Share |

মহান মে দিবস এবং আলতাব আলী : বর্ণবাদ-বিরোধী সংগ্রামের প্রেরণা

প্রায় সোয়া ’শ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা দৈনিক ৮ ঘন্টা কাজ ও ন্যায্য মজুরীর দাবীতে আন্দোলনে নেমে যে ত্যাগ আর রুখে দাঁড়ানোর শিক্ষা আমাদের জন্য রেখে গিয়েছিলেন তারই স্বীকৃতি হচ্ছে মে দিবস। হাজারো শ্রমিকের সেই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন ৬ শ্রমিক। এরই ধারাবহিকতায় ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ‘১ মে’ আন্তর্জাতিক শ্রমিক ঐক্য ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর থেকে এদিনটি বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম আর সংহতির দিন হিশেবে। কিন্তু এ দিবসটি বিশ্বজুড়ে সাড়ম্বরে পালিত হলেও শ্রমিকদের অধিকার আর কল্যাণের কতটুকু অর্জিত হয়েছে তা এখনো বড় এক প্রশ্ন। কারণ, ঘটা করে এ দিবস পালিত হলেও এ দিবসের তাৎপর্য বাস্তবে এখনো অনুপস্থিত। শ্রমিকদের অধিকার এখনো পুঁজিপতি আর ধনিক শ্রেণীর বিত্তের পাহাড় আর ক্ষমতার চাপে পিষ্ট। বাংলাদেশে রানা প্লাজার মতো দূর্ঘটনার ছয় বছর গত হলেও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের কান্না-কষ্ট লাঘব হয়েছে তা বলা যাবে না।  
শুধু বাংলাদেশ কেনো, এই ব্রিটেনেই কত লক্ষ মানুষ কর্মহীন। মাথা গোঁজার ঠাই নেই অনেকের। মেহনতি মানুষের শালীনভাবে বেঁচে থাকার আর ন্যূনতম মানবিক মর্যাদা আদায়ের সংগ্রাম শেষ হয়নি। সোয়া ’শ বছর আগের শুরু হওয়া সেই সংগ্রাম এখনো চলছে। শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষের লড়াই জয়ী হোক এই কামনা এবারের মে দিবসে।

আলতাব আলী : বর্ণবাদ-বিরোধী সংগ্রামের প্রেরণা
১৯৭৮ সালের ৪ঠা মে পূর্ব লন্ডনের এডলার স্ট্রিটে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে বর্ণবাদীরা আলতাব আলীকে খুন করে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর জেগে ওঠে প্রবাসী বাঙালি। আলতাব আলী ছিলেন বাংলাদেশি এক ফ্যাক্টরি শ্রমিক ও অভিবাসী। সেদিন হাইড পার্ক হয়ে ১০ ডাউনিং স্ট্রীটে তার প্রতীকী কফিনের মিছিলে শরীক হয়েছিলেন কমপক্ষে সাত হাজার মানুষ। এই ঘটনা বৈষম্যের বিরুদ্ধে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে শান্তিপ্রিয় মানুষকেই এক কাতারে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। শুরু হয় বর্ণবাদীদের মোকাবেলার ঐক্যবদ্ধ আরেক অধ্যায়।  
আলতাব আলীর মৃত্যুতে পূর্ব লন্ডনে যে গণজাগরণ সৃষ্টি হয় তারই হাত ধরে ধর্ম-বর্ণ-ভাষা নির্বিশেষে এই কমিউনিটি আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচার নতুন সংগ্রামে নেমেছিলো।  
যে জায়গাটিতে (তৎকালীন সেইন্ট মেরিজ গার্ডেন) আলতাব আলী শহীদ হয়েছিলেন সেই জায়গাটিতেই নব্বই দশকেই নির্মিত হয়েছে আলতাব আলী পার্ক। বর্ণবাদের হিংস্র শিকার বাঙালি আলতাব আলীর স্মৃতিঘেরা মাটিতেই জায়গা নিয়েছে মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে প্রাণ দেয়া সাহসী সন্তানদের স্মারক আমাদের গর্বের শহীদ মিনার। সেই পার্ক এখন বাঙালিদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়ার প্রেরণা, আন্দোলন-সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু।
তবে দিন দিন এদেশের রাজনীতিতে এই কমিউনিটির পদচারণা বৃদ্ধি আর ব্রিটিশ মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশি কমিউনিটির অভিষেক হলেও বর্ণবাদ শেষ হয়নি। নতুন সময়ে অন্য রূপে আরও শক্তিশালী হয়ে জেঁকে বসেছে প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ। এই বর্ণবাদের নখর রাস্তার স্কিনহেডদের অস্ত্র থেকেও ভয়ঙ্কর। এটি দেখা যায় না, কিন্তু যে বা যারা এর আক্রমণের শিকার হন তারা টের পান এটি কত ভয়াবহ। প্রাতিষ্ঠানিক এই বর্ণবাদের অদৃশ্য দীর্ঘ হাতটি দেখতে আমাদের সক্ষম হতে হবে। আর এই সক্ষমতা অর্জন করলেই কেবল এর মোকাবেলা করা সম্ভব। বর্ণবাদ-বিরোধী আন্দোলনের প্রেরণা শহীদ আলতাব আলীর মৃত্যুবার্ষিকে আমাদের প্রত্যয় হোক - ঐক্যবদ্ধভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ আর বৈষম্যের মোকাবেলা।