Share |

রাশিয়ার কি ‘উচিত’ শাস্তি হচ্ছে?

মশিউল আলম
যুক্তরাজ্যের উই?শায়ার কাউন্টির সালিসবারী শহরে সাবেক রুশ গুপ্তচর সের্গেই স্ক্রিপাল ও তাঁর মেয়ে ইউলিয়া স্ক্রিপালের ওপর স্নায়ুধ্বংসকারী বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ (নার্ভ এজেন্ট) প্রয়োগের পেছনে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের হাত আছে-যুক্তরাজ্যের এই অভিযোগ এখন পর্যন্ত অনুমানভিত্তিক। গত ১২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে হাউস অব কমন্সে বলেন, এটা খুবই সম্ভব (‘হাইলি লাইকলি’) যে এই ঘটনায় রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতা আছে। এর প্রতিক্রিয়ায় রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেন, ‘ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সার্কাস শো’ হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের অভিযোগ রাশিয়া গোড়া থেকেই ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছে, দুই সপ্তাহ পরেও রাশিয়ার অবস্থানের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। রাশিয়া যুক্তরাজ্যের অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ দাবি করেছে, কিন্তু যুক্তরাজ্য এখনো কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেনি।

পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মেকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়েছে, সের্গেই স্ক্রিপাল ও ইউলিয়া স্ক্রিপালের ওপর যে নার্ভ এজেন্ট প্রয়োগ করা হয়েছে, তার নাম ‘নোভিচক’। এটা একটা রাসায়নিক অস্ত্র, এ পর্যন্ত উদ্ভাবিত রাসায়নিক অস্ত্রগুলোর মধ্যে সর্বাধিক মাত্রায় প্রাণঘাতী। রুশরা এটা তৈরি করেছে সোভিয়েত আমলে।

রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২৮ মার্চের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্য যে নার্ভ এজেন্টের কথা বলছে, রাশিয়া সেটার নমুনা চেয়েছে, কিন্তু যুক্তরাজ্য তা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। যুক্তরাজ্য স্ক্রিপালের মেয়ে ইউলিয়ার ব্যাপারে রুশ কর্তৃপক্ষের কনস্যুলার সহযোগিতার অনুরোধেও সাড়া দেয়নি। উল্লেখ্য, সের্গেই স্ক্রিপাল এখন যুক্তরাজ্যের নাগরিক হলেও তাঁর মেয়ে ইউলিয়া রুশ নাগরিক। রাশিয়া যুক্তরাজ্যের মাটিতে তাদের এই নাগরিকের হত্যাচেষ্টার ব্যাপারে তদন্ত শুরু করেছে এবং এই কাজে যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা চেয়েছে। কিন্তু যুক্তরাজ্য কর্তৃপক্ষ তাদের কোনো সহযোগিতা করছে না। এমনকি তিন সপ্তাহ ধরে তারা ইউলিয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে রাশিয়াকে কোনো তথ্য দেয়নি। তবে ২৯ মার্চ যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, ইউলিয়ার অবস্থার উন্নতি হচ্ছে, এখন আর তিনি ‘ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে’ নেই।

সের্গেই স্ক্রিপাল ও তাঁর মেয়ে ইউলিয়ার কথিত হত্যাচেষ্টার ব্যাপারে তদন্ত শুরু করেছে রাসায়নিক অস্ত্রনিরোধবিষয়ক আন্তরাষ্ট্রীয় সংস্থা অর্গানাইজেশন ফর প্রোহিবিশন অব কেমিক্যাল উইপনস (ওপিসিডব্লিউ)। এই সংস্থার কাজ হবে, বাবা ও মেয়েকে হত্যার চেষ্টায় যা ব্যবহার করা হয়েছে, তা রাসায়নিক অস্ত্র কি না, তা নির্ণয় করা। অর্থাৎ, নোভিচক বা অন্য কোনো রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়ে থাকলে সংস্থাটির তদন্তে তা ধরা পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু কারা এই কাজ করেছে, এর সঙ্গে রাশিয়ার সরকার বা অন্য কোনো পক্ষের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা এই সংস্থার তদন্তের আওতাধীন বিষয় নয়।

যদি এমন হয় যে তদন্তে এটা নিশ্চিতভাবে বেরিয়ে এল, নোভিচকই ব্যবহার করা হয়েছে, তাহলেই কি প্রমাণিত হয়ে যাবে যে এটা রাশিয়ারই কাজ?

না। কারণ, নোভিচক এক রাশিয়া ছাড়া আর কারও কাছে নেই, অন্য কেউ এই রাসায়নিক অস্ত্র তৈরি করতে পারেনি বা পারে না, এমন কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না। এমন কথাও হলফ করে বলা যাবে না, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার ঠিক আগে-পরের চরম নৈরাজ্যকর সময়ে নোভিচক তৈরির কারিগরি কৌশল বিদেশি কোনো রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রবহির্ভূত কোনো গ্রুপের হাতে পাচার হয়ে যায়নি।

সুতরাং সের্গেই ও ইউলিয়া স্ক্রিপালের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগের যে অভিযোগ রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্য করে চলেছে এবং পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের প্রচারণা যে অভিযোগকে বিশ্ববাসীর কাছে প্রায়-বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে, তা সন্দেহাতীতভাবে সত্য বলে প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন। আমার সন্দেহ, যুক্তরাজ্য এটাকে সত্য বলে প্রমাণ করার প্রয়োজনও মনে করে না। এই ঘটনাকে রাশিয়াবিরোধী প্রচারণার কাজে ব্যবহার করার যে সুযোগ যুক্তরাজ্য পেয়েছে, সেটাই তার বিরাট প্রাপ্তি। আসলে প্রাপ্তিটা যুক্তরাজ্যের একার নয়, গোটা পশ্চিমা বিশ্বের। এই সুযোগে তারা ‘স্বৈরাচারী’ পুতিনের ‘বর্বর’ রাশিয়াকে শিক্ষা দিতে লেগে পড়েছে। আমরা হয়তো অচিরেই দেখতে পাব, রাশিয়াকে ঘায়েল করার এই অভিযানের নেতৃত্ব যুক্তরাজ্যের হাত থেকে চলে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে কিংবা হয়তো নেতৃত্বটা গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই আছে।

কিন্তু স্ক্রিপাল-কাণ্ডে ক্ষতি হলো কার? কালপ্রিট-ক্রিমিন্যাল বলে আঙুল তোলা যাচ্ছে কার দিকে? গণহারে কূটনীতিক বহিষ্কারের পর নানা রকমের অবরোধ আসছে কার বিরুদ্ধে? এই তিনটা প্রশ্নেরই উত্তর রাশিয়া।

তাহলে রাশিয়ার কী দরকার ছিল এই অপকর্মটা করতে যাওয়ার? এ বিষয়ে পশ্চিমা পর্যবেক্ষকদের ভাষ্যটা আগে শুনে নিই। তাঁরা বলছেন, স্ক্রিপাল-কাণ্ডে লাভ হয়েছে ভ্লাদিমির পুতিনের। যুক্তরাজ্য রুশ কূটনীতিক বহিষ্কারের ঘটনায় রাশিয়ায় তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে গেছে; যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে রুশ জনগণের তেমন কোনো উৎসাহ ছিল না, সেই নির্বাচনেই তাঁরা দলে দলে গিয়ে ভোট দিয়েছেন পুতিনকে। গতবারের চেয়ে প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি ভোট পেয়ে তিনি আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন।

তার মানে কি এই যে প্রেসিডেন্ট পুতিন রাশিয়ার রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে শুধু নিজের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে স্ক্রিপাল-কাণ্ড ঘটিয়েছেন? বিশ্বাস করা কঠিন। কারণ, এটা ছাড়াই পুতিনের নির্বাচনে জেতা শতভাগ নিশ্চিতই ছিল, এ কথা সবাই জানত।

২.

প্রশ্ন হলো, রাশিয়া যদি সের্গেই স্ক্রিপালকে হত্যাই করবে, তাহলে এত বছর পরে কেন? স্ক্রিপাল গ্লাভনোয়ে রাজভেদিতেলনোয়ে উপ্রাভলেনিয়ের (জিআরইউ) বড় কর্মকর্তা ছিলেন। এটা রুশ সামরিক বাহিনীর মেইন ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টরেট, কাজ করে মূলত বিদেশে। এই সংস্থায় কার্যরত অবস্থায় ১৯৯৫ সালে স্পেনে স্ক্রিপালের যোগাযোগ ঘটে ব্রিটিশ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এমআই ৬-এর সঙ্গে। তিনি এমআই-৬কে রাশিয়ার গোয়েন্দাবৃত্তি সম্পর্কে অনেক গোপন তথ্য সরবরাহ করেন; ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে কর্মরত ৩০০ রুশ গোয়েন্দা সম্পর্কে তথ্য দেন। এই ডবল এজেন্টের কাজ তিনি করেছেন টানা ৯ বছর ধরে। ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে ব্রিটেন থেকে মস্কো ফেরার কিছুদিন পর রুশ কর্তৃপক্ষ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। রাশান ক্রিমিন্যাল কোডের আওতায় তাঁর বিচার চলে মস্কোর আঞ্চলিক সামরিক আদালতে। বিচারে তিনি ‘হাই ট্রিজন ইন দ্য ফর্ম অব এসপিওন্যাজ’-এর দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন ২০০৬ সালে। তাঁর ১৩ বছরের কারাদণ্ড হয়।

