষে ১৫ সেপ্টেম্বরে যোগ্য অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে তুর্কি কোম্পানি নেটাসকে নির্বাচিত করা হয়। নেটাসকে কার্যাদেশ দেওয়ার জন্য সুপারিশ করে কমিটি। এরপর ১ নভেম্বর কোনো কারণ ছাড়াই ওই দরপত্র বাতিল করা হয়।

আবার এই দরপত্র প্রক্রিয়াধীন থাকা অবস্থায় এতে অংশ না নিয়েই টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস) ভারতীয় কোম্পানি তেজাসের যন্ত্রপাতি সরবরাহের বিষয়ে একটা প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবটিতে ভুল থাকায় পরে আবারও প্রস্তাব দেয়। দ্বিতীয় প্রস্তাবের মূল্যায়ন চলাকালে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং টেশিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তেজাসের আতিথেয়তায় ভারত ভ্রমণ করেন। বিটিসিএল, টেশিস ও বিএসসিসিএল-এই কাজে সম্পৃক্ত তিনটি সরকারি কোম্পানিরই পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব। এরই মধ্যে টেশিসের প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটি বলেছে, ভারতীয় কোম্পানি তেজাস থেকে টেশিসের যন্ত্রপাতি আনার প্রস্তাব অগ্রহণযোগ্য। প্রতিষ্ঠানটি এ কাজের যোগ্য নয়।

এরপর তেজাসের খরচে ভারত ভ্রমণ করেন বিটিসিএল, টেশিস ও বিএসসিসিএলের তিন এমডি। এর তিন দিন পর ওই তিন এমডি ভারতে থাকা অবস্থায় ২০১৬ সালের ১ নভেম্বর নেটাসকে বাদ দিতে দরপত্র বাতিল করা হয়। ৪ নভেম্বর তিন এমডি তেজাস থেকে যন্ত্রপাতি ক্রয় ও টেশিসকে কাজ দেওয়ার অঙ্গীকার করে। এরপরই ১৫ নভেম্বর তেজাস থেকে যন্ত্রপাতি আনার জন্য টেশিসের সঙ্গে চুক্তি হয়। কিন্তু তেজাসের কাছে এ-জাতীয় যন্ত্রপাতি অন্য কোনো দেশে সরবরাহের বা ব্যবহারের সনদ নেই।

অভিযোগ নি?ত্তি না হওয়া পর্যন্ত আর কাউকে ওই কাজ না দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা বিটিসিএল না মানায় হাইকোর্টে রিট আবেদন করে নেটাসের পক্ষ থেকে এর প্রতিকার চাওয়া হয়। ২০১৬ সালের ১২ ডিসেম্বর হাইকোর্ট টেশিসের সঙ্গে বিটিসিএলের ওই চুক্তি অবৈধ বলে বাতিল করে দিয়ে পুনঃ দরপত্র ডাকতে বলেন। বিটিসিএল হাইকোর্টের এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে। পুনঃ দরপত্র কেন, এ প্রশ্নে নেটাসও আপিল করে।

 আপিল বিভাগে বিটিসিএলের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। আদালতকে তিনি মৌখিকভাবে বলেছেন, এ কাজ জরুরি বলে ও জনস্বার্থে সরাসরি দেওয়া হয়েছে। তত দিনে যন্ত্রপাতির সরবরাহও শুরু হয়েছে। ২০১৭ সালের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও মির্জা হোসেন হায়দার হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত আপিল বিভাগের বেঞ্চ রায় দেন। পুরো রায়ে সর্বসম্মতভাবে আইন ও বিধি ভঙ্গ এবং প্রতারণা বিষয়ে পর্যবেক্ষণ ছিল। তাতে বলা হয়, বিটিসিএলের দরপত্র বাতিল করা এবং তেজাস-টেশিসকে কার্যাদেশ দেওয়ার মাধ্যমে কেবল আইনই ভাঙা হয়নি, বরং অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ এবং সরকারি ক্রয় আইন ইচ্ছেমতো প্রতিহত বা নস্যাৎ করা হয়েছিল।

