Share |

বাংলাদেশে মাদকবিরোধী অভিযান : শতাধিক নিহত

ঢাকা, ২৮ মে : মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযানে নেমেছে বাংলাদেশের আইনশৃৃখলা বাহিনী। গত ১৫ মে থেকে শুরু হয়েছে এই অভিযান। রোববার পর্যন্ত ১৪ দিনে নিহত হয়েছেন ১০১ জন। অভিযান পরিচালনাকালে আইনশৃৃখলা বহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে এসব ব্যক্তি নিহত হয়েছেন বলে দাবি সরকারের। তবে বন্দুকযুদ্ধে আইনশৃৃখলবা বাহিনীর কোনো ক্ষয়-ক্ষতির খবর গত রোববার পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। কেবল মাদক ব্যবসায়ী নিহত হওয়ার এই এক তরফা বন্দুকযুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে।  সুশীল সমাজ ও মানবাধিকারকর্মীরা এসব হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, মাদক ব্যবসায় কেউ জড়িত থাকলে তাকে আইনের আওতায় আদালতের মাধ্যমে বিচার করতে হবে। বিনা বিচারে গুলি করে মেরে ফেলা কোনো সমাধান দেবে না। বরং এতে অর্থের বিনিময়ে আইনশৃৃখলা বাহিনীর সদস্যরা হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। 
অন্তত দুটি ঘটনায় মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে তালিকায় নেই- এমন ব্যক্তি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে অভিযোগ উঠেছে, মাদক ব্যবসায়ী আখ্যায়িত করে বিএনপির নেতাকর্মীদের হত্যার কৌশল নিয়েছে সরকার।  নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধীদের পক্ষ থেকে কোনো আন্দোলন যাতে না হয়, সেজন্য আতঙ্ক সৃষ্টিও এসব হত্যার উদ্দেশ্য বলে অভিযোগ উঠেছে।   সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত রোববার দিবাগত রাতের বিভিন্ন সময় রাজধানীসহ সাত জেলায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ১০ নিহত হয়েছেন। পুলিশ বলছে, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে মুন্সিগঞ্জ, ঝিনাইদহ ও সাতক্ষীরায় মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন চারজন। বাকিদের মধ্যে পাঁচজন পুলিশের সঙ্গে ও একজন র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।
এ নিয়ে মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর ১৪ দিনে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা দাঁড়াল ১০১। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, নিহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই মাদক ব্যবসায়ী।
রোববার রাতের বন্দুকযুদ্ধের পর দু-একটি ছাড়া প্রতিটি ঘটনাস্থল থেকেই ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য, দেশি-বিদেশি অস্ত্র উদ্ধার করার হয় বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল রোববার বলেন, যতক্ষণ না মাদকের ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রণে আসবে, তত দিন পর্যন্ত এ অভিযান চলবে। এটি নিয়মিত অভিযান। মাদক নিয়ন্ত্রণ না হওয়া পর্যন্ত এই ‘যুদ্ধ’ অব্যাহত থাকবে। চলমান ‘বন্দুকযুদ্ধ’ মাদকের আগ্রাসন বন্ধ করবে কি না এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যে পদ্ধতি ভালো হয়, সেটাই করে যাব। আমরা কাউকে ছাড় দেব না। আমাদের এক সাংসদ (আমানুর রহমান খান) জেলে আছেন। প্রধানমন্ত্রী মাদকের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। তাই মাদকবিরোধী অভিযান চলবে।’
 অভিযান যে যার মতো
সরকার বলছে, পাঁচটি সরকারি সংস্থার তথ্য সমন্বয় করে মাদক ব্যবসায়ী ও পৃষ্ঠপোষকদের তালিকা ধরেই সারা দেশে অভিযান চালানো হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তর, র‌্যাব, ঢাকা মহানগর পুলিশ ও বিভিন্ন জেলার পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা নিজেরা নিজেদের মতো করে তালিকা ধরে এ অভিযান চালাচ্ছে, প্রতি রাতেই কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হচ্ছেন একাধিক সন্দেহভাজন মাদক ব্যবসায়ী। অভিযান কত দিন চলবে, সে বিষয়েও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা পুলিশের কর্মকর্তারা সুস্পষ্ট কোনো ধারণা দিতে পারেননি।
 সমন্বিত তালিকা নেই
দেশব্যাপী মাদকবিরোধী এই অভিযান নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সমন্বয় করা হচ্ছে বলেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হচ্ছে। দেশব্যাপী অভিযান চালাচ্ছে মূলত র‌্যাব ও পুলিশ। তবে বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযানের বিষয়ে অন্য বাহিনীগুলোর সঙ্গে তাঁদের কোনো যোগাযোগ বা সমন্বয় হচ্ছে না। র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের হাতে এখনো সমন্বিত কোনো তালিকা পৌঁছায়নি। পুলিশ বলছে, দেশের ভেতরে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চললেও সীমান্তের নিরাপত্তা বাড়েনি। মাদক ব্যবসায়ীরা ধাওয়া খেয়ে সীমান্ত অতিক্রম করছেন। আর সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি কোনো বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে না বলে জানিয়েছে। 
যে যার মতো
রংপুর রেঞ্জে পুলিশের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, তাঁদের নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে তাঁরা অভিযান চালাচ্ছেন। তবে তাতে সদর দপ্তরের অনুমোদন রয়েছে। অভিযানে তাঁদের জেলায় বন্দুকযুদ্ধে একজন নিহত হয়েছেন। এরপর মাদক ব্যবসায়ীরা ধাওয়া খেয়ে সীমান্তে চলে গেছেন। ওই কর্মকর্তার দাবি, এই জেলায় মাদকদ্রব্যের বেচাবিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বলা হচ্ছে, মাদকবিরোধী অভিযানের পুরোটাই তাদের গোচরে রয়েছে। আর আবার পুলিশ সদর দপ্তরে উপমহাপরিদর্শক ও সহকারী মহাপরিদর্শক পদের তিনজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় গত বৃহস্পতিবার। তাঁরা বলছেন, তাঁরা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ প্রশ্নে কিছুটা ধীরে চলো নীতি মানতে চান, অন্য কোনো বাহিনীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যেতে চান না।
ওই কর্মকর্তারা আরও বলেন, সীমান্তে আরেকটু কড়াকড়ি করা গেলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। যে চারটি সংস্থা মাদকবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে, তাদের মধ্যে বিজিবির গ্রেপ্তার সবচেয়ে কম। তবে তাদের উদ্ধার অনেক বেশি। তারা অনেক মাদকদ্রব্য উদ্ধার করেছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করেন অনেক কর্মকর্তা। এদিকে বিজিবি সদর দপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, সে অর্থে বিজিবির কোনো বিশেষ অভিযান নেই। নিয়মিত কাজই করে যাচ্ছে বাহিনীটি।
র‌্যাবের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে। তাঁরা বলছেন, পুলিশ সদরের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ আছে। তবে তাঁরা অভিযান চালাচ্ছেন নিজেদের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে। মাঠপর্যায়ে তাঁদের ব্যাটালিয়নগুলো থেকে পাঠানো তথ্য যাচাই করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন। এ ক্ষেত্রে যাঁদের বিরুদ্ধে আগের একাধিক মামলা রয়েছে, এর আগে একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন, এ রকম লোকজন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। 
বিএনপি নেতা-কর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে, অভিযোগ বিএনপির
এবারের মাদকবিরোধী অভিযানের নামে বিচারবহির্ভূতভাবে প্রায় ৭৫ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই অভিযানে মাদক নির্মূলের নামে বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে এবং নতুন করে টার্গেট করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন রিজভী।  রিজভীর অভিযোগ, গোটা দেশকে হত্যার বধ্যভূমিতে পরিণত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে মাদক নির্মূলের নামে এক ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। শনিবার রাতেও পাঁচ জেলায় সাতজনকে ক্রসফায়ারে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এভাবে নির্বিচারে মানুষ হত্যা সবার জন্য রীতিমতো উদ্বেগ, ভয় ও বিপদের কারণ হতে পারে।
বিএনপির এই নেতা মনে করেন, এখন ক্রমান্বয়ে বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে এবং নতুন করে টার্গেট করা হচ্ছে। অনেক পরিবারের অভিযোগ, তুলে নিয়ে গিয়ে পুলিশের দাবিকৃত টাকা দিতে না পারায় রাতে বিচারবহির্ভূতভাবে নিরীহ লোকদের হত্যা করা হয়। রিজভী বলেন, একদিকে জনগণকে ভয় পাইয়ে দিতে সরকারি চক্রান্ত বাবায়ন করা হচ্ছে, অন্যদিকে নিরীহ লোকদের ধরে হত্যা ও হত্যার ভয় দেখিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চলছে ঈদের আগে রমরমা বাণিজ্য। প্রতি ঈদ মৌসুমে সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ ধরনের রমরমা বাণিজ্য করার সুযোগ করে দেয়। এখন গ্রেপ্তার-বাণিজ্যের পাশাপাশি হত্যা-বাণিজ্য চলছে। বাতাসে বারুদের পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে দিয়ে সরকার নিজের জন্য মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রিজভীর দাবি, মাদক ব্যবসার গডফাদাররা মূলত আওয়ামী লীগেরই লোক, আর সেই কারণেই তারা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।