Share |

কঠোর সমালোচনা জাতিসংঘ দূতের : বর্ণবাদী হয়ে উঠেছে ব্রিটেন

লন্ডন, ১৪ মে : বিতর্কিত অভিবাসন নীতি চর্চার কারণে তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েছে ব্রিটিশ সরকার। অভিবাসন কেলেঙ্কারির ঘটনায় সৃষ্ট চাপে ক’দিন আগে হোম সেক্রেটারির পদ থেকে অ্যাম্বার রাড পদত্যাগে বাধ্য হন। কিন্তু পিছু ছাড়ছে না সমালোচনা। একের পর এক বেরিয়ে আসছে অভিবাসীদের প্রতি নির্মমতার কাহিনী।
ঘটনা এতদূর গড়িয়েছে যে, জাতিসংঘের বর্ণবাদ বিষয়ক বিশেষ দূত টেন্ডায়ি অ্যাছিউম পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দুই সপ্তাহ ব্রিটেন সফর করেন। গত শুক্রবার সফর শেষে ফেরার আগে তিনি বলে গেছেন, ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ সরকার বাজেট কর্তন ও অভিবাসনের যে নীতি গ্রহণ করেছে, তা জাতিগত সংখ্যালঘু (অশ্বেতাঙ্গ) সম্প্রদায়ের ওপর আলাদাভাবে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। ব্রেক্সিট (ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যের বিচ্ছেদ) গণভোটের পর যুক্তরাজ্য আরও বেশি বর্ণবাদী হয়ে উঠেছে বলে তাঁর মন্তব্য।  হোম সেক্রেটারি থাকাকালে থেরেসা মে’র নেয়া বৈরী পরিবেশ (‘হস্টাইল এনভারনমেন্ট’) নীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন জাতিসংঘের এই দূত। ২০১৯ সালের জুনে জাতিসংঘ দেশটির বর্ণবাদ ও অভিবাসন বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। জাতিসংঘের তরফ থেকে যুক্তরাজ্যে এমন তদন্ত বিরল।
অভিবাসন নীতির এই বিতর্ক প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র জন্য বিশেষভাবে বিব্রতকর। ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগ পর্যন্ত মে-ই ছিলেন  দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ওই সময়ে তিনি অভিবাসন নীতিতে নজরীবিহীন কড়াকড়ি আরোপ করেন। শুরুতে তাঁর লক্ষ্যে পরিণত হয় বিদেশি শিক্ষার্থীরা। শিক্ষা নয়; বরং কলেজগুলো যুক্তরাজ্যে অভিবাসনের ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে- এমন দাবি তুলে তিনি শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করেন। এতে হাজার হাজার বিদেশি শিক্ষার্থীর ভিসা বাতিল হয়। কোর্স ফি বাবদ দেয়া শিক্ষার্থীদের বিপুল অর্থ মার খায়। ‘ভুয়া শিক্ষার্থী’র কলঙ্ক নিয়ে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীকে যুক্তরাজ্য ছাড়তে হয়।
২০১৪ সালে বিদেশি শিক্ষার্থীরা সরকারের অন্যায় নীতির আরেক দফা নির্মমতার শিকার হন। ওই বছর বিবিসি’র এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইংরেজি দক্ষতা যাচাইয়ের ‘টেস্ট অব ইংলিশ ফর ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিকেশন’ (টয়েক) পরীক্ষায় জালিয়াতির মাধ্যমে সনদ নেয়া হচ্ছে এবং ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর শর্ত পূরণে সেসব সনদ ব্যবহৃত হচ্ছে। একটি সেন্টারে এমন অনিয়ম হয়েছে বলে জানায় বিবিসি। কিন্তু ওই অভিযোগের ভিত্তিতে টয়েক সনদ দিয়ে ভিসা বাড়িয়েছেন, এমন সকলের ভিসা বাতিল করতে শুরু করে হোম অফিস।  ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৬ হাজার শিক্ষার্থীর ভিসা বাতিল করে। ওই বছরের শেষের দিকে আদালতে এই গণহারে ভিসা বাতিলের নীতি ভুল প্রমাণিত হয়। ততদিনে ভুক্তভোগী হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে যুক্তরাজ্য ছাড়তে হয়।
অবৈধ অভিবাসীদের যুক্তরাজ্যে বসবাস অসম্ভব করে তুলতে ২০১৪ সালে থেরেসা মে তাঁর সেই ‘বিরূপ অভিবাসন’ নীতির বাস্তবায়ন শুরু করেন। ওই বছর থেকে বাসা ভাড়া, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, ব্যাংক হিসাব খোলাসহ সকল ক্ষেত্রে অভিবাসনের বৈধতা যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়। অবৈধ অভিবাসীদের চাকরি কিংবা বাসাভাড়া দেয়া ঠেকাতে বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখা হয়। আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে, বাসস্থান ও চিকিৎসা না পেয়ে অবৈধরা নিজ থেকে যুক্তরাজ্য ছেড়ে পালাবে- এটাই ছিল উদ্দেশ্য। থেরেসা মে যখন ওইসব নিয়মের বাস্তবায়ন করছিলেন, তখন বিভিন্ন তরফে সমালোচনা হয়েছে। এসব নীতি বৈধ অভিবাসীদেরও বিপদে ফেলবে-এমনটা বারবার স্মরণ কয়ে দেয়া হলেও সেসব কানে তুলেননি তিনি।   