তবে রায়ের শেষাংশে ‘জনগুরুত্ব’ ও ‘জরুরি’ বিবেচনায় কাজ দেওয়ার উল্লেখ করে টেশিস ইতিমধ্যে যন্ত্রপাতি সরবরাহ শুরু করায় আপিল বিভাগ শর্তসাপেক্ষে তেজাস-টেশিসকে দেওয়া কাজে বাধা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন। অবশ্য কিছু শর্তও দেওয়া হয়-এক. নেটাসকে ১০ হাজার মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়া। দুই. চুক্তিতে উল্লেখিত তারিখের মধ্যে কাজ শেষ করা। তিন. উল্লেখ করা টাকার মধ্যে কাজ সম্পন্ন করা।

নেটাসের আইনজীবী আবদুল মতিন খসরু বলেছেন, কাজ চলতে দেওয়ার জন্য আপিল বিভাগের আরোপিত কোনো শর্তই প্রতিপালিত হয়নি। ঢাকা-কুয়াকাটার কাজ শেষ করার যে নির্ধারিত সময় ছিল, তা মানা হয়নি। দফায় দফায় সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। এ ছাড়া চুক্তিতে এই কাজের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০ কোটি টাকা। শুল্ক, ভ্যাটসহ ২৬ কোটি টাকা। কিন্তু বিটিসিএলকে ৩৭ কোটি টাকা দিতে টেশিস চিঠি পাঠায়। বিটিসিএল বোর্ডকে পাঠায় ৩১ কোটি টাকা অনুমোদনের জন্য। ক্ষতিপূরণের শর্তটিও পূরণ করা হয়নি।

গত বছর ২৯ অক্টোবর নেটাস শর্ত না মানাসহ নানা প্রমাণ উল্লেখ করে আপিল বিভাগের আদেশের বিরুদ্ধে পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। আবদুল মতিন খসরু বলেন, ‘আদালতে বলেছি যে আইন ভাঙা আর প্রতারণার কথাটি রায়ের নানা জায়গায় বলা হয়েছে। কিন্তু রায়ের উপসংহার আদালতের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। আমরা তাই ক্ষতিপূরণ নয়, ন্যায়বিচার পেতে আদালতে এসেছি।’

এ বছরের ২৮ জানুয়ারি শুনানির শুরুতেই দায়িত্বরত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিয়া আবদুল মতিন খসরুকে প্রশ্ন করেন, তাঁর মক্কেল কোনো ক্ষতিপূরণ নিতে সম্মত কি না। তখন আবদুল মতিন খসরু ও নেটাসের আরেক আইনজীবী ফজলে নূর তাপস আদালতে উপস্থিত প্রতিষ্ঠানটির পাওয়ার অব অ্যাটর্নির কাছে এর উত্তর জানতে চান। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা ক্ষতিপূরণ চাইনি, নিতে ইচ্ছুক নই। আমরা বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী সুবিচার প্রার্থী।’ বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিয়া এই বক্তব্য হলফনামা দিয়ে পেশ করে আবার বেলা সাড়ে ১১টায় শুনানির জন্য আসতে বলেন। সেই শুনানিতে দায়িত্বরত প্রধান বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিয়া বিটিসিএলের আইনজীবী হিসেবে উপস্থিত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকে বলেন, এই কাজ কবে কীভাবে কতটুকু হয়েছে, তার বিস্তারিত প্রতিবেদন বিটিসিএলকে হলফনামার মাধ্যমে কোর্টে পেশ করতে হবে। মাহবুবে আলম টেশিসকে দিয়ে প্রতিবেদনটি দেওয়ার প্রস্তাব দিলে আদালত তা নাকচ করে দিয়ে বলেন, বিটিসিএলকেই সেটি দিতে হবে। এরপর আদালত ১ ফেব্রুয়ারি রায়ের তারিখ দেন।

