Share |

শুভ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ : বাংলা ভাষা রক্ষায় সোচ্চার হতে হবে

নতুন বছরের প্রতি মানবজাতির এ রকম অনুভুতি চিরকালিন। জাতিতে জাতিতে আলাদাভাবে দিন-বর্ষ, ভৌগলিক ও জলবায়ূ এবং উৎপাদন কেন্দ্রিক বর্ষপঞ্জি রয়েছে। সব জাতির অনুভুতি তাই এক মোহনায়। পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক, পুরোপুরি বাঙালি হয়ে ওঠেন এক দিনের জন্যও। কেননা, বাংলা নববর্ষের সূচনা সৃষ্টির সাথে যুক্ত, নতুনের সাথে আলিঙ্গনাবদ্ধ। শুধু বাঙালিদের নয়- ভারতবর্ষের মানুষের জীবনযাত্রায় প্রধান উৎপাদন কৃষি। বর্ষের শুরু নতুন ফসল তোলার আবহের সাথে গাঁথা। এই নতুন ফসলের মৌ মৌ গন্ধের সাথে বাঁধা জীবন-যাপন। নতুন ফসল পাওয়ার আনন্দ, শ্রমের বিনিময়ে পণ্য অর্জন-তাই প্রাপ্তিতে মনমাতানো আনন্দে টুইটম্বুর হয়ে ওঠে মন-প্রাণ। পাওয়ার আনন্দঘন প্রতিক্রিয়া নতুন বছরের আগমনে আরো বর্ণিল হয়। সৃষ্টির উল্লাসে নববর্ষকে স্বাগত জানায় প্রতি বাঙালি। 

পয়লা বৈশাখ বাঙালির, বাংলাদেশের সর্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসবের নাম। ধর্ম ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে বসবাসরত ষোল কোটি মানুষের প্রাণের উৎসব পয়লা বৈশাখ। সত্যিকার অর্থে অসাম্প্রদায়িক উৎসবের এমন নজির কমই আছে। 

বাঙালির জীবনে নতুন বার্তা নিয়ে বাংলা নতুন বছরের আগমন। প্রতিবছর বাঙালি যে যেখানে থাকুক না কেন, নতুন চিন্তা, চেতনা ও সৃষ্টির উন্মদনায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। অতীতের না-পাওয়ার বেদনা ও গ্লানি মুছে আশার আলোয় জ্বলে স্বাগত জানায় বাঙালি নতুন বছরকে।  সাধারণত বাংলা সন বা সাল ফসলি সন হিসেবে পরিচিত। মোগল সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় সৌর সনের সাথে মিলিয়ে বা সাযুজ্য রক্ষা করে বাংলা সন গণনার রীতি চালু করা হয়। এরপর নানা সংস্কারের ছোঁয়া পেয়ে বাংলা সন এখন একটি বিজ্ঞানসম্মত পঞ্জিকার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। এ ব্যাপারে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ বাংলা একাডেমীর ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। একটি লাগাতার সংস্কার প্রচেষ্টার ফলে লিপিয়ারসহ বাংলা সন এখন সুনির্ধারিত।

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাঙালির কারণে এখন এই সাংস্কৃতিক উৎসব বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত পৃথিবীর নানা দেশে। প্রতিবছর যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর নানা দেশে বাঙালিরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, সেমিনার ও মেলার আয়োজন করে আবহমান বাংলাকে বিদেশীদের মাঝে ছড়িয়ে দেন, ভাগাভাগি করেন বাংলা নববর্ষের আনন্দ। বাংলা নববর্ষের এই আনন্দঘন মুহূর্তগুলো বছরভর বিশ্বব্যাপী বাঙালিদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক। সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধিতে ঋদ্ধ হোক বাংলাদেশ। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির আলোকমালায় উজ্জ্বল হোক হাক অনাগত দিনগুলো। মুক্তির প্রত্যয় নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যদিয়ে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের সাড়ে চার দশকের ইতিহাসে রাজনৈতিক অন্ধকারের কারণে যেসব ক্লেদ জমেছে বৈশাখী ঝড়ে তা ঝরে পড়ুক। নতুন বছরে বিশ্ব বাঙালির হৃদয়ে নতুন আশা সঞ্চারিত হোক, দূর হোক মনের জীর্ণতা।

উৎসব উদযাপনের পাশাপাশি এবারের বাংলা নতুন বছরের শুরুতে আমাদের বিশেষ করে বাংলাদেশের বাইরে থাকা বাঙালিদের একটা বিশেষ অঙ্গীকার হোক- আমরা পরবর্তী প্রজন্মকে শেকড়-বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করবো। আর এজন্য পান্তা-ইলিশ উৎসবই যথেষ্ট নয়- বাংলা সংস্কৃতির বাহন আমাদের ভাষাটাকে জীবিত রাখতে হবে। ব্রিটেনের শিক্ষা ব্যবস্থায় কোন রকমে এতোদিন বাংলার অস্তিত্ব থাকলেও তা এখন হুমকির সম্মুখিন। এখনই সজাগ না হলে তা রক্ষা করা খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। ব্রিটেনের সকল বাঙালির প্রতি বিশেষ এই দিনে আমাদের আহ্বান- আমরা সবাই যেনো নিজ নিজ অবস্থান থেকে বাংলা ভাষা রক্ষার জন্য সোচ্চার হই। 

সবার জন্য বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা। শুভ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ।