Share |

টাওয়ার হ্যামলেটসে দ্বিতীয় মেয়াদে জয়ী জন বিগস : বিভক্তির বিপক্ষে রায় ভোটারদের

পত্রিকা রিপোর্ট
 লন্ডন, ০৭ মে : টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল নির্বাচনে এবার কঠিন এক বার্তা দিয়েছেন ভোটাররা। মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন রাজনীতিকে তাঁরা প্রত্যাখান করেছেন। রায় দিয়েছেন কমিউনিটিকে নেতৃত্ব দেয়ার নামে বিভক্ত রাজনীতির বিপক্ষে। শুধু বাঙালি-দোহাই দিয়ে যে কেউ হাজির হলেই যে ভোট পাওয়া যাবে না সেই বার্তাও স্পষ্ট এই নির্বাচনের ফলাফলে পরিষ্কার। 
মূলধারার লেবার পার্টিতে আস্থা রেখেছেন ভোটাররা। ফলে অনেক বছর পর টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পেয়েছে লেবার পার্টি। দলটির প্রার্থী জন বিগস বিপুল ভোটে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। বারার ৪৫টি কাউন্সিলর পদের মধ্যে ৪২টিই জিতে নিয়েছেন লেবার দলের প্রার্থীরা। 
সাবেক মেয়র লুতফুর রহমানের নেতৃত্বে মূলধারা থেকে ছিটকে পড়া বাঙালি গ্রুপটি এবার চরম হার হেরেছে। বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে মূলধারা থেকে বেরিয়ে আসা লুতফুর রহমানের গ্রুপটি নিজেদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। আরেক দফা বিভক্ত হয়ে তারা দুই গ্রুপে নির্বাচন করে। ভোটের আগে লুতফুর রহমানের সমর্থনে অ্যাসপায়ার নামে একটি দল গড়ে উঠে। ওই দলের প্রার্থী হন অহিদ আহমদ। আর পিপলস অ্যালায়েন্স নামে দল গঠন করে প্রার্থী হন রাবিনা খান। রাবিনা খান গতবার লুতফুর সমর্থিত প্রার্থী ছিলেন। এবার লুতফুর তাঁর প্রতি সমর্থন তুলে নিয়ে অহিদ আহমদকে প্রার্থী করেন। এতেই ভাঙ্গন ধরে লুতফুর শিবিরে।  
এতসব বিভক্তি যে ভোটাররা পছন্দ করেনি তার প্রমাণ  ভোটের ফলাফলে স্পষ্ট। লুতফুর রহমান সমর্থিত অ্যাসপায়ার গ্রুপের কোনো প্রার্থীই জয় পাননি। এই গ্রুপের মেয়র প্রার্থী অহিদ আহমদ কাউন্সিলর পদেও হেরে গেছেন। আর পিপলস অ্যালায়েন্স গ্রুপ থেকে একমাত্র কাউন্সিলার হিসেবে জিতেছেন রাবিনা খান। 
বিভক্ত লুতফুর সমর্থিত গ্রুপের মোট কাউন্সিলার ছিলেন ১৯ জন। এবারের নির্বাচনে রাবিনা খান ছাড়া বাকী সবাই আসন হারিয়েছেন। রাবিনা খান যেহেতু আর লুতফুর রহমানের সাথে নেই, ফলে হোয়াইটওয়াশ হয়েছে লুতফুর সমর্থিত গ্রুপের।

লেবারের ভূমিধস বিজয়
টাওয়ার হ্যামলেটসে মোট ভোটার ১ লাখ ৯১ হাজার ২৪৬। ভোট দিয়েছেন ৮০ হাজার ২৫২ জন। এর মধ্যে পোস্টাল ভোট পড়েছে ১৯ হাজার ৮৩টি। ভোট প্রদানের হার ৪১.৯৬ শতাংশ। মেয়র পদে লেবার দলের প্রার্থী জন বিগসের প্রাপ্ত ভোট ৪৪ হাজার ৮৬৫ যা মোট প্রদত্ত ভোটের ৬৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পিপলস অ্যালায়েন্সর রাবিনা খান পেয়েছেন ১৬ হাজার ৮৭৮ ভোট যা মোট প্রদত্ত ভোটের ৩৪ দশমিক ১৯ শতাংশ। 
অবশ্য প্রথম রাউণ্ডের গণনায় এই দুজনের প্রাপ্ত ভোট ছিল যাথাক্রমে ৩৭ হাজার ৬১৯ এবং ১৩ হাজার ১১৩। শতাংশের হিসাবে এটা ৪৮ দশমিক ৪৩ ও ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ।  তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন লুতফুর রহমান সমর্থিত অ্যাসপায়ার দলের প্রার্থী অহিদ আহমদ। তাঁর প্রাপ্ত ভোট ১১ হাজার ১০৯ বা ১৪ দশমিক ৩০ শতাংশ। 
কনজারভেটিভ দলের প্রার্থী ডাঃ আনোয়ারা আলী পেয়েছেন ৬ হাজার ১৪৯ ভোট বা ৭ দশমিক ৯২ শতাংশ। লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী অ্যালেন বকশোর প্রাপ্ত ভোট ৫ হাজার ৫৯৮ বা ৭ দশমিক ২১ শতাংশ। এছাড়া গ্রিন পার্টির প্রার্থী ৩ হাজার ২৬৫ (৪.৩৩%) এবং ট্রেড ইউনিয়নিস্ট অ্যান্ড সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রার্থী হুগো পিয়ার্স ৭২৮ (০.৯৪%) ভোট পেয়েছেন।  টাওয়ার হ্যামলেটসে লেবার দলের কাউন্সিলার ছিলেন ২২ জন। এবার তারা ৪২টি কাউন্সিলার পদে বিজয় পেয়েছে। কাউন্সিলার পদে লেবারের প্রাপ্ত ভোট ৪৬ দশমিক ০৯ শতাংশ। কনজারভেটিভের প্রাপ্ত ভোট ৯ দশমিক ৯১ শতাংশ। 

হোয়াইটওয়াশ লুতফুর গ্রুপ
২০১০ সাল থেকে টাওয়ার হ্যামলেটসের রাজনীতি মূলধারার লেবার পার্টি বনাম বাঙালিতে বিভক্ত হয়। এ নিয়ে টাওয়ার হ্যামলেটসের বাঙালিরা মূলধারা থেকে ছিটকে গেছে বলেও অভিযোগ ছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে ভোটাররা বাঙালি সেই স্বতন্ত্র গ্রুপটিকে পুরোদমে প্রত্যাখ্যান করেছেন। স্বভাবগতভাবে লেবার হিসেবে পরিচিত বাঙালি ভোটাররা কাউন্সিল নির্বাচনে আবারও মূলধারার লেবার পার্টিতে আস্থা রেখেছেন। 
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত লুৎফুর রহমান লেবার পার্টি থেকে বের হয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করলে ওই বিভক্তির সৃষ্টি হয়। লুৎফুর ২০১০ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে আবার নির্বাচিত হন। কিন্তু নির্বাচনে ভোট জালিয়াতি, প্রচারণায় ধর্মের  ব্যবহার এবং কাউন্সিল পরিচালনায় নানা অনিয়মের অভিযোগে তিনি আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কয়েক মাসের মাথায় বিদায় নেন। তাঁকে নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে সাত বছরের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করেন আদালত। কিন্তু লুৎফুর রহমান তাঁর স্বতন্ত্র দলের ব্যানারে প্রার্থী দাঁড় করান। এতে জিইয়ে থাকে বিভক্তি। এবারও তিনি ‘অ্যাসপায়ার’ দলের ব্যানারে মেয়র পদের পাশাপাশি ৪৫টি কাউন্সিলর পদে প্রার্থী দেন। তাঁর দলের কোনো প্রার্থীই এবার বিজয় পাননি। দলটির মেয়র প্রার্থী অহিদ আহমদ কাউন্সিলর পদেও হেরেছেন। দলটির চেয়ারম্যান আবু তাদের চৌধুরীও কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করে জিততে পারেননি। তিনি পেয়েছেন মাত্র ৭৭৬ ভোট।   গত নির্বাচনে লতুফুর সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে রাবিনা খান প্রায় ২৭ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। এবার লুতফুর সমর্থিত প্রার্থী অহিদ আহমদ পেয়েছেন মাত্র ১১ হাজার ১০৯ ভোট। অহিদ আহমদ কাউন্সিলর পদেও জিততে পারেননি। ফলে লতুফর সমর্থিত আর কেউ টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে রইলো না। 
লুতফুর-অহিদ গ্রুপ কেবল লেবারের কাছে হারেনি। তারা রাবিনা খানের কাছেও হারলেন।  
নিঃসঙ্গ রাবিনা
লুতফুর রহমান সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে রাবিনা খান গত নির্বাচনে প্রায় ২৭ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। এতে লতুফুর রহমানের সমর্থন না পাওয়ায় তিনি পিপলস অ্যালায়েন্স নামে আলাদা দল গঠন করে নির্বাচন করেন। এবার তাঁর প্রাপ্ত ভোট কমে হয়েছে ১৩ হাজার ১১৩। দ্বিতীয় পছন্দের ভোট মিলিয়ে তা দাড়ায় ১৬ হাজার ৮৭৮ ভোট।
কাউন্সিলর পদেও তাঁর দল প্রার্থী দেয়। তাঁর দলের কোনো কাউন্সিলর প্রার্থী জিততে পারেননি। যেসব প্রার্থী কাউন্সিলর ছিলেন, তারাও আসন ধরে রাখতে পারেননি। কেবল টিকে আছেন রাবিনা খান। তিনি মেয়র পদের পাশাপাশি কাউন্সিলর পদেও প্রার্থী হয়েছিলেন। ১৫৬৫ ভোট পেয়ে তিনি শ্যাড়ওয়েল ওয়ার্ডের কাউন্সিরর পদটি ধরে রাখতে সক্ষম হন। কিন্তু কাউন্সিলে তিনি একেবারেই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লেন।  
কাউন্সিলর পদেও হারলেন দুই মেয়র প্রার্থী
লুতফুর রহমান সমর্থিত অ্যাসপায়ার দলের মেয়র প্রার্থী আবুল মনসুর অহিদ আহমদ কাউন্সিলর পদেও প্রার্থী ছিলেন। কাউন্সিলর পদে মাত্র ১৩৫৮ ভোট পেয়ে তিনি ল্যান্সবারি ওয়ার্ডে চতুর্থ হন। এতে তিনি দীর্ঘদিনের কাউন্সিলর পদটিও হারালেন। 
কনজারভেটিভ দলের মেয়র প্রার্থী ডাঃ আনোয়ারা আলী মেয়র পদের পাশাপাশি স্পিটালফি?স অ্যান্ড বাংলা টাউন ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী ছিলেন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই প্রার্থী কাউন্সিলর পদে পেয়েছেন মাত্র ২৭৬ ভোট।  
উ?ে গেল হিসাব-নিকাশ
টাওয়ার হ্যামলেটসে বাঙালি ভোট ৩৪ শতাংশ। এসব ভোটের বেশিরভাগই লুতফুর রহমানের পকেটে বলে ভাবা হত। গত দুটি নির্বাচনে সেই ধারণা কিছুটা সত্য বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু এবারের নির্বাচনে হিসাব পুরোটাই উলটে গেছে।  লুতফুর রহমান দাবি করেছিলেন, তাঁর সমর্থিত প্রার্থী জিততে না পারলেও দ্বিতীয় হবেন। রাবিনা খানের চাইতে বেশি ভোট পাবে। কিন্তু ফলাফলে তা ভুল প্রমাণিত হলো। 
আবার কনজারভেটিভ দলের প্রার্থী ডাঃ আনোয়ারা আলী সম্পর্কে বলা হয়েছিল, টাওয়ার হ্যামলেটসে তাঁর ১০ থেকে ১৫ হাজার রোগী আছে। জিপি হিসেবে তাঁর ব্যাপক পরিচিতিও আছে। ফলে তিনি বেশ সমর্থন পাবেন। ভোটের ফলাফল ওই বিশ্লেষণকে ভুল প্রমাণ করলো।  
নিরাপত্তা নিয়ে বাড়াবাড়ি
এবারের টাওয়ার হ্যামলেটসের ভোট গননায় নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি বাড়াবাড়ি লক্ষ্য করা গেছে। এক্সেলের মত সুরক্ষিত ভেন্যুতে এবার ভোট গণনা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কেবল অনুমোদন পাওয়া সাংবাদিক এবং রাজনীতিকদের প্রবেশাধিকার ছিল। কিন্তু সেখানে ডজন ডজন পুলিশের উপস্থিতি দেখা গেল। ছিল পুলিশের স্নাইপার ডগ। এছাড়া ভেন্যুতে প্রবেশের পথে সাংবাদিকদের এয়ারপোর্ট স্টাইলের নিরাপত্তার মুখোমুখি হতে হয়। যতবার তারা বাইরে থেকে ভেতরে প্রবেশ করতে গেছেন ততবারই তাদের নিরাপত্তা তল্লাশির নামে বাড়াবাড়ির শিকার হতে হয়। অপ্রয়োজনীয় এই বাড়াবাড়ির ফলে জনগণের অর্থের অপচয়ও কম নয়। 
এছাড়া টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক বিলম্বের বিষয়টি অপ্রত্যাশিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এবার মেয়র নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হল পরদিন প্রায় ১২ টার দিকে। অথচ ভোট গগনা শেষ হওয়া মাত্রই রাত ১০টায় গননার কার্যক্রম শুরু হয়। কাউন্সিলরদের সম্পূর্ণ ফলাফল পেতে অপেক্ষা করতে হয় পরদিন রাত ১২টা পর্যন্ত। বিলম্বের দিক দিয়ে টাওয়ার হ্যামলেটস পুরো দেশের তুলনায় ব্যতিক্রম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।