Share |

রাশিয়ার সঙ্গে ঠান্ডা লড়াই চলছে

পত্রিকা রিপোর্ট
লন্ডন, ২ এপ্রিল : সাবেক রুশ গুপ্তচরকে রাসায়নিক প্রয়োগের ঘটনা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। পালটা পালটি কূটনীতিক বহিষ্কারের পর ব্রিটেনের অনন্ত ২০টি মিত্র দেশ থেকে ১৪০ জনের বেশি রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করা হয়েছে। জবাবে রাশিয়াও ওইসব দেশের সমান সংখ্যাক কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছে। সর্বশেষ হিথ্রো বিমান বন্দরে রাশিয়ার একটি যাত্রীবাহী বিমানে তল্লাশি চালানোর ঘটনায় নতুন রূপ নিয়েছে এই বিরোধ। ব্রিটেনের এই আচরণকে উস্কানিমূলক আখ্যা দিয়ে রাশিয়া বলেছে, এটা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। পরিস্থিতি বলছে, স্নায়ু যুদ্ধ আবার ফিরে এসেছে। নিরব যুদ্ধের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব। 

রাশিয়ার পরিবহন মন্ত্রণালয় বলেছে, লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে রুশ বিমানে তল্লাশির বিষয়ে উপযুক্ত ব্যাখ্যা না পেলে পালটা পদক্ষেপ নেয়া হবে।

স্থানীয় সময় শুক্রবার (৩০ মার্চ) ব্রিটিশ কর্মকর্তারা রাশিয়ার অ্যারোফ্লোট এয়ারবাসএ৩২১-তে তল্লাশি চালায়। তল্লাশির সময় বিমানের ক্রুদের সেখানে থাকতে দেওয়া হয়নি।

এসময় বিমানের ক্যাপ্টেনের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও তারা কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। বিমানটি মস্কো থেকে লন্ডনে পৌঁছার একদিন পর সেটাতে তল্লাশি চালানো হয়।

রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া যাখারোভা বলেছেন, এর মাধ্যমে ব্রিটেন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে।

তিনি বলেছেন, এটি ব্রিটেনের পক্ষ থেকে আরও একটি উসকানি। তারা বিমানের ভেতরে এমন কিছু করেছে যা তারা গোপন রাখতে চায় এবং এ কারণেই রুশ বিমানের কাউকে তাদের সাথে থাকতে দেয়নি।

৫০ ব্রিটিশ কূটনীতিককে রাশিয়া ছাড়তে হবে

সাবেক রুশ গুপ্তচরকে বিষ প্রয়োগের ঘটনা নিয়ে বিরোধের জেরে ব্রিটেনের মোট ৫০ কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছে রাশিয়া।

এর আগে, যুক্তরাজ্য থেকে ২৩ রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কারের জবাবে ২৩ ব্রিটিশ কূটনীতিককে বহিষ্কারের ঘোষণা দেয় রাশিয়া। পরে মস্কো জানায়, যুক্তরাজ্য ও রাশিয়ার কূটনৈতিক মিশনে সমান সংখ্যক লোক থাকতে হবে। তাই আরো অন্তত ২৭ ব্রিটিশ কূটনীতিককে রাশিয়া ছাড়তে হবে।

ব্রিটেনে সাবেক রুশ গুপ্তচর সের্গেই স্ক্রিপাল ও তার মেয়ে ইউলিয়ার ওপর বিষ প্রয়োগের ঘটনায়, রাশিয়াকে দায়ী করে আসছে ব্রিটেন। এর জের ধরে যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ প্রায় দেড়শ রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করে।

প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ কূটনীতিকসহ সেসব দেশের সমান সংখ্যক কূটনীতিককে বহিষ্কারের ঘোষণা দেয় রাশিয়া।

বিশ দেশ মিলে ১৪০ রুশ কূটনীতিক বহিস্কার 

যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি জার্মানি, ফ্রান্স, ইউক্রেইন, কানাডা এবং ইউরোপের আরো নানা দেশসহ মোট ২০ টি দেশ মিলে সোমবার রুশ কূটনীতিক বহিষ্কারের সংখ্যা ১৪০ ছাড়িয়ে গেছে। রাশিয়ার ৬০ কূটনীতিককে বহিষ্কারের আদেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনা? ট্রাম্প। একইসঙ্গে সিয়াটলে বন্ধ করা হয়েছে রাশিয়ার কনস্যুলেটও।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি নমনীয় মনোভাবের জন্য সমালোচিত ট্রাম্প এই প্রথম ক্রেমলিনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিলেন। তাছাড়া, ইতিহাসেও একসঙ্গে এত বেশি রুশ কূটনীতিক বহিস্কারের নজির নেই।