২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার গোয়েন্দা বিনিময় হয়; যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার ১০ রুশ গোয়েন্দাকে রাশিয়ায় ফেরত পাঠানোর বিনিময়ে সের্গেই স্ক্রিপালসহ তিনজন রুশ গোয়েন্দাকে ছেড়ে দেওয়া হয়, যাঁরা যুক্তরাজ্যের এমআই-৬ ও যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএর হয়ে কাজ করে রুশ কর্তৃপক্ষের হাতে ধরা পড়ে দণ্ডিত ও কারারুদ্ধ হয়েছিলেন। স্ক্রিপাল কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর যুক্তরাজ্যে চলে যান ২০১০ সালের জুলাই মাসে। পরের বছর উই?শায়ার কাউন্টির সালিসবারী শহরে বাড়ি কেনেন, সেই বাড়িতে সপরিবারে বসবাস শুরু করেন।

তারপর প্রায় সাত বছর পেরিয়ে গেছে, সের্গেই স্ক্রিপালের বয়স এখন ৬৭ বছর, রুশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গোপন তথ্য সরবরাহ করার মতো অবস্থানে তিনি আর নেই। তাহলে রাশিয়া কী কারণে তাঁকে হত্যা করতে চাইবে? আর চাইলে কেন এত বছর পরে? কেন তাঁকে ২০০৪ সালেই মস্কোর লুবিয়ানকায় মাথার পেছনে একটা মাত্র গুলি করে নিকেশ করা হয়নি (যেমনটা করা হয় বলে পশ্চিমা প্রচারমাধ্যম আমাদের বলে থাকে) ?

সের্গেই স্ক্রিপালকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র জন্য হত্যা করতে চাইলে তাঁকে বিচার করে কারাদণ্ড দেওয়ার কী প্রয়োজন ছিল? কেনই-বা গোয়েন্দা বিনিময় ব্যবস্থায় তাঁকে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে যুক্তরাজ্যে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল?

সের্গেই স্ক্রিপালের সঙ্গে তাঁর ৩৩ বছর বয়সী মেয়ে ইউলিয়াও আক্রান্ত হয়েছেন। যেদিন (৪ মার্চ) এই ঘটনা ঘটেছে, তার ঠিক আগের দিনই ইউলিয়া মস্কো থেকে যুক্তরাজ্যে বাবার কাছে বেড়াতে গেছেন। বাবা না হয় ‘বিশ্বাসঘাতক’, কিন্তু মেয়ের অপরাধ কী? ইউলিয়াকে টার্গেট করা হলো কেন?

তা ছাড়া, নোভিচক নামের যে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলে যুক্তরাজ্য বলছে, সেটা কি রাশিয়া থেকে সালিসবারীতে বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে? নিষিদ্ধ ও অতিমাত্রায় প্রাণঘাতী রাসায়নিক অস্ত্র কি একটা স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের কাস্টমস-নিরাপত্তা বা সীমান্ত প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে পাচার করা এ রকম সহজ?

এ রকম আরও অনেক প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে অবশ্য এসব প্রশ্ন দেখা যাচ্ছে না; বরং এমন একটা আবহ সৃষ্টি হয়েছে যে অধিকাংশ লোকেই মনে করছে, সের্গেই স্ক্রিপাল ও তাঁর মেয়ে ইউলিয়ার হত্যাচেষ্টার পেছনে রাশিয়ারই হাত আছে। রাশিয়ার অস্বীকারেও এই ধারণা তেমন বদলাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।

রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৮ মার্চের এক বিবৃতিতে লিখেছে, ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপগুলো অনেক প্রশ্নের উদ্রেক করে। এই ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো সম্পর্কে ব্রিটেনের জনগণকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে। সসব্রি শহরের কাছে পোর্টন ডাউন গ্রামে অবস্থিত যুক্তরাজ্যের ডিফেন্স সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ল্যাবরেটরির (ডিএসটিএল) সদর দপ্তর। সেখানে কিছুদিন আগেই ‘টক্সিক ড্যাগার’ নামের বার্ষিক কেমিক্যাল ওয়ারফেয়ার মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে, ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী ওই মহড়ায় অংশ নেয়।

প্রকৃত ঘটনা যা-ই হোক না কেন, রাশিয়ার শাস্তি শুরু হয়ে গেছে। এই শাস্তি প্রদান অভিযানে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যোগ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ ২২টি দেশ। প্রশ্ন হচ্ছে, রাশিয়ার অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই তাকে সংঘবদ্ধভাবে এ রকম শাস্তি দেওয়া উচিত হচ্ছে কি না; রাশিয়াকে এভাবে কোণঠাসা করার ফলে বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা ক্ষুণœ হতে পারে কি না।
লেখক : প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ও সাহিত্যিক