Share |

প্যারিসে ঝুলন্ত শিশুকে উদ্ধার : নাগরিকত্ব পাচ্ছেন শরণার্থী ‘স্পাইডারম্যান’

লন্ডন, ২৮ মে : খালি হাতে দেয়াল বেয়ে উঠতে পারার ক্ষমতাসম্পন্ন কাল্পনিক কমিক চরিত্র স্পাইডারম্যান বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেললেও এবার যেন সত্যিকারের ‘স্পাইডারম্যানের’ দেখা মিললো ফ্রান্সের প্যারিসে। রাস্তা থেকে ঝড়ের গতিতে ভবনের একের পর এক ব্যালকনি টপকে গিয়ে মিনিট খানেকের মধ্যেই এক ঝুলন্ত শিশুর জীবন বাঁচিয়ে চমক তৈরি করেছেন মামুদো গাসসামা নামের এক তরুণ। তাকে ‘স্পাইডারম্যান’ বলে উল্লেখ করেছেন প্যারিসের মেয়র। 
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও গাসসামাকে সোমবার (২৮ মে) তার প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কাল্পনিক কমিক চরিত্র স্পাইডারম্যানের স্রষ্টা হলেন মার্ভেল কমিকসের প্রধান সম্পাদক স্ট্যান লী ও কার্টুনিস্ট স্টিভ ডিটকো। এ গল্পে দেখা যায়, নিউ ইয়র্ক সিটির বাসিন্দা স্কুলছাত্র পিটার পার্কার তার আঙ্কেল বেন ও আন্ট মে’র ঘরে বেড়ে উঠছে। স্কুলের এক প্রদর্শনীতে এক তেজস্ক্রিয় মাকড়শার কামড়ে সে মাকড়শার মতো ক্ষিপ্রতা আর ক্ষমতা লাভ করে। এই অতিমানবীয় ক্ষমতার সাথে সে দেয়াল বেয়ে উঠার ক্ষমতা লাভ করে আর স্পাইডার সেন্সের মাধ্যমে কোনও আক্রমণের আগেই বুঝতে পারে। তার বৈজ্ঞানিক দক্ষতা দিয়ে সে একটি ছোট যন্ত্র তৈরি করে, যা দিয়ে আঠালো জাল নিক্ষেপ করা যায়। পর্দার সে স্পাইডারম্যান যেন এবার হাজির হলো বাস্তবে। গত শনিবারের (২৬ মে) ঘটনা। রাত তখন প্রায় আটটা। উত্তরাঞ্চলীয় প্যারিসের একটি ভবনের পাঁচতলায় ব্যালকনি থেকে ঝুলছে একটি শিশু। নিজের নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে তাকে উদ্ধার করলো এক তরুণ। তুলে দিলো পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের হাতে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, পঞ্চমতলার বারান্দায় একটি শিশু ঝুলে আছে। তাকে উদ্ধার করতে নিচ থেকে ২২ বছর বয়সী গাসসামা খালি হাতেই ভবনের এক ব্যালকনি থেকে আরেক ব্যালকনি বেয়ে বেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছেন। ততক্ষণে পঞ্চমতলার পাশের একটি ব্যালকনিতে শিশুটিকে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন এক ব্যক্তি। অল্প সময়ের মধ্যেই গাসসামা শিশুটির কাছে পৌঁছে যান এবং ব্যালকনির দেয়ালে বসে শিশুটিকে ডান হাত দিয়ে টেনে উদ্ধার করেন। ঘটনাস্থলে দমকলকর্মীরা এসে পৌঁছালেও তার আগেই উদ্ধার হয়ে যায় শিশুটি।  ফায়ার সার্ভিসের এক মুখপাত্র বলেন, ‘ভাগ্যক্রমে কেউ একজন ছিলেন, যিনি শারীরিকভাবে সক্ষম এবং সাহসিকতার সঙ্গে শিশুটিকে উদ্ধার করেছেন।’ উদ্ধারের ওই ভিডিওটি এরইমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
গাসসামা বলেন, কোনও কিছু না ভেবেই তিনি শিশুটিকে উদ্ধার করতে ছুটে যান। তিনি বলেন, ‘আমি দেখলাম অনেক মানুষ চিৎকার করছে, গাড়িগুলো হর্ন দিচ্ছে। আমি ওইভাবে বেয়ে বেয়ে ভবনে উঠে পড়লাম এবং ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞতা যে আমি শিশুটিকে বাঁচাতে পারলাম। শিশুটিকে বাঁচিয়ে যখন লিভিং রুমের দিকে গেলাম তখন আমার ভয় লাগলো। আমি কাঁপতে শুরু করলাম, আমি ঠিক করে দাঁড়াতে পারছিলাম না। আমাকে বসতে হলো।’
এমন সাহসিকতার জন্য তুমুল প্রশংসা পেয়েছেন গাসসামা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান জানায়, গাসসামার সাহসী কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে একটি টুইট করেছেন প্যারিসের মেয়র আন্নে হিদালগো। ব্যক্তিগতভাবে তাকে ফোন করে ধন্যবাদও জানিয়েছেন তিনি। গাসসামাকে ‘এইটিনথ-এর স্পাইডারম্যান’ বলে উল্লেখ করেছেন হিদালগো। প্যারিসের যে জেলায় ঘটনাটি ঘটেছে তা ‘এইটিনথ’ নামে পরিচিত। গাসসামা সম্পর্কে প্যারিসের মেয়র বলেন, ‘গাসসামা আমাকে জানিয়েছেন তিনি এখানে জীবন গড়ার স্বপ্ন নিয়ে কয়েক মাস আগে মালি থেকে এসেছেন। আমি তাকে বলেছি, তার সাহসী কর্মকাণ্ড সকল নাগরিকের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ফ্রান্সে স্থায়ী হওয়ার প্রচেষ্টায় তাকে অবশ্যই সহায়তা দেবে প্যারিস।’
পরদিন সোমবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর আমন্ত্রণে প্রেসডেন্ট প্রসাদে যান গাসসামা। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর গাসসামাকে সাহস ও উদারতার প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তাঁকে ফ্রান্সের নাগরিকত্ব দেয়ার ঘোষণা দেন তিনি।  প্যারিস কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঘটনার সময় শিশুটির মা-বাবা বাড়িতে ছিলেন না। সূত্রকে উদ্ধৃত করে গার্ডিয়ান জানায়, শিশুটিকে কেন বাড়িতে একা রেখে গেলো তা নিয়ে তার বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। সে সময় শিশুর মা প্যারিসে ছিলেন না।