Share |

সিলেট সিটি নির্বাচন : প্রচার শুরু কামরানের, আরিফ আছেন শঙ্কায়

সিলেট, ২৪ জুন : দায়িত্বে বিএনপিদলীয় মেয়র। তাঁর আমলে সিলেট নগরে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু এর কৃতিত্ব দাবি করছে আওয়ামী লীগ। উন্নয়নকে পুঁজি করেই এবার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রচার চালাবে ক্ষমতাসীন দলটি। অবশ্য এ নিয়ে বিএনপির তেমন মাথাব্যথা নেই। বিএনপির শঙ্কা দুটো। এক, খুলনার মতো সিলেটেও ‘নিয়ন্ত্রিত’ নির্বাচন হয় কি না। দুই, জামায়াত পাশে থাকবে কি না।
৩০ জুলাইয়ের সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী বদর উদ্দিন কামরান। তাঁকে প্রথমেই নগরের উন্নয়নের কথা স্বীকার করে নিতে হবে। আর এই উন্নয়ন হয়েছে বিএনপিদলীয় বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সময়ে। কিন্তু আওয়ামী লীগ বলছে, এই কৃতিত্ব স্থানীয় সাংসদ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের। তাঁর কারণেই বিগত পাঁচ বছরে নগরুউন্নয়নে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকার কাজ হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সিলেট মহানগর শাখার গুরুত্বপূর্ণ একাধিক নেতা জানিয়েছেন, নগর উন্নয়নের প্রায় সবটাই অর্থমন্ত্রী বরাদ্দ দিয়েছেন। অথচ পুরো কৃতিত্ব নিচ্ছেন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এটা হতে দেওয়া হবে না। সিটি নির্বাচনের প্রচারণায় তাঁরা বিষয়টি তুলে ধরবেন। আ.লীগের জেলা ও মহানগরের সাতজন নেতার মতে, সিলেটের বর্তমান মেয়রের সব উন্নয়নকাজ বর্তমান সরকারের উদ্যোগের ফসল। এটি প্রচারের পাশাপাশি সরকারি দলের প্রার্থী জয়ী হলে নাগরিক সুবিধা বেশি পাওয়া যাবে, এমন প্রচারও চলবে।
এবারই প্রথম সিলেট সিটি নির্বাচন হচ্ছে দলীয় প্রতীকে। সংগত কারণেই জাতীয় রাজনীতির প্রভাব থাকবে এই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। তাই সরকারের জাতীয় উন্নয়ন প্রচারের পাশাপাশি দলটি স্থানীয় পর্যায়ে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলোও ব্যাপকভাবে প্রচারণায় নিয়ে আসবে। সিটি নির্বাচনে সরকারি দলের প্রার্থী এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদরউদ্দিন আহমদ কামরানই মেয়রপ্রার্থী হচ্ছেন বলে জানা গেছে। এদিকে গত সোমবার মহানগর আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহউদ্দিন সিরাজ বলেন, ‘যেহেতু মেয়র পদে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মনোনয়ন চাইছেন, আমার অনুরোধ থাকবে, অন্যরা তাঁদের সমর্থন দিয়ে দলের মনোনয়ন চাওয়া থেকে সরে দাঁড়াবেন।’ এ আহ্বানের সঙ্গে একজন মনোনয়নপ্রত্যাশী সহমত প্রকাশ করলেও অন্যরা কোনো মন্তব্য না করায় মেয়র পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী পাঁচ নেতার নামই কেন্দ্রে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। বিষয়টিকে দলীয় অনৈক্য হিসেবেই দেখছেন ওয়ার্ড পর্যায়ের পাঁচজন প্রথম সারির নেতা। তাঁরা মনে করেন, অনৈক্য দূর করা না গেলে ঘরের আগুনেই দলীয় প্রার্থীকে ভুগতে হবে।
আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা বলেন, আওয়ামী লীগ জবরদস্তি বা কেন্দ্র দখলের মতো কাজ করবে না। তবে কিছু কৌশল নেবে। জামায়াতের প্রার্থী যেন স্বতন্ত্র হিসেবে মেয়র পদে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকেন, সেটি নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নেবে। দল ক্ষমতাসীন হলেও কোনো প্রভাব বিস্তারকে আওয়ামী লীগ প্রশ্রয় দেবে না বলে জানিয়েছেন মিসবাহউদ্দিন সিরাজ। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন যে সম্ভব, সেই দৃষ্টান্ত স্থাপনের পাশাপাশি আমরা জিততেও চাই।’  
‘নিয়ন্ত্রিত’ নির্বাচনের ভয়
সিলেটেও খুলনার মতো ‘নিয়ন্ত্রিত’ নির্বাচন হতে পারে বলে মনে করছে বিএনপি। মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ দুজন নেতার ভাষ্য, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবন্দী অবস্থায় দলের নীতিনির্ধারকেরা স্থানীয় নির্বাচনগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছেন। তাঁরা সব ধরনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এড়িয়ে দলীয় প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধ। তবে শেষ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে কি না, তা নিয়ে তাঁরা শঙ্কিত।
এই শঙ্কার বাইরেও দলীয় প্রার্থীকে আরও কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে বলে মনে করেন বিএনপির নেতৃত্বস্থানীয় কয়েকজন নেতা। মহানগর বিএনপির এক নেতা বলেন, মেয়র পদে এরই মধ্যে জামায়াতে ইসলামী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তাঁদের মহানগর শাখার আমির এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের নাম ঘোষণা দিয়েছে। এর পেছনে আওয়ামী লীগ ও একটি সংস্থার লোক কলকাঠি নাড়ছেন বলে বিএনপি জানতে পেরেছে। এতে বিএনপির প্রার্থীর ভোট ভাগাভাগি হতে পারে।
জামায়াতের মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘আমার প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত রয়েছে। গত নির্বাচনেও প্রার্থী হতে ইচ্ছুক ছিলাম। আশা করছি, জোট থেকে আমাকেই মনোনয়ন দেবে।’
বিএনপির ওয়ার্ড পর্যায়ের কয়েকজন নেতা মনে করেন, বিএনপির মেয়র কারাগারের বাইরে থাকার আড়াই বছরে প্রচুর উন্নয়ন করে প্রশংসা পেয়েছেন। আবার তাঁর কারারুদ্ধ থাকার বিষয়টি সাধারণ ভোটাররা ‘সরকারের কূটকৌশল’ হিসেবেই দেখছেন। তাই শেষ পর্যন্ত জামায়াত এককভাবে নির্বাচনে করলেও সেটা খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারবে না। সরকার কোনো দুরভিসন্ধি না করলে বিএনপির প্রার্থীই জিতে যাবেন। সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ বলেন, খুলনার মতো সিলেটেও ‘নিয়ন্ত্রিত’ নির্বাচনের আশঙ্কা রয়েছে সবার মনে। এমনটা যদি হয়, তাহলে বিএনপি দলীয়ভাবে তা প্রতিরোধ করবে। 
প্রচার শুরু কামরানের
সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র পদপ্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরান তাঁর আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করেছেন।
গত রোববার (২৩ জুন) হজরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজার জিয়ারত ও শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে এই প্রচারণা শুরু হয়। সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদর উদ্দিন আহমদ কামরান এদিন বাদ আসর মাজার জিয়ারত করেন। পরে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনি নগরীর চৌহাট্টার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পু?স্তবক অর্পণ করেন।
এ সময় কামরান বলেন, ‘দলীয় মার্কা ঘোষণার পর থেকে জেলা ও মহানগরের সর্বস্তরের নেতৃবৃন্দের মধ্যে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। আমরা এ নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে ঘোষণা করেছি। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে নৌকা প্রতীকের বিজয় নিশ্চিত করব। আজ থেকে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার প্রচারণার কাজ শুরু করলাম।’
সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র কামরান বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বিশাল একটা রাজনৈতিক সংগঠন। এখানে নেতাকর্মীদের মান অভিমান থাকাটা স্বাভাবিক। তবে এবার আমাদের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য নেই। নেত্রী যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন সেভাবে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাব।’
এ সময় কামরান আগামী ৩০ জুলাই নির্বাচনে সিলেট নগরবাসীকে তাদের আমানত (ভোট) দিয়ে তাঁকে সেবা করার সুযোগ দেওয়ার জন্য আহ্বান জানান।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা হক, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আশফাক আহমদ, সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ সুজাত আলী রফিকসহ নেতৃবৃন্দ।
এদিকে, রোববার দুপুরে সিলেট আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে বদর উদ্দিন কামরানের পক্ষে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি সিরাজ বকস।