Share |

ইউরোপীয়ানরা থাকছেন

পত্রিকা রিপোর্ট
লন্ডন, ২৪ জুন : খুব সহজেই ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বা ব্রিটেনে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাবেন ইউরোপিয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে আসা অভিবাসীরা। হোম সেক্রেটারি সাজিদ জাভিদ জানিয়েছেন, কেবল তিনটি সাধারণ তথ্য দিয়ে ইইউ নাগরিকরা ব্রিটেনে স্থায়ী হতে পারবেন। ব্রিটেনে যারা ৫ বছর পূর্ণ করেছেন তারা সরাসরি ব্রিটেনে স্থায়ীভাবে বসবাসের আবেদন করতে পারবেন। আর যাদের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়নি তারা প্রি-সেটেলড স্ট্যাটাস নিয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাস করতে পারবেন এবং তাঁরাও পাঁচ বছর পূর্ণ করার পর স্থায়ীবাসের জন্য আবেদন করতে পারবেন। 
গত ১৯ জুন বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে এসব কথা জানান হোম সেক্রেটারি সাজিদ জাভিদ। ব্রেক্সিট পরবর্তী সময়ে ইইউ নাগরিকরা ব্রিটেনে স্থায়ীবাসের সুযোগ পাবে কি-না, কতদিন তাদের জন্য ব্রিটেনের দরজা উন্মুক্ত থাকবে-এসব নিয়ে আলোচনা চলছে ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকেই। হোম সেক্রেটারির ঘোষণার পর ব্রেক্সিট পরবর্তী ব্রিটেনে ইইউ নাগরিকদের ভবিষ্যত নিয়ে অনেকটা নিশ্চিতভাবেই জানা গেল যে, খুব সহজেই তারা ব্রিটেনে থাকার সুযোগ পাবেন। 
সাজিদ জাভিদ বলেছেন, আবেদন প্রক্রিয় একেবারে সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। ব্রিটেনে স্থায়ীবাসের অনুমোদন দেয়ার মানসিকতা নিয়েই আবেদনগুলো বিবেচনা করা হবে। প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার কোটি ইইউ নাগরিক ব্রিটেনে স্থায়ীবাসের আবেদন করবেন বলে ধারণা। 
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত এক গণভোটে যুক্তরাজ্যের মানুষ ইইউ ত্যাগ করার পক্ষে রায় দেয়। মূলত ফ্রি মুভমেন্টের কারণে ইইউভূক্ত দেশগুলোর নাগরিকদের অবাধে আমগন এবং অভিবাসী প্রচুর বেড়ে যাওয়ার কারণেই যুক্তরাজ্যের মানুষ ইইউ ছাড়ার পক্ষে ভোট দেয়। এখন বিচ্ছেন কার্যকর হলেও ইইউর নাগরিকরা ঠিকই ব্রিটেনে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পাচ্ছেন। এ নিয়ে বড় ধরণের অসন্তোষ রয়েছে ব্রেক্সিটপন্থীদের।   ২০১৯ সালের মার্চ মাসে ব্রেক্সিট কার্যকর হওয়ার কথা। তবে সমঝোতা অনুযায়ী ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্তমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় উভয় পক্ষ। সে হিসাবে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে ইইউ নাগরিকদের অবাধ যাতায়াত অব্যাহত থাকবে। 
হোম সেক্রেটারি সাজিদ জাভিদ জানান, ইইউ নাগরিকরা মাত্র তিনটি প্রশ্নের জবাব দিয়ে স্থায়ী হওয়ার আবেদন করতে পারবেন। এতে তাদের পরিচয়, ব্রিটেনে অবস্থানের প্রমাণ এবং আবেদনকারী বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ রয়েছে কি-না, এই তিনটি বিষয় জানতে চাওয়া হবে। একটি সুনির্দিষ্ট ডাটাবেইজের সাথে তথ্যগুলো মিলিয়ে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে তাদের আবেদনের সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
এ জন্য ফি ধরা হয়েছে ৬৫ পাউন্ড। আর শিশুদের জন্য আবেদনের ফি তার অর্ধেক। স্মার্ট ফোনের অ্যাপস ব্যবহার করে ইউরোপীয় নাগরিকরা আবেদন করতে পারবেন। ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত এই বিশেষ প্রকল্প চালু থাকবে।
 এই বিশেষ প্রকল্পের জন্য ১৫শ কর্মীর একটি ইউনিট গতে তোলা হবে। এসব কর্মী আবেদনকারীদের সাথে প্রয়োজনে সাক্ষাত করবেন, টেলিফোনে কথা বলবেন এবং আবেদনপত্রে কোনো ঘাটতি থাকলে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবেন। 
চলতি বছরের শেষের দিক থেকে নতুন এই আবেদন প্রক্রিয়া সীমিত আকারে চালু করা হবে। আগামী বছরের ৩০ মার্চ থেকে পুরোদমে চালু হবে এই প্রকল্প। 
গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের জুনের মধ্যে ইইউ নাগরিকদের স্থায়ী আবেদনের সুরাহা করতে চাইলে হোম অফিসকে দিনে ৪ হাজার ৫শ আবেদনের সিদ্ধান্ত দিতে হবে। 
সাজিদ জাভিদ বলেন, ইইউ নাগরিকদের কোনো কার্ড দেয়া হবে না। তাদের একটি আইডি নম্বর দেয়া হবে। ওই নম্বর ব্যবহার করে তাঁরা যুক্তরাজ্যে চাকরি, চিকিতসাসহ সরকারী সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। 
এসব ইইউ নাগরিক বিদ্যমান আইন অনুযায়ী তাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদের (স্পাউস) ব্রিটেনে আনার সুযোগ পাবেন। এ জন্য তাদের আয়ের শর্ত পূরণ করতে হবে না। 
নতুন এই স্কিম বাস্তবায়নে সরকারের ব্যয় হবে ১৭০ মিলিয়ন পাউন্ড। নতুন এই স্কিম সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, আইসল্যান্ডের নাগরিকদের জন্যও প্রযোজ্য হবে।
হাউজ অব লর্ডে প্রশ্ন উত্তর পর্বে হোম সেক্রেটারী জানান ৩.৩ মিলিয়ন ইউরোপিয় নাগরিক লন্ডনে বসবাস করছেন এবং সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী প্রায় ৯শ হাজার ব্রিটিশ নাগরিক ইউরোপে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, আগামী বছর থেকে এ কার্যক্রম শুরু হবে। এতে আরো জানানো হয়, যাদের ঘরে স্মার্ট ফোন বা কম্পিউটার নেই তারা বিভিন্ন লাইব্রেরিতে গিয়েও আবেদন করতে পারবেন। যারা তাও করতে পারবেন না তাদেরকে ইমিগ্রেশন অফিসাররা ঘরে গিয়ে প্রয়োজনে সহযোগিতা করবে।
এদিকে তুমুল বিরোধীতার মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ পার্লামেনেন্টে পাশ হয়েছে ব্রেক্সিট বিল (ইইউ রিপিল বিল)। এই বিলের মাধ্যমে ইইউর সকল আইনকে যুক্তরাজ্যের অধীভূক্ত করা হয়েছে। যাতে ব্রেক্সিট পরবর্তী সময়ে কোনো আইনের সংকট না পড়ে। এই বিল পাশকে ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের পথে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে নর্দান আয়ারল্যান্ড সীমান্ত নিয়ে এখনো কোনো সূরাহায় পৌঁছাতে পারেনি উভয়পক্ষ। এ নিয়ে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ইইউর মতপার্থক্য রয়ে গেছে।  ব্রেক্সিটবিরোধীরা পুনরায় গণভোটের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা বলছেন, ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন হলে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ধসে পড়বে। ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন হবে চরম ভুল সিদ্ধান্ত। 

ব্রেক্সিট ইস্যুতে আইনমন্ত্রীর পদত্যাগ
যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ (ব্রেক্সিট) ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভোটাভুটির প্রাক্কালে পদত্যাগ করেছেন ব্রিটিশ আইনমন্ত্রী ফিলিপ লি। ব্রেক্সিট ইস্যুতে সরকারের কৌশল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার মন্ত্রিত্ব ছাড়ার ঘোষণা দেন ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির এই নেতা।  ফিলিপ লি২০১৬ সালে ব্রেক্সিট ইস্যুতে অনুষ্ঠিত গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এই রাজনীতিক। এখন মন্ত্রিত্ব ত্যাগের ফলে তিনি সরকারের অবস্থানের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
 ফিলিপ লি বলেন, যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গেলে আমার আসনের জনগণ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়াটা হবে দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ।
যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের বিষয়ে দ্বিতীয় দফায় আরেকটি গণভোটের আয়োজন করতে ব্রেক্সিট বাস্তবায়নে বিলম্বের আহ্বান জানান ফিলিপ লি।
এদিকে যুক্তরাজ্যের ইউরোপ ত্যাগের পক্ষে আন্দোলন করেছেন এমন কয়েকজন ব্রেক্সিটের পক্ষে হওয়া আন্দোলনকে ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ আখ্যা দিয়ে স্মৃতি জাদুঘর স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। সংগঠনের সদস্যরা মিউজিয়াম অফ ব্রেক্সিট ডট ইউকে নামের একটি ওয়েবসাইট খুলে সেখানে যুক্তরাজ্যের বাসিন্দাদের ২০১৬ সালের ২৩ জুনে ব্রেক্সিটের পক্ষে হওয়া গণভোটের স্মৃতিবিজড়িত ভাষণের অনুলিপি, আন্দোলনের স্মৃতিচিহ্ন, ছবি, ফিতার তৈরি ব্যাজ, প্রচারপত্রসহ অন্যান্য জিনিস পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
ওয়েবসাইটটিতে বলা হয়েছে, ‘আমাদের পরিকল্পনা স্মৃতি, ঘটনা এবং সংশ্লিষ্ট জিনিসগুলোকে এক জায়গায় নিয়ে আসা যাতে আমাদের দেশের ইতিহাস সংরক্ষণ করা যায়। আমাদের লক্ষ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এমন একটি সংগ্রহশালা তৈরি করা যা যুক্তরাজ্যের স্বাধীনতার জন্য হওয়া আন্দোলনকে স্মরণ করিয়ে দেবে। মিউজিয়াম অব ব্রেক্সিট নামের সার্বভৌমত্বের স্মৃতিবাহী জাদুঘরটি বানানোর উদ্যোগ যারা নিয়েছে এই ওয়েবসাইটটি তাদের।’
জাদুঘরটির জন্য নির্দিষ্ট স্থান এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। তবে লিংকন শহরসহ ইংল্যান্ডের মধ্যভাগে ব্রেক্সিটের পক্ষে সমর্থন প্রবল হওয়ায় সেখানকার কোনও একটি স্থানেই জাদুঘরটির স্থাপিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। জাদুঘরের উদ্যোক্তারা ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যের উগ্র ডানপন্থী ‘ইউকে ইন্ডিপেন্ডেন্স পার্টির’ (ইউকেআইপি) সাবেক নেতা নাইজেল ফারাজের সমর্থন পেয়েছেন, যিনি ব্রেক্সিটের পক্ষে শক্তিশালী প্রচারণা চালিয়েছিলেন। অন্যদিকে ব্রেক্সিট ইস্যুতে গণভোটের পর থেকে  যুক্তরাজ্যে বর্ণবাদ আরও বেড়েছে বলে করে জাতিসংঘ। সংস্থাটির বর্ণবাদ বিষয়ক বিশেষ দূত অধ্যাপক তেন্দায়ি আচিউম জানিয়েছেন, ওই ভোটাভুটির পর ক্রমবর্ধমান জাতিগত বৈষম্যের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সুস্পষ্ট জাতিগত, নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার মতো ঘটনা ঘটছে। বেড়েছে হেট ক্রাইমের মতো ঘটনার প্রবণতা।