১ ফেব্রুয়ারি আবদুল মতিন খসরু অসুস্থ হয়ে বিদেশ থাকায় দায়িত্বরত প্রধান বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিয়া ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করেন। তবে ১ ফেব্রুয়ারি ছিল তাঁর শেষ কার্যদিবস। ১১ ফেব্রুয়ারি নতুন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের দৈনিক কার্যতালিকায় এ মামলাটি ছিল তিন নম্বরে। শুনানিতে আবদুল মতিন খসরু বিটিসিএলের হলফনামার ৭ নম্বর পৃষ্ঠার প্রতি আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সেখানে স্বাক্ষরের তারিখ ছিল ২ জুলাই ২০১৮। মতিন খসরু বলেন, বিটিসিএল আগে প্রতারণা করেছিল, আবারও করেছে। তখন বিচারপতি ইমান আলী বলেন, সাধারণত মানুষ আগের বছরের সাল লিখে ফেলে, ভবিষ্যৎ কখনো লেখে না। মতিন খসরু এ সময় প্রতারণা বিষয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় পড়তে শুরু করেন। সেটি শেষ করার আগেই প্রধান বিচারপতি রায় ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, এই মামলা ‘পাস্ট অ্যান্ড ক্লোজড’। তখন আবদুল মতিন খসরু বলেন, ‘দেশের সর্বোচ্চ আদালত ফ্রড (প্রতারণা) আর ইললিগ্যালিটিকে (আইনভঙ্গ) কখনো অ্যালাউ করতে পারে না। এটাই মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল।’

এই মামলায় বিটিসিএলের পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের দাঁড়ানো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে মাহবুবে আলম বলেছেন, তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নন, বিটিসিএলের আইনজীবী হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন। মামলাটিতে রাষ্ট্রপক্ষ অংশ নেয়নি। তবে অ্যাটর্নি জেনারেলের ‘ব্যক্তিগত’ এই উপস্থিতিকে অনৈতিক বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক আইনমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শফিক আহমেদ। তিনি বলেন, যেকোনো অবৈধ কাজ বা আইনের লঙ্ঘন রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী। এ রকম একটি বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের সম্পৃক্ততার যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দরপত্রে দুর্নীতিসংক্রান্ত আলোচিত তিন মামলা (নাইকো, গ্যাটকো ও বড় বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি মামলা) চলমান। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর বিভিন্ন সময়ে নাইকো মামলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জড়িত থাকার অংশ এবং বার্জ মাউন্টেড মামলা হাইকোর্ট খারিজ হয়। এর বিরুদ্ধে আপিল করতে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান দুদককে চিঠি দিলেও সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের নেতৃত্বাধীন দুদক কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। তবে খালেদা জিয়ার পক্ষে ওই তিনটি মামলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ-সংক্রান্ত রিটগুলো হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে খারিজ হয়েছে।

উল্লিখিত বিটিসিএল মামলার ‘পাস্ট অ্যান্ড ক্লোজড’-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত থেকে ওই তিনটি মামলার আসামিরা কোনো সুবিধা নেওয়ার সম্ভাবনার বিষয়ে জানতে চাইলে আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘ওই মামলায় হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ থেকে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের সুবিধা আশা করা স্বাভাবিক এবং তাঁরা তা করবেন। ভবিষ্যতে দুদক অনুসন্ধান করে বিটিসিএলের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাও করতে পারে। কারণ, ওই তিনটি মামলায় আপিল বিভাগ বলেছেন, অপরাধের সংঘটন প্রকাশিত হলে, তাই তারা মাত্রা নির্ধারিত হবে আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হলে কোনো রিট মোকদ্দমার রায় দ্বারা দুদকের এখতিয়ার রহিত করা যাবে না। দুর্নীতির গন্ধ খুঁজতে দুদকের এখতিয়ার অবারিত।

বিষয়টি দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের নজরে আনলে তিনি বলেন, তাঁরা অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখছেন। আমরা এর ফলাফল জানার অপেক্ষায় রইলাম।

লেখক : প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক