Share |

কড়া নাড়ছে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’

উদয় শঙ্কর দাশ

লন্ডন, ১১ জুন : চার বছরের বৃত্তের সেই সময়টা আবার এসে গেলো যখনফুটবল জ্বরছড়িয়ে পড়বে সারা বিশ্বে, কারণ এটা বিশ্বকাপ ফুটবলের সময়। বৃহস্পতিবার ১৪ই জুলাই মস্কোর লুজনিকি স্টেডিয়ামে ২১তম বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হবে রাশিয়া সৌদি আরব। একমাস পর একই স্টেডিয়ামে রাশিয়ায় ১২টি স্টেডিয়ামে আরও ৬২টি খেলার পর ৬৪তম ম্যাচে বিশ্ব জেনে যাবে কোন দেশের হাতে উঠবে ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি।  গারাবিশ্বের সবকটা মহাদেশ থেকে ৩২টি দেশ রাশিয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামবে। রাশিয়া ছাড়া বাকি ৩১টি দেশকে বেশ কঠিন কোয়ালিফায়িং রাউন্ডের মাধ্যমে মূল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। ফলে চিরাচরিতভাবে শক্তিশালী দল হিসেবে পরিচিত কয়েকটি দেশ ছিটকে পড়েছে অন্যদিকে। বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চে অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ পেয়েছে নবাগত কিছু দল।  ৮টি গ্রুপে প্রথমে লীগ পর্যায়ে খেলার পর প্রতি গ্রুপ থেকে শীর্ষ দুটি দল খেলবে নক আউট রাউন্ডে। যদিও কোন ১৬টি দল এই দ্বিতীয় পর্যায়ে পৌছাতে পারে তা সহজে অনুমেয় তবুও বিশ্বকাপে অঘটন ঘটেছে আগে আর এবারও ঘটবে। তাই এই প্রতিযোগিতা আরও বেশী আকর্ষণীয় ফুটবল-প্রেমীদের কাছে। 

২০১৮ সালের বিশ্বকাপে নামী দামী যেসব দেশকে দেখা যাবে না সেগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় দুটি নাম- ইটালী নেদারল্যান্ডস। আরও বাদ পড়েছে দক্ষিণ আমেরিকার চ্যাম্পিয়ান দল চিলি, আফ্রিকান কাপ অফ ন্যাশনস বিজয়ী ক্যামেরুন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।      চার বার বিশ্বকাপ বিজয়ী ইটালী প্লে অফ ম্যাচে সুইডেনের কাছে পরাজিত হয়ে ছিটকে পড়তে বাধ্য হয়। ১৯৫৮ সালের পর এই প্রথম তারা বিশ্বকাপে খেলছে না। নেদারল্যান্ডস ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় ফাইনালে খেলেছিল স্পেনের বিরুদ্ধে এবং অতিরিক্ত সময়ে হেরে যায়। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে তারা হেরে গিয়েছিল আর্জেন্টিনার কাছে সেমিফাইনালে পেনা?ি শুট আউটে। কিন্তু এবার কোয়ালিফায়িং ম্যাচগুলোতে তারা খুবই খারাপ খেলেছে। 

অন্যদিকে ছোট্ট দেশ আইসল্যান্ডের জন্য এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ যেনো একটি রূপকথা। সাড়ে তিন লাখের কম জনসংখ্যার এই দেশ বিশ্কাপ ইতিহাসে সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে খেলার কৃতিত্ব অর্জন করল। অসাধারণ অর্জন নি:সন্দেহে। এই প্রসঙ্গে মিশরের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। ২৮ বছরের অনুপস্থিতির পর তারা আবার আত্মপ্রকাশ করছে বিশ্ব ফুটবল মঞ্চে। বিশ্বকাপ ফুটবলের মূল আসরে এটা হবে তাদের তৃতীয়বারের অংশগ্রহণ। 

বিশ্বকাপ ফুটবলে বিজয়ীর ট্রফির একটি ছোট্ট ইতিহাস রয়েছে। তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ফিফা বিশ্কাপ ট্রফি। প্রথম ট্রফিটির নাম ছিল ভিক্টরি। পরে সেটার নামকরণ করা হয় ফিফার তৃতীয় প্রেসিডেন্ট জুলে রিমের নামানুসারে। ট্রফির নাম জুলে রিমে ট্রফি। ১৯৩৪ সালে প্রথম বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতার প্রবক্তা ছিলেন তিনি। ১৯৭০ সালে ব্রাজিল তিনবার বিশ্বকাপ জেতার পর জুলে রিমে ট্রফিটি স্থায়ীভাবে তাদেও দিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তেরো বছর পর সেই ট্রফিটি চুরি হয়ে যায় এবং আজ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। নতুন ট্রফির নাম ফিফার বিশ্বকাপ ট্রফি। উচ্চতায় ৩৭ সেন্টিমিটারের মতো, ১৮ ক্যারেট সোনায় তৈরী এর ওজন কিলোগ্রাম। 

বিশ্বকাপ ফুটবল চিরাচরিতভাবে হয়ে উঠে ইউরোপ দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে শিরোপা লড়াই।এই লড়াইয়ে ১১- এগিয়ে রয়েছে ইউরোপের দেশগুলো। পর্যন্ত কুড়িটি বিশ্বকাপে জার্মানী ইটালী চারবার করে আর ইংল্যান্ড ফ্রান্স স্পেইন বার করে এই শিরোপা জিতেছে। তবে সবচেয়ে বেশী জিতেছে ব্রাজিল। পাঁচবার এই শিরোপা জয়ের কৃতিত্ব রয়েছে তাদের। দক্ষিণ আমেরিকার আরো দুটি দল আর্জেন্টিনা উরুগুয়ে জিতেছে দুবার করে। 

যদিও মাত্র ৩২টি দেশ ফুটবলের এই সেরা প্রদর্শনীতে অংশ নেয় তবুও সারাবিশ্বেও ফুটবল আমোদীদের জন্য তা বয়ে আনে বিপুল সাহ-উদ্দীপনা উত্তেজনা। টিকেট সংগ্রহের জন্য হুড়োহুড়ি, দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে মাঠে গিয়ে খেলা দেখার এবং নিজেদের দলকে সমর্থনের প্রবল আগ্রহে মেতে উঠে তারা। এমনকি যেসব দেশ অংশগ্রহণ করছে না সেসব দেশ থেকেও ভক্তরা যায় খেলা দেখতে। তার উপর কোটি কোটি টেলিভিশন দর্শক তো রয়েছেই। আর সেটাই হচ্ছে ফিফার অর্থ আয়ের মূল স। টিকেট বিক্রি থেকে আসে মোট আয়ের মাত্র ১০ শতাংশ। গত বিশ্বকাপে টেলিভিশন স্বত্ত্ব বিক্রি থেকে এসেছিল আড়াই বিলিয়ন ডলার। আর লাইসেন্স স্বত্ত বিক্রি থেকে . বিলিয়ন ডলার।

 বিশ্বকাপ জেতা এবং সেই সঙ্গে বিজয়ী দলের খেলোয়াড় হিসেবে গলায় মেডেল ঝোলানো সব খেলোয়াড়েরই একটি স্বপ্ন থেকে যায়। বিশ্বের কয়েকজন সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং নেইমার হয়ে উঠবেন এবার রাশিয়ায় বিশেষ আকর্ষণ। সেই সঙ্গে আরও কিছু খেলোয়াড়ের নামও উল্লেখ করতে হয় যাদের খেলা নিয়েও রয়েছে প্রচুর সাহ। যেমন মিশরের মোহাম্মদ সালাহ, বেলজিয়ামের কেভিন দ্য ব্রায়ান, ডেনমার্কের ক্রিস্টিয়ান এরিকসন এবং ইংল্যান্ডের ডিলি এলি।  

এবারের বিশ্বকাপের বিশেষ সংযোজন হচ্ছে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার। রেফারিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করার জন্য ব্যবহার করা হবে ভিডিও এসিস্ট্যান্ট রেফারি, সংক্ষেপে ভিএআর পদ্ধতি। এতে গোল হয়েছে কিনা, পেনা?ি নির্ধারণ এবং লাল কার্ড প্রদর্শনে বিশেষ সুবিধা হবে। এরই মধ্যে এই পদ্ধতি পরীক্ষা করা হয়েছে এবং সেই সঙ্গে কিছু বিতর্কেরও সৃষ্টি হয়েছে। তবে এই প্রযুক্তি ব্যবহারকে অনেকেই স্বাগত জানিয়েছেন। আশা থাকবে তা যেনো এই বিশ্বকাপকে আরও বিতর্কিত করে না তোলে।

 চূড়ান্ত প্রশ্ন অবশ্য- কে জিতবে এবারের বিশ্বকাপ শিরোপা? 

আমি বলবো- তা বলা খুব কঠিন। গতবারের বিজয়ী জার্মানী খুবই ভালো খেলছে আগের বিজয়ীদের মধ্যে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ফ্রান্সের কথাও বলতে হয়। আর চমক যদি কোনও দেশ সৃষ্টি করতে পারে তাদের তালিকার শীর্ষে থাকবে বেলজিয়াম। মঞ্চ প্রস্তুত। দলগুলো রাশিয়ায় পৌঁছে গেছে বা পৌঁছাতে শুরু করেছে। কোটি কোটি ফুটবলআমোদী বিশ্বের সবচেয়ে বড়, আকর্ষণীয় সম্মানজনক ক্রীড়া অনুষ্ঠানের পর্দা উঠার জন্য অপেক্ষা করছে অধীর আগ্রহে।