Share |

হামলার শিকার বাঙালি কাউন্সিলার প্রার্থী : টাওয়ার হ্যামলেটসে এ কোন রাজনীতি

 

পত্রিকা রিপোর্ট

লন্ডন, ০৯ এপ্রিল : টাওয়ার হ্যামলেটসের কাউন্সিলার প্রার্থী মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন হামলার শিকার হয়েছেন গত শুক্রবার ( এপ্রিল) স্থানীয় সময় বিকেলে নিজের নির্বাচনী প্রচারকালে হামলার শিকার হন তিনি তাঁর মাথা ফেটে রক্ত ঝরে চিকিৎসা শেষে তিনি বাসায় ফিরেছেন ঘটনা আবারও জাগিয়ে দিল টাওয়ার হ্যামলেটসেরনোংরা রাজনীতি বদনাম

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন টাওয়ার হ্যামলেটসের স্বতন্ত্র দল অ্যাসপায়ারের প্রার্থী লড়ছেন ওয়াপিং ওয়ার্ডে পেশায় রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী মামুন এবারই প্রথম নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন বাংলাদেশে তাঁর বাড়ি কুমিল্লার লালমাই থানার ভাবকপাড়া গ্রামে

আগামী মে ব্রিটেনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এদিন টাওয়ার হ্যামলেটসের ৪৫ কাউন্সিলর পদ নির্বাহী মেয়র পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে জমে উঠেছে প্রচার-প্রচারণা আর বাংলাদেশি-অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটসে নির্বাচন মানেই আলাদা উত্তাপ  প্রসঙ্গত নেতিবাচক ঘটনার কারণে এই কাউন্সিলের নির্বাচন বরাবরই খবরের শিরোনাম হয় এবারের নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘটে চলছে একের পর এক নাটকীয়তা তবে নাটকীয়তার সবটুকু বাঙালি প্রার্থীদের ঘিরেই সভ্য, গণতান্ত্রিক ব্রিটেনে টাওয়ার হ্যামলেটসের কতিপয় বাংলাদেশি রাজনীতিকের কর্মকাণ্ডে বারবার লজ্জায় ভাসায় পুরো কমিউনিটিকে 

হামলার শিকার কাউন্সিলর প্রার্থী আবদুল্লাহ আল মামুন গত শনিবার ( এপ্রিল) রাতে টেলিফোনে এই প্রতিবেদককে বলেন, নিজ নির্বাচনী এলাকার রিয়ারডন হাউস ভবনে ঘরে ঘরে গিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছিলেন তিনি ভবনটির দোতলায় মুখোশধারী এক লোক পেছন থেকে তাঁর মাথায় শক্ত ধাতব বস্তু দিয়ে আঘাত করে পালিয়ে যায় এতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তাঁর মাথা থেকে প্রচুর রক্ত ঝরতে থাকে কোনো রকমে ভবন থেকে নেমে আসেন আশপাশের লোকজন পুলিশকে খবর দেয় মিনিট দশেকের মধ্যে পুলিশ এসে তাঁকে উদ্ধার করে স্থানীয় রয়্যাল লন্ডন হাসপাতালে তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া হয় শনিবার ভোরে তিনি বাসায় ফেরেন মামুন জানান, তাঁর মাথায় ১১টি সেলাই দিতে হয়েছে

এই কাউন্সিলর প্রার্থী বলেন, কারও সঙ্গে তাঁর কোনো শত্রুতা নেই নির্বাচনী প্রচারকাজ থেকে বিরত রাখতে এই হামলা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন এর আগে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক লোক তাঁকে নির্বাচনী প্রচার থেকে বিরত থাকতে হুমকি দিয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি অ্যাসপায়ার দলের মেয়র প্রার্থী আবুল মনসুর অহিদ আহমদ গত শনিবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলন করে এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন তিনি বলেন, যারা হামলা চালিয়েছে, তারা সন্ত্রাসী একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এমন আচরণ কোনোভাবে কাম্য নয় অহিদ আহমদ জানান, তিনি স্থানীয় পুলিশপ্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এই ঘটনার দ্রুত বিচারের পাশাপাশি তাঁর দলের কাউন্সিলর প্রার্থীদের নিরাপত্তা চেয়েছেন  এবারের কাউন্সিল নির্বাচনকে কেন্দ্র করে টাওয়ার হ্যামলেটসের রাজনীতি বহুদা বিভক্ত বিশেষ করে বাংলাদেশিদের দুটি স্বতন্ত্র গ্রুপ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘটনা বাংলাদেশি কমিউনিটির অনৈক্য বিভাজনের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে 

টাওয়ার হ্যামলেটস বরাবরই লেবারের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কিন্তু ২০১০ সালে লুতফুর রহমান লেবার থেকে বের হয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেন লুতফুরের বিজয়ের মধ্যদিয়ে টাওয়ার হ্যামলেটসের বাঙালিরা মূলত মূলধারার বাইরে আলাদা রাজনৈতিক সত্ত্বা হিসেবে আবির্ভূত হয় টাওয়ার হ্যামলেটস বাংলাদেশি ভোটার প্রায় ৩৪ শতাংশ এই বিপুল বাঙালি ভোটারের একচেটিয়া সমর্থন লতুফুর রহমানকে সহজ জয় এনে দেয় ২০১৪ সালে লতুফুর রহমান দ্বিতীয় দফার নির্বাচিত হন কিন্তু ভোট জালিয়াতি অনিয়মের দায়ে আদালত তাঁকে এক বছরের মাথায় মেয়র পদ থেকে অপসারণ করে দেশজুড়ে টাওয়ার হ্যামলেটস পরিচিতি পায় বাংলাদেশিদের নির্বাচনী কারচুপির অভয়ারণ্য হিসেবে পরবর্তীতে এরই সূত্র ধরে ব্রিটেনের নির্বাচনী আইনে নানা শর্ত যুক্ত করা হয়েছে ভোটার নিবন্ধন থেকে শুরু করে পোস্টার ব্যালটে ভোট প্রদানসহ নানা নিয়মে কঠোরতা আনে নির্বাচন কমিশন আর টাওয়ার হ্যামলেটসে শুরু হয় পুলিশ পাহারায় ভোটগ্রহণ

২০১৫ সালে উপ-নির্বাচনে অপসারিত মেয়র লুতফুর রহমান কাউন্সিলার রাবিনা খানকে মেয়র পদে সমর্থন করেন তিনি প্রায় ২৭ হাজার ভোট পেয়ে লেবার প্রার্থী জন বিগসের কাছে অল্প ব্যবধানে হেরে যান রাবিনা খান এবারও লুতফুর রহমানের স্বতন্ত্র গ্রুপের পক্ষে মেয়র পদে লড়বেন সেটাই ছিল স্বাভাবিক কিন্তু এবার লুতফুর রহমান রাবিনাকে বাদ দিয়ে কাউন্সিলার অহিদ আহমদকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দেন এতে বিভক্ত হয়ে পড়ে লুতফুর রহমান সমর্থিত বাংলাদেশি গ্রুপটি 

লুতফুর রহমান সমর্থিন অহিদ আহমদ অ্যাসপায়ার দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন আর রাবিনা খান লড়ছেন পিপলস অ্যালায়েন্সের ব্যানারে লুতফুর সমর্থকদের গ্রুপের দুই ভাগ হয়ে যাওয়ার ঘটনা এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে নাটকীয় দিক  নির্বাচনী প্রচারের শুরুর দিকে রাবিনা খান সংবাদ সম্মেলন করে অ্যাসপায়ারের প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, তাঁকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য হুমকি দেয়া হয়েছে এই অভিযোগ অস্বীকার করে অ্যাসপায়ারের মেয়র প্রার্থী অহিদ আহমদ বলেন, নির্বাচনে ভোটারদের সহানুভূতি পেতে রাবিনা মিথ্যা অভিযোগ নিয়ে হাজির হয়েছেন এরপর সপ্তাহখানেক আগে এক সংবাদ সম্মেলনে কমিউনিটির নেতা পরিচয়ে কয়েকজন দাবি করেন, তারা কমিউনিটির বৃহত্তর স্বার্থে রাবিনা খান এবং অহিদ আহমদের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টার করেছিলেন কিন্তু রাবিনা খানের অসহযোগিতার কারণে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয় নির্বাচনের চার সপ্তাহ আগে সংবাদ সম্মেলন করে তাদের ওই চেষ্টার ফলাফল জানানোর কি দরকার পড়লো-তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয় কারণ কমিউনিটি তো তাদের সমঝোতার দায়িত্ব দেয়নি রাবিনা খান দাবি করেন, সংবাদ সম্মেলনকারীরা অহিদ আহমদের লোক রাবিনা খান সম্পর্কে কমিউনিটিতে নেতিবাচক ধারণা দিতেই ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয় বলে সমালোচনা উঠে  ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ওয়াপিং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুনের মাথা ফাটিয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটলো  এছাড়া এপ্রিল সোমবার সংবাদ সম্মেলনে হাজির হয়ে আরেক নাটকীয়তার জন্ম দেন লেবার দল থেকে বহিষ্কৃত কাউন্সিলর খালিস উদ্দিন আহমদ লেবার দলের হয়ে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা খালিস উদ্দিন এই সংবাদ সম্মেলনে রাবিনা খানের পিপলস অ্যালায়েন্স গ্রুপে যোগ দেয়ার ঘোষণা দেন তিনি পিপলস অ্যালায়েন্সের ব্যানারে কাউন্সিলর নির্বাচন করবেন বলে জানান অথচ খালিস উদ্দিন আহমদ গত মেয়র নির্বাচনে রাবিনা খানের বিরুদ্ধে লেবারের ধারালো অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছিলেন তিনি সাবেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মেয়র লুতফুর রহমানেরও কট্টর সমালোচক ছিলেন দলীয় শৃৃখলাবিধি ভঙ্গের অভিযোগে খালিছ উদ্দিনকে স্পিকার থাকা অবস্থার সাসপেন্ড করেছিল লেবার পার্টি ওই ঝামেলা চুকিয়ে তিনি দলে ফিরেছিলেন কিন্তু সম্প্রতি তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় 

টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অনেক কাউন্সিলর রয়েছেন-যারা তাঁরা কমিউনিটিকে নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা তো দূরের কথা, ইংরেজি ভাষায় কথাই বলতে পারেন না কিন্তু তাঁরা নির্বাচন করার জন্য মরিয়া কোনো নীতি নৈতিকতা কিংবা সভ্যতা-ভব্যতার বালাই ভুলে তারা রাজনীতির নামে একের পর এক কাণ্ড ঘটিয়ে বাংলাদেশি কমিউনিটকে লজ্জায় ডুবান কমিউনিটির সচেতন নেতৃবৃন্দ বলছেন, টাওয়ার হ্যামলেটসের বাংলাদেশি রাজনীতি দেখলে মনে হয়, রাজনীতির সব খারাপ দিকগুলো আমরা বাংলাদেশ থেকে নিয়ে এসেছি সত্যিকারের মেধা যোগ্যদেরই কমিউনিটির নেতৃত্বে আসা উচিত কিন্তু নোংরা রাজনীতির কারণে প্রকৃত মেধাবীরা এখানকার রাজনীতিতে আসার সুযোগ পান না কেউ কেউ বলেন, কেবল বাঙালি বলে কাউকে ভোট দেয়ার অভ্যাস থেকে বাংলাদেশিদের সরে আসতে হবে কেননা অযোগ্য ব্যক্তিরা নির্বাচিত হলে বরং কমিউনিটির বদনাম বাড়ে 

আগামী মে নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটার হওয়ার শেষ তারিখ ১৭ এপ্রিল পোস্টাল ভোটের জন্য আবেদনের শেষ তারিখ ২৫ এপ্রিল টাওয়ার হ্যামলেটস নির্বাচনে লেবার দলের প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন জন বিগস আর কনজারভেটভ দলের প্রার্থী হয়েছেন ডাক্তার আনোয়ারা আলী