Share |

আফতাব আলী এবং আলতাব আলী নাম বিভ্রাট প্রসঙ্গে

ইসহাক কাজল
দৈনিক প্রথম আলো ১ লা মে দিবস সংখ্যায় আমার প্রিয় লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখিত ‘মে দিবস : দেশের শ্রমিকশ্রেণির ত্যাগ বনাম প্রাপ্তি’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। 
প্রবন্ধটির এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দক্ষিণপস্থী নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশন’। তার নেতৃত্বে ছিলেন ডা. আবদুল মোতালেব মালিক (একাত্তরে অধিকৃত পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর) ও আলতাফ আলী। অবিভক্ত ভারতবর্ষে তাঁরা কলকাতায় শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।’ 
কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য হচ্ছে, ‘পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশন’-এর নেতৃত্বে ছিলেন, বিলাতে প্রবাসীদের পথিকৃত, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শ্রমিক নেতা আফতাব আলী, আলতাফ আলী নয়। তবে এ সত্যও অস্বীকার করা যাবে না বর্ণবাদী হামলায় নিহত আলতাব আলীও বিলাত প্রবাসি বাঙালিদের বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন সংগ্রামের আলোর মশাল হয়ে এখনো দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। এখানে উল্লেখ্য যে, আফতাব আলীর জন্ম ১৯০৭ সালে সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার কাঠল খাইড় গ্রামে। ১৯২১ সালে যখন মেট্রিক পরীক্ষা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখনই মহাত্মা গান্ধির ডাকা অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করে কলকাতা চলে যান। সেখানে আন্দোলন সংগ্রামের সাথে সাথে ১৯২৬ সালে ইন্ডিয়ান সি-ম্যানস ইউনিয়নে যোগদান করে তিনি শ্রমিক আন্দোলন শুরু করেন। 
১৯২৯ সালে তিনি ইন্ডিয়ান সি-ম্যানস ইউনিয়নের জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ১৯৩৩ সালে জেনেভায় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ভারতীয় প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন। আফতাব আলী বেঙ্গল বিধান সভার সদস্য ছিলেন এবং পরে ভারতবর্ষের কেন্দ্রীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ সালে তিনি আল-ইন্ডিয়া সি-ম্যানস ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে তিনি আইএলও-এর গর্ভনিং বড়ির সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৫১ সালে ইন্টারন্যাশনাল লেবার আর্গেনাইজেশন-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান ওভারসিজ সি-ম্যানস ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর তিনি লন্ডনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আফতাব আলীর প্রচেষ্টায় বিলাতে কর্মসংস্থানের জন্য ভাউচার প্রথা চালু হয়েছিল যার সুবিধা ভোগ করেছিলেন সিলেটের হাজার হাজার মানুষ। তাঁরই প্রচেষ্টায় সিলেটে আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস স্থাপিত হয়েছিল। এই হচ্ছে আফতাব আলীর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিবরণী।
অন্যদিকে, আলতাব আলীর জন্ম ১৯৫৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার ইলামের গাঁওয়ে। ১৯৬৯ সালে ভাগ্যন্বষণে চলে আসেন বিলাতে। আলতাব আলী গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন। বয়স ছিল মাত্র ২৫ বছর। ১৯৭৮ সালের ৪ মে, বৃহস্পতিবার, ছিল আবার টাওয়ার হ্যামলেট্স বারা কাউন্সিলের নির্বাচন। তাই কাউন্সিল এলাকার বাঙালিরাও নির্বাচনী আমেজে ছিলেন। সম্ভবত আলতাব আলীও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। হ্যানবারি স্ট্রিটের ফ্যাক্টরিতে কাজ শেষে যথাসময়ে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রত্যাশা নিয়ে ১২৬ গোলস্টন স্ট্রিটের বাসার উদ্দেশ্যে বের হন। বাসায় ফেরার পথে এডলার স্ট্রিটে সন্ধ্যা সাতটার দিকে একদল বর্ণবাদীর অতর্কিত হামলার শিকার হয়ে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। 
দিন, মাস ও বছর পরিক্রমার ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ৪ মে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর কাছে এই দিনটি সাধারণ একটি দিন। কিন্তু বিলাতবাসী বাঙালি জনগোষ্ঠীর দ্বিতীয় প্রজন্মের কাছে এই দিনটি রাজনৈতিক জাগরণের দিন। মিছিলে মিছেলে রাজপথ প্রকম্পিত করে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও দ্রোহের আগুনে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দিন। তাই বিলাতবাসী বাঙালি জনগোষ্ঠীর কাছে আলতাব আলী শুধু একটি নামই নয়, একটি ইতিহাস; বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের আলোকবর্তিকা ও বিজয়ের প্রতীক। আর সে বিজয়ের স্মারক হচ্ছে, আজকের বহুল পরিচিত ও উচ্চারিত পূর্ব লন্ডনের আলতাব আলী পার্ক। এই পার্কটির নাম ছিল সেন্ট মেরিজ পার্ক। 
আলতাব আলী হত্যাকাণ্ডের ২০ বছর পর ১৯৯৮ সালে এই সেন্ট মেরিজ পার্কের নাম পরিবর্তন করে নামকরণ করা হয়, ‘আলতাব আলী পার্ক’। সঙ্গে সঙ্গে আলতাব আলী আর্চ নামেও একটি গেইট নির্মাণ করা হয়। ১৯৯৯ সালে বিলাতের কয়েকটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের অর্থায়নে এবং টাওয়ার হ্যামলেট্স বারা কাউন্সিলের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় পার্কটির পশ্চিম কোণে নির্মাণ করা হয় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে একটি শহীদ মিনার।
২০১৫ সালের ২৩ অক্টোবর টাওয়ার হ্যামলেট্স বারা কাউন্সিলের নির্বাহী মেয়র জন বিগস্ আলতাব আলী পার্কে গ্রিন ফ্ল্যাগ উত্তোলনকালে ৪ মে আলতাব আলী হত্যাকাণ্ডের দিনটিকে ‘আলতাব আলী দিবস’ ঘোষণার পাশাপাশি এ দিবসকে কাউন্সিলের উদ্যোগে প্রতি বছর পালনের সিদ্ধান্তের কথাও ঘোষণা করেন। সে ঘোষণা অনুযায়ী ২০১৬ সালের ৪ মে থেকে প্রতি বছর কাউন্সিলের উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে আলতাব আলী দিবস পালিত হয়ে আসছে।  
পুনশ্চ : দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত মে দিবস সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিটি প্রবন্ধ-নিবন্ধ মনোযোগ সহকারে পাঠ করেছি এবং সংগ্রহে রেখেছি। প্রতিটি প্রবন্ধ-নিবন্ধে পোশাক, পরিবহন, কৃষি, নির্মাণ, চাতাল, ওয়েলডিং, শিল্প, হোটেল, দোকান, রেল ও নৌপথ শ্রমিকেদের দু:খ-বেদনা ও পাওয়া না পওয়ার কতিপয় ছিল ফুটে উঠলেও সিলেট তথা বাংলাদেশের প্রায় ৭ লাখ চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠির বঞ্চনা আর দাসত্বের ১৮০ বছরের কোনো উল্লেখ নেই যা খুবই দুঃখজনক। 
লন্ডন ০৯ জুন ২০১৮
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ।