Share |

পাঠ প্রতিক্রিয়া - হাসান শাহরিয়ার : সাংবাদিকতায় জীবন্ত কিংবদন্তি

ড: মীজানুর রহমান শেলীর সম্পাদনায় উ্স প্রকাশনের মোস্তফা সেলিমের উদ্যেগে সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ারের জীবন ও কর্মের উপর, হাসান শাহরিয়ার : সাংবাদিকতায় জীবন্ত কিংবদন্তি গ্রন্থটি হাতে আসার পর বলতে গেলে একটানেই পড়ে ফেললাম। গুনতিতে ভুল না হলে বলতে পারি প্রায় ৬৬ জন দেশি বিদেশী সাংবাদিক ছাড়াও ড: আনিসুজ্জামানের মত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির কলমের আচড় পড়েছে এই গ্রন্থটিতে। বৃহত্তর সিলেটের ভাটিবাংলার সন্তান হাসান শাহরিয়ারের বাবা ছিলেন সাংবাদিক। সেই ব্রিটিশ আমলে আসাম এসেম্বলীর এমএলএ ছিলেন। ছিলেন যুগবাণী, যুগভেরীর সম্পাদক। যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান সুনামগঞ্জের জুবিলি স্কুলে থাকতেই স্কুল ম্যাগাজিন প্রকাশ থেকে শুরু করে কচিকাঁচার মেলা, স্কাউট এবং সর্বোপরি ইত্তেফাকের স্থানীয় সংবাদদাতার দায়িত্ব পালন করেন। আইএ পাশ করার পর উচ্চতর অধ্যয়নের জন্যে চলে যান করাচী সেখানেই শেষ করেন মাস্টার্স। কাজ করেছেন ঢাকার ইত্তেফাক, করাচীর মর্নিং নিউজ, ডন, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও খালিজ টাইমসে। প্রায় তিন দশক তিনি ছিলেন নিউজ উইকের বাংলাদেশ প্রতিনিধি। বঙ্গবন্ধুসহ বড়মাপের রাজনৈতিক নেতারা হাসান শাহরিয়ারকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন তার রিপোর্টিং-এর কারণে।  হাসান শাহরিয়ার : সাংবাদিকতায় জীবন্ত কিংবদন্তি গ্রন্থটিতে কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের কয়েকজন সাবেক প্রেসিডেন্ট যেমন মারি বার্ট, রিটা পেইন, ফিনান্সিয়াল টাইমসের মার্টিন মুলিগান, মহেন্দ্র ভেদ হাসান শাহরিয়ারের সাংগঠনিক দক্ষতার কথা অবলীলায় বর্ণনা করেছেন তাদের লেখায়। ১৯৯৭ সালে কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সহ সভাপতি হন এবং পরে সভাপতি থাকাকালে প্রায় এক দশক হাসান শাহরিয়ার এই সংগঠনটিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। শুধু বিদেশী সাংবাদিক কেন দেশের প্রবীণ সাংবাদিকরাও তাদের লেখায় অকপটে হাসান শাহরিয়ারের পেশাগত দক্ষতার কথা স্বীকার করার পাশাপাশি তার সাংগঠনিক দক্ষতা ও সজ্জন স্বভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। সাংবাদিকদের কাজের সুবিধার জন্যে তিনিই ইত্তেফাকে বিট পদ্ধতি চালু করেছিলেন বলে তার কয়েকজন সহকর্মী লিখেছেন। 
হাসান শাহরিয়ার তার স্বাতন্ত্র্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। সাংবাদিকতা করতে গিয়ে রাজনীতি বা ব্যবসাবাণিজ্য করেননি। কর্পোরেট বিজনেসগুলোর মিডিয়াতেও চাকুরি করেননি। কোন পত্রিকা থেকে তার চাকুরি যায়নি বরং নীতির সাথে আপোষ করেননি বলে তিনি দুইবার লোভনীয় চাকুরি থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। হাসান শাহরিয়ারের সাফল্যের মূলে ছিল তার পেশাদারিত্ব। তিনি আভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে সব্যসাচীর মত কাজ করেছেন। ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী, প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হক, মাদার তেরেসাসহ অনেক আন্তর্জাতিক নেতার। অসংখ্য রিপোর্টিং আছে তার। বই লিখেছেন কয়েকটি এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অতীত অতীত নয়, নিউজ উইকে লেখা প্রতিবেদনের বাংলা সংস্করণ মুক্তিযুদ্ধ, বিজয় ও তারপর। শেষ ভাল যার সব ভাল তার। ঢাকা প্রেস ক্লাবকে যেমন তিনি নিরপেক্ষভাবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তেমনি তিনি সিজেএ এরও নেতৃত্ব দিয়ে এটা প্রমাণ করেছেন যে, যোগ্যতা আর সদিচ্ছা থাকলে বাঙালীরাও আন্তর্জাতিক সংগঠনকে নেতৃত্ব দিতে পারে। আমার এই কথাগুলোর প্রমাণ পেয়েছি বিদেশী প্রবীণ সাংবাদিকদের লেখায়। শাহরিয়ার ভাইয়ের ক্যারিয়ার নিয়ে অনেকে কিছু অনেক কিছু লিখেছেন। কিন্তু আমরা যারা বিদেশে মিডিয়াতে কাজ করছি তাদের কাছে হাসান শাহরিয়ার এক জীবন্ত কিংবদন্তী। করাচীর ডেইলি ডন থেকে ঢাকার ইত্তেফাক- এইতো যথেষ্ট। খালিজ টাইম বা ইন্ডিয়ার আরো স্বনামধন্য পত্রিকায় হাসান শাহরিয়ার কাজ করেছেন এগুলো তার জীবন বৃত্তান্তে স্বর্ণপালক হলেও সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ারের বর্ণাঢ্য পেশাজীবন আরো উজ্জ্বল। এই পেশাজীবনে তিনি ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাকিস্তান সফর কভার করেছিলেন। পাকিস্তানে থাকার সময় তিনি সেখানকার বড় বড় নেতাদের সান্নিধ্য পেয়েছেন, কাজ করেছেন স্বনামধন্য সাংবাদিকদের সাথে। ১৯৭৪ সালে দৈনিক ইত্তেফাকে যোগ দিয়েছেন। তখন তিনি পাকিস্তান থেকে ফিরে এসেছেন মাত্র। বঙ্গভবনে গেছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ উল্লার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে। বঙ্গবন্ধু শাহরিয়ার ভাইকে দেখে বললেন, তুই ইত্তেফাকে জয়েন করেছিস ভাল হয়েছে। 
এতো গেল বঙ্গবন্ধুর কথা। হাসান শাহরিয়ার কার না স্নেহ পেয়েছেন। তার নিজের কথায় শোনা যায়, দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে তার কি মধুর সম্পর্ক ছিল। কিন্তু তিনি এই সম্পর্ককে কখনো পার্থিব লাভালাভের কাছে বিক্রি করে দেননি। কর্পোরেট হাউসের চাকুরি করতে পারেননি তিন মাসও। হাসান শাহরিয়ার এ রকমই, তিনি তার পেশার সাথেই একাত“ হয়ে গিয়েছিলেন। পেশার মান রাখতে গিয়ে মালিকের দাসত্ব মেনে নেননি। তাই হাসান শাহরিয়ার এখন রোল মডেল হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। প্রেস ক্লাবের সংগঠকের ভূমিকায় শাহরিয়ার ভাই রেখেছেন নিরপেক্ষ ভূমিকা। সামরিক সরকার বা দলীয় সরকারের আমলে তিনি কখনও কারো পক্ষ অবলম্বন করেননি। দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, আব্দুস সামাদ আজাদ বা অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান সবার সাথেই তিনি কাজ করেছেন। দেশের প্রেসক্লাব ছাড়াও কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি হিসাবেও আমরা দেখেছি তার দক্ষতা।
হাসান শাহরিয়ার ভাইয়ের সাথে ১৯৯৭ সালে সিজিএ’এর সম্মেলনে দেখা হংকং-এ। ঐ সময়টা ছিল ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ঐ বছর হংকং বৃটিশ কলোনী থেকে চীনের কাছে হস্তান্তরিত হচ্ছিল। শাহরিয়ার ভাই ঢাকা থেকে এক বিরাট গ্রুপ নিয়ে গিয়েছিলেন। এনার হাসান সাইদ (প্রয়াত), ফরিদ হোসেন, প্রয়াত সালেহ চৌধুরিসহ আরো কয়েকজন স্বনামখ্যাত সাংবাদিক ছিলেন দলে। লন্ডন থেকে আমি আর প্রয়াত আমিনুল হক বাদশা ভাই গেছি। হংকংয়ের বিদায়ী গভর্ণর ক্রিস প্যাটেন সম্মেলনের উদ্বোধন করলেন এবং হংকং সরকার কমনওয়েলথ জার্নালিস্টদের জন্যে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান প্রদর্শন, লাঞ্চ ও ডিনারের আয়োজন করলেন। ডিনার শেষে প্রতিটি দেশ তাদের দেশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতো। রাতে শাহরিয়ার ভাইর রুমে বসত আড্ডা প্রয়াত হাসান সাঈদ, সালেহ চৌধুরি ও আমিনুল হক বাদশা আসর মাতিয়ে রাখতেন। শাহরিয়ার ভাই ছিলেন রাতের আড্ডার মধ্যমনি। 
শাহরিয়ার ভাইয়ের এ রকম আরেকটি সফর ছিল মা?ায় ২০১২ সালের সিজিএ সম্মেলন। ড: মিজানুর রহমান শেলিও এসেছিলেন ঐ সম্মেলনে আবারও রাতে শাহরিয়ার ভাইয়ের রুমে নিশি রাতের আড্ডা। বিবিসি’র সাবেক সাংবাদিক গোলাম কাদের সবুজভাই আড্ডার কথক। ড: মীজানুর রহমান শেলী স্যার যখন কথা বলেন তখন মনে হয় তিনি কোন ঘটনার ধারাবর্ণনা করছেন। অত্যন্ত শ্রুতিমধুর তার বর্ণনা। ঐ আড্ডায় পাকিস্তানের তৎকালীন ফরেন মিনিস্টার হিনা রব্বানী খারকে নিয়ে মিডিয়ায় চলছে তোলপাড়। সুন্দরী তরুণী হিনা রব্বানীর জন্ম ১৯৭৭ সালে। বেনজির ভুট্টোর ছেলে তরুণ বিলওয়াল ভুট্টো আর হিনা রব্বানীর প্রণয় নিয়ে চলছে মিডিয়ায় আলোড়ন।
 সুন্দরী হিনা রব্বানীকে নিয়ে আলোচনা করতে করতে আড্ডার গতিপথ অকৃতদার শাহরিয়ার ভাইকে ঘিরে আলোচনা জমে উঠলো। বিবিসির গোলাম কাদের ভাই পাকিস্তানে হাসান শাহরিয়ার ভাইয়ের সাথে ছিলেন। তাই কথা বেশি তিনিই বলছিলেন। শাহরিয়ার ভাই কেন সারা জীবন অকৃতদার থেকে গেলেন? এই প্রশ্নের কোন জবাব পাওয়া যাচ্ছিলনা। শাহরিয়ার ভাই শুধু হাসছিলেন আর বলেছিলেন হামে না পুছো, পুছো বুলবুল ছে। আসলে অকৃতদার হাসান শাহরিয়ারের অকৃতদার থাকার পেছনে পার্বতীটি কে তা কেউ জানল না। ৪০৮ পৃষ্ঠার বইয়ে তাঁর অনেক বন্ধুর লেখায়ও পার্বতীর কোন খোঁজ পাওয়া গেল না। যদি আসলেই থেকে থাকেন এ রকম কেউ তাহলে সেই পার্বতী রয়েই গেলেন অগোচরে। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় সিলেট উৎসবে গেছি, এক সন্ধ্যায় কলকাতার যোধপুর বয়েজ স্কুলের মাঠে হাঁটছিলাম আমি আর শাহরিয়ার ভাই। তিনি আমাকে বল্লেন, জানো বাসন সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। তার কণ্ঠে ফুটে উঠল এক বিরহ জ্বালা যেন। প্রিয় কিছু বিসর্জন দিয়ে দিয়েছেন।
সব বয়সের মানুষকে আপন করে নেয়ার এক যাদুকরি ক্ষমতা রয়েছে হাসান শাহরিয়ারের। সব তারকা নেতা আপন করতে পারেন না, কারন তারকারা আকাশেই থাকতে ভালবাসেন। কর্পোরেট বিজনেসের মিডিয়া হাউসের মালিকানার যুগে সাংবাদিকরা স্বাধীন থাকতে পারেন না। বর্তমানে সাংবাদিকতা ও অনলাইন সাংবাদিকতা ও ফেইক নিউজ ও রিয়েল নিউজের পার্থক্য সৃষ্টি করেছে। কিছু কিছু সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে বিজনেস হাউসগুলোর পাবলিক রিলেশন্স এর কাজ করে যাচ্ছেন বিজনেস হাউসগুলোর জন্যে এ সময় হাসান শাহরিয়ারদের অবস্থানও ভিন্ন হয়ে গেছে। এই ভিন্ন সময়ে  হাসান শাহরিয়ার তার নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায়। দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা করে একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন যে গড্ডালিকা প্রবাহে গা না ভাসিয়েও ভাল ভাবে বেঁচে থাকা যায়। বঙ্গবন্ধু ও তার তনয়ার নিকট থেকে এমপি হওয়ার অফারও তিনি সবিনয়ে ফিরিয়ে দিতে পেরেছিলেন। কিসের জোরে হাসান শাহরিয়ার তার পেশাকে লোভ-লালসার উর্ধে তুলে ধরেছিলেন তা ছিল তার ভালবাসা ছিল সত্যকে ভালবাসা তার এই ভালবাসা ছিলো কঠিনেরে ভালবাসা। তাইতো তিনি আজ জীবন্ত কিংবদন্তি হতে পেরেছেন। আমি তার সুস্বাস্থ্য কামনা করি। ভাল থাকুন অগ্রজপ্রতীম আমার শাহরিয়ার ভাই। 
লন্ডন : ২২ জুন ২০১৮
লেখক : সাবেক সম্পাদক, সাপ্তাহিক সুরমা। প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব। সাবেক কমিউনিকেশন্স এ্যাডভাইজার টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল।