Share |

উন্নয়নের গল্পে ঢাকা ভঙ্গুর বাংলাদেশ

পত্রিকা রিপোর্ট

লন্ডন, ১১ জুন : উন্নয়নের নানা গল্পের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রকৃত বাস্তবতা। একদিকে চলছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর সামাজিক কল্যাণসেবার বিচ্চৃতির গল্প। অন্যদিকে চলছে ভিন্নমত দমন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ এবং বিচার ব্যবস্থার অব্যাহত নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘণ। 

গত জুন মঙ্গলবার লন্ডনের এক সেমিনারে দিনব্যাপী আলোচনায় বাংলাদেশের এমন বাস্তবতার কথা উঠে আসে।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্সের শেখ জায়েদ থিয়েটারে স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত চারটি ভিন্ন ধাপে চলে আলোচনা। লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্সের সাউথ এশিয়া সেন্টার এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বেকার্লিরদ্য সুবির অ্যান্ড ম্যালিনি চৌধুরী সেন্টার ফর বাংলাদেশ স্টাডিজযৌথভাবে বাংলাদেশ বিষয়ক দিনব্যাপী এই সেমিনারের আয়োজন করে।

বাংলাদেশের সুশীল সমাজ সরকার বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ইউনিভার্সিটি অব বাথের সমাজ নীতি বিজ্ঞান বিষয়ের অধ্যাপক জো ডেভাইন বলেন, বর্তমান ক্ষমতাসীন দল নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রকৃত শক্তি হিসেবে মনে করে। এই সরকারের নেতৃত্বে গত পাঁচ বছরে অর্থবহ বিরোধী দলের অস্থিত্ব মুছে দেয়ার মাধ্যমে এক দলীয় শাসন সুদৃঢ় করা হয়েছে। যা পুলিশ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতার মধ্যদিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, সরকারের অনুগতরা ছাড়া বাকী সুশীল সমাজের কার্যক্রম প্রায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আইন করে এনজিওগুলোকে বশ মানানো হয়েছে। গণমাধ্যমের ওপর চাপ প্রয়োগের অনেক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন তিনি। বাংলাদেশে সুশীল সমাজের মধ্যে নানা রকম বিভ্রান্তি রয়েছে মন্তব্য করে অধ্যাপক জো ডেভাইন বলেন, সাংবাদিক, শিক্ষক, আইনজীবী থেকে শুরু করে সবগুলো পেশাজীবী সংগঠন রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। যেখানে বিভক্তি নেই সেখানে ক্ষমতাসীনদের তরফ থেকে পক্ষ দাড় করিয়ে দেয়ার নজির আছে। সরকারী নজরদারির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, পরিস্থিতি এমন যে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সুশীল সমাজের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

জো ডিভাইনের মতে বাংলাদেশে এক দলের কর্তৃত্ববাদী সরকার প্রতিষ্ঠার এই প্রক্রিয়া সামনেও অব্যহত থাকবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বাংলাদেশ ভাল করছে। জনগণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিজেদের আর্থিক অবস্থা নিয়ে খুশি। সরকার নতুন নতুন সামাজিক কল্যাণসেবা চালু করছে। ফলে এসব ইতিবাচক গল্প দিয়ে নেতিবাচক কাজগুলো ঢাকা দেয়া যাচ্ছে সহজে। ব্যারিষ্টার সারা হোসেন ১৯৭২ সালের সংবিধানের সাথে ২০১৮ সালের সংবিধানের পার্থক্যগুলো নির্দেশ করে দেখিয়ে দেন যে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এনজিও কার্যক্রমের সুযোগ কতটা সীমিত করা হয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডের মত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘণের বিষয়ে কিভাবে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া নিয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গণে প্রসংশা কুড়াচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে নাগরিকদের অধিকার অধিকার হরণের বিষয়গুলো জোর পাচ্ছে না।

সেমিনোরে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের অধিকার, ইসলামিক উগ্রবাদের প্রভাব, রোহিঙ্গা পরিস্থিতি, পোশাক শিল্পের অগ্রগতি এবং এনজিও কার্যক্রমসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। বক্তারা বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের ইতিবাচক অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা করেন। ভিন্ন ভিন্ন বক্তা ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করেন। যোগ দেন উপস্থিত দর্শকরাও। সরকারকে জবাবদিহি করা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যে দিন দিন ধংস করে দেয়া হচ্ছে- দর্শকদের পক্ষ থেকেও সে বিষয়ে দৃষ্টিপাত করা হয়।

তবে বক্তারা একমত হন যে, নাগরিকদের যুক্ত করে সুশীল সমাজকে জাগ্রত হতে হবে। তারা বলেন, একমাত্র নাগরিক জাগরণের মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী সরকারের লাগাম টানা সম্ভব। প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক উদাহরণ টেনে একজন বক্তা বলেন, টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যার অডিও প্রকাশ পাওয়ার পর জনগণ জেগে উঠে। এরপর থেকে মাদকবিরোধী অভিযানে অনেকটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।  অন্যান্য আলোচকদের মধ্যে ছিলেন কর্নোয়াল ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক শেলি ফেডম্যান, ‘রিসার্স ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশএর নির্বার্হী পরিচালক মেগনা গুহাতাকুর্তা, লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্সের অধ্যাপক নায়লা কবির, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড লুইস, সহকারী অধ্যাপক ক্যাসিয়া পাপরকি, অধ্যাপক কিংস কলেজের লেকচারার কিয়েরা মিটন, বাংলাদেশেরইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টএর গবেষক শাপার সেলিম ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া-বেকার্লিরইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়া স্টাডিজএর নির্বাহী পরিচালক সঞ্চিতা সাক্সেনা প্রমুখ।