ট্রাম্পের বহিষ্কারাদেশ প্রাপ্তদের ৪৮ জন ওয়াশিংটনে রাশিয়ার দূতাবাসের গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং ১২ জন নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ কার্যালয়ে রুশ মিশনে কর্মরত বলে জানিয়েছেন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

ইইউ সদস্য দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন করে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে একমত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের রুশ কূটনীতিক বহিষ্কারের ঘোষণার পরপরই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ১৫টি সদস্য দেশ রাশিয়ার কূটনীতিক বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে।

যুক্তরাজ্য: ২৩, যুক্তরাষ্ট্র: ৬০, কানাডা: ৪, অষ্ট্রেলিয়া ২, ইউক্রেইন: ১৩, পোল্যান্ড: ৪, ফ্রান্স: ৪, জার্মানি: ৪, চেক প্রজাতন্ত্র: ৪, লিথুনিয়া: ৩, ইতালি: ২, ডেনমার্ক: ২, নেদ্যারল্যান্ডস: ২, স্পেন: ২, আলবেনিয়া: ২ এবং এচ্চোনিয়া, লাটভিয়া, ক্রোয়েশিয়া, ফিনল্যান্ড, রোমানিয়া, সুইডেন এবং নরওয়ে ১ জন করে রুশ কূটনীতিক বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে।

রাশিয়াও জবাবে দেশগুলোর সমান সংখ্যাক কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছে।

গত ৪ মার্চ ইংল্যান্ডে সলসবেরির উই?শায়ারে একটি পার্কের বেঞ্চ থেকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পক্ষত্যাগী সাবেক রুশ গুপ্তচর সের্গেই স্ক্রিপাল (৬৬) ও তার মেয়ে ইউলিয়াকে (৩৩) উদ্ধার করা হয়। পরীক্ষায় তাদের নোভিচক গ্রুপের একটি নার্ভ এজেন্ট দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। ৭০ ও ৮০’র দশকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এ সিরিজের নার্ভ এজেন্টগুলো তৈরি করেছে। যেগুলো সবচেয়ে মারাত্মক নার্ভ এজেন্ট (উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক) হিসাবে বিবেচিত।

যুক্তরাজ্যের অভিযোগ, রাশিয়া সরকারের নির্দেশেই স্ক্রিপাল ও তার মেয়েকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ওই সময় যুক্তরাজ্যের পক্ষে নিজেদের সমর্থনের কথা জানায়। পরে ইইউও যুক্তরাজ্যের পাশে দাঁড়ায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের ঘটনা এটিই প্রথম।

‘দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা’ নেওয়ার আহ্বান মে’র

পশ্চিমা ব্লক থেকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। সাবেক রুশ গুপ্তচর সের্গেই স্ক্রিপাল ও তার মেয়ে ইউলিয়াকে শক্তিশালী রাসায়নিক নার্ভ এজেন্ট প্রয়োগের অভিযোগে, পশ্চিমা দেশগুলোর রাশিয়ার বিরুদ্ধে একাট্টা হওয়ার দৃষ্টান্ত স্নায়ুযুদ্ধের পর আবারও দেখলো বিশ্ব।

তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, পুরো পশ্চিমাবিশ্ব মে’র ডাকে ব্রিটেনের পাশে এমন একসময় দাঁড়িয়েছে যখন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ২০২০সালের মধ্যেই বেরিয়ে আসছে দেশটি।

লন্ডনে সিনিয়র কেবিনেট সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে মঙ্গলবার মে বলেন, মিত্রদেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে তাদের কঠোর মনোভাব দেখাচ্ছে শুধুই ব্রিটেনের সাথে একাত্মতা জানানোর জন্য নয় বরং তারা অনুধাবন করতে পেরেছে ‘রাশিয়া’ আসলেই একটি অনেকবড় হুমকির নাম।

মে বলেন, ব্রিটেনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাশিয়ার বেপরোয়া ও আগ্রাসী ভূমিকার বিপক্ষে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে মিলে এখনও আরও অনেককিছু করার বাকি। আর তা হতে হবে দীর্ঘমেয়াদী কোনও ব্যবস্থা।