যুক্তরাজ্যে অনেক অভিবাসী আছেন যারা দশকের পর দশক বসবাস করছেন। কিন্তু কখনো পাসপোর্ট বা বৈধ কাগজ-পত্র সঙ্গে রাখার প্রয়োজন পড়েনি। কিন্তু ২০১৪ সালের ওই আইনের কারণে ‘উইন্ডরাশ জেনারেশন’ হিসেবে পরিচিত ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সালে যুক্তরাজ্যে আসা অনেকে বিপাকে পড়লেন। বৈধতার প্রমাণ না থাকায় তাদের সরকারী সুযোগ-সুবিধা বন্ধ হয়ে গেল। অনেককে অবৈধ আখ্যা দিয়ে জোরপূর্বক বিতাড়নের ঘটনাও ঘটেছে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য হন অনেকে।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের পুনর্গঠনে কমনওয়েলথভুক্ত দেশ থেকে ওইসব অভিবাসীরা এসেছিলেন। সর্বশেষ গত ১৬ থেকে ২০ মার্চ লন্ডনে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলত সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ‘উইন্ডরাশ জেনারেশন’র প্রতি অন্যায় আচরণের বিষয়টি বেশ জোর পায়।  ফলে প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ওই সম্মেলনে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। উইন্ডরাশ জেনারেশনের সবাইকে বৈধতা দেয়ার ঘোষণা দেন। এই ঘটনার রেশ ধরে বেরিয়ে আসে অভিবাসন বিভাগ বছরে ১৫ হাজার অবৈধ অভিবাসীকে বিতাড়নের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। অনেকটা কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসার মত ব্যাপার। সংসদে ওই গোপন টার্গেটের কথা স্বীকার না করে বিপাকে পড়েন হোম সেক্রেটারি অ্যাম্বার রাড। ফলে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়। এরপর সাজিদ জাভিদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। অবৈধ বিতাড়নের টার্গেট আর থাকবে না বলেও ঘোষণা এসেছে। কিন্তু বিতর্ক থামছে না। বিতাড়নের টার্গেট পূরণ করতে গিয়ে অভিবাসীদের প্রতি যে নির্মম আচরণ করা হচ্ছে এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রতি যে অন্যায় করা হয়েছে-সেসব বেরিয়ে আসছে একের পর এক। গত ১ মে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের খবরে বলা হয়, টয়েক কেলেঙ্কারির ঘটনায় অন্তত ৭ হাজার শিক্ষার্থীকে ভুলবশত বিতাড়ন করেছে হোম অফিস। ৩ মে ইংরেজি দৈনিক গার্ডিয়ান এক গোপন ভিডিও প্রকাশ করে জানায়, হোম অফিসের কর্মকর্তা কিভাবে বিতাড়নের মুখে থাকা একজনকে বলছেন, তাঁর কাজ অভিবাসীর জীনকে বিষন্ন করে তোলা। এরপর ৬ মে গণমাধ্যমগুলো জানায়, হাইলি স্কিলড ক্যাটাগরিতে থাকা অন্তত এক হাজার অবিভাসীকে অন্যায়ভাবে বিতাড়ন করা হয়েছে। ৮ মে হোম অফিসের এক কর্মকর্তার ফাঁস করা তথ্য প্রচার করে বিবিসি জানায়, যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের (অ্যাসাইলাম) আবেদন ঠিকমত যাচাই-বাছাই না করেই সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। হোম অফিসের পরিবেশ এমন যে অ্যাসাইলাম আবেদন অনুমোদন করাটা যেন কর্মকর্তাদের জন্য অন্যায় কাজ। আবেদন অনুমোদন করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ভীষণ ব্রিবতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।
এসব নিয়ে তুমুল চাপে থেরেসা মের সরকার। সরকার উইন্ডরাশ জেনারেশনকে বৈধতা দান ও জোরপূর্বক অভিবাসী বিতাড়নের গোপন টার্গেট বাতিল ঘোষণা দিয়েছে আগেই। সর্বশেষ গত বুধবার জানিয়েছে, জাতীয় স্বাস্থ্য বিভাগ রোগীদের তথ্য অভিবাসন বিভাগের কাছে আর দিতে হবে না। এতদিন স্বাস্থ্যবিভাগ থেকে তথ্য ও ঠিকানা নিয়ে অভিবাসীদের পাকড়াও করতো অভিবাসন বিভাগ। যারা ইতিমধ্যে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের হয়তো যুক্তরাজ্যে ফেরার সুযোগে এনে দেবে না চলমান বিতর্ক। কিন্তু তাদের সবাই যে অবৈধ ছিলেন অনন্ত সেটি প্রতিষ্ঠিত হলো এই বিতর্কে।
যেমন- শিক্ষার্থী বিতাড়ন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বিবিসির এক সাক্ষাৎকারে বিরোধী দল লেবারের ছায়ামন্ত্রী ব্যারি গার্ডিনার বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ভিসা দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার, কলেজগুলোর লাইসেন্সও দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। ফলে কলেজগুলো ভুয়া হওয়ার দায় কেন বিদেশি শিক্ষার্থীদের নিতে হলো?’ বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা মে’র কাছে এসব প্রশ্নের জবাব চান তিনি।
গার্ডিনার যে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, এমন প্রশ্ন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের স্ব স্ব দেশের সরকারগুলোর পক্ষ থেকে অনেক আগেই তোলা উচিত ছিল। কিন্তু বাংলাদেশসহ কোনো সরকারই সেটি করেনি। অন্যায় বিতাড়নের শিকার হওয়া শিক্ষার্থীরা ওইদিক থেকে বেশি হতভাগা বলা চলে।