Share |

জগন্নাথপুর ব্রিটিশ-বাংলা এডুকেশন ট্রাস্টের উদ্যোগ : হাওর এলাকায় হচ্ছে অত্যাধুনিক এডুকেশন রিসোর্স সেন্টার

লন্ডন, ০২ জুলাই : সিলেটের সুনামগঞ্জের হাওর এলাকা হিসেবে পরিচিত জগন্নাথপুর। এই এলাকার শিক্ষার উন্নয়নে শুরু থেকেই কাজ করছে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত জগন্নাথপুরবাসীর সংগঠন ‘জগন্নাথপুর ব্রিটিশ-বাংলা এডুকেশন ট্রাস্ট’। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা দেয়া এই সংগঠনের নিয়মিত কাজ। তবে গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে এবার তারা বিশাল এক উদ্যোগ নিয়ে হাজির হয়েছে। জগন্নাথপুর উপজেলায় তাঁরা গড়ে তুলবেন অত্যাধুনিক এডুকেশন সেন্টার। প্রয় ৫ কোটি টাকা বাজেটের বিশাল এই প্রজেক্টের জমি নির্দিষ্টকরণ এবং ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কাজ ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগের পাশাপাশি সংগঠনটি তাদের নিয়মিত কাজ- দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে বৃত্তিপ্রদানও চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে বছরে ৩০ লাখ টাকার শিক্ষাবৃত্তি দিচ্ছে এই সংগঠন। প্রতিবছর এতে উপকৃত হচ্ছে জগন্নাথপুরের প্রায় ১২শ শিক্ষার্থী।  সম্প্রতি সাপ্তাহিক পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সংগঠনের অগ্রযাত্রা ও নানামুখী কার্যক্রমের কথা জানালেন জগন্নাথপুর ব্রিটিশ-বাংলা এডুকেশন ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি মহিব চৌধুরী।  
    সংগঠনটির জন্মকথা
১৯৯৯ সালের কথা। সেই সময়ের জনপ্রিয় বাংলা সাপ্তাহিক ‘নতুন দিন’ এর কার্যালয় ছিল পূর্ব লন্ডনের। বাঙালি কমিউনিটির পরিচিত মুখ ছিলেন ওই পত্রিকার সম্পাদক। তখন বাঙালি কমিউনিটির বিশিষ্টজনদের আড্ডা জমতো নতুন দিন অফিসে। এই নতুন দিন অফিসেই জগন্নাথপুর ব্রিটিশ-বাংলা এডুকেশন ট্রাস্টের যাত্রা শুরু হয়। এখানে  ট্রাস্ট গঠনের লক্ষ্যে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে ১৪ জনের একটি কমিটি করা হয়। এতে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব দেয়া হয় এম এ আহাদকে। সেক্রেটারি ছিলেন মহিব চৌধুরী এবং  ট্রেজারার হিসেবে দায়িত্ব পান এস আই আজাদ আলী এবং সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পান এম এম নূর।  সংগঠনটির প্রথমদিককার কার্যক্রম প্রায় চলতো তৎকালীন ব্রিক লেইনের আকাশ রেস্টুরেন্টে।    
এগিয়ে চলা
নতুন সংগঠন। কার্যক্রম এগিয়ে নিতে চাই অর্থ। শুরু হলো ট্রাস্টি সংগঠন। সংগঠনটির মহৎ উদ্দেশ্য সম্পর্কে জেনে প্রথম সভায় ১৪ জন ট্রাস্টি হলেন। তাঁরা প্রত্যেকে দুই হাজার পাউন্ড করে দান করলেন। চলতে থাকলো ট্রাস্ট্রি সংগ্রহ। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত জগন্নাথপুরের বিশিষ্টজনরা নিজ এলাকার শিক্ষার বিস্তারের কাজে শরিক হতে সাদরে ট্রাস্টি পদ নিতে থাকলেন। এক বছরের মাথায় সংগঠনটির তহবিলের আকার এক কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেল।  
নির্দিষ্ট সময় পর পর নিয়মতান্ত্রিকভাবেই একের পর এক কমিটি সংগঠনটির নেতৃত্ব দিয়েছে। সময়ের সাথে সাথে এর কার্যক্রম হয়েছে আরও গতিশীল। বর্তমান প্রেসিডেন্ট আশিক চৌধুরী  এবং সাধারণ সম্পাদক মহিব চৌধুরীর নেতৃত্বে ৩১ সদস্যের নির্বাহী কমিটি ২০১৭-১৮ সাল মেয়াদে সংগঠনটির নেতৃত্ব দিচ্ছে। বর্তমানে এই সংগঠনের মোট ট্রাস্টি ১৫৪ জন। আর তহবিল বেড়ে হয়েছে তিন কোটি টাকার বেশি। বেড়েছে কার্যক্রমের পরিধিও।  
 শিক্ষাবৃত্তি বিতরণ
২০০১ সালে প্রেসিডেন্ট এম এ আহাদ, সেক্রেটারি মহিব চৌধুরী, ট্রেজারার স আই আজাদ আলী এবং সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এম এম নূরের নেতৃত্বে প্রথম বৃত্তি বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম বছর গরিব ও মেধাবী ৭১২ জন শিক্ষার্থীকে পড়াশোনায় উৎসাহিত করতে বৃত্তি প্রদান ও সম্মাননা সনদ দেয়া হয়।  প্রথমবারের ওই বৃত্তিপ্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ। ২০০২ সালে ওই কমিটি প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীর মাঝে বৃত্তি বিতরণ করে। সেই থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত একই কমিটি প্রায় সমান সংখ্যক শিক্ষার্থীকে প্রতিবছর বৃত্তি প্রদান করে।
২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট এম এম নূর এবং সেক্রেটারি এফ আকিক রহমান পরীক্ষা নিয়ে গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করে। ওইবার প্রায় এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থী বৃত্তির জন্য পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে থেকে ৪শ শিক্ষার্থীকে বৃত্তিপ্রদান করা হয়। তারপর থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর এক হাজার থেকে ১২শ শিক্ষার্থীকে নগদ অর্থ এবং স্বীকৃতি সনদ প্রদান করা হয়েছে।
 সাবেক সেক্রেটারি মুজিবুর রহমান মুজিব জানান, ২০১৫ সালে লাইব্রেরি এবং কম্পিউটার প্রজেক্ট হাতে নেয় জগন্বাথপুর ট্রাস্ট।?জগন্নাথপুরে ২৩টা হাই স্কুল এবং ২২টি মাদ্রাসা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এগুলোর মধ্যে যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটা রুম দিতে পেরেছে সেগুলোতে লাইব্রেরি করে  দেয়া হয়। ৫১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে লাইব্রেরি করে দেয়া হয়েছিল। ওই সময় তিনি সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করছিলেন। আর প্রেসিডেন্ট ছিলেন  মহিব চৌধুরী এবং ট্রেজারার ছিলেন আবদুস শহিদ।  
তিনি আরও জানান, ওই সময়ে সংগঠনের তহবিলে প্রায় ৭০ লাখ টাকা জমা হয়।   ২০১৭ সালে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীকে মোট ৩০ লাখ টাকার বৃত্তি প্রদান করা হয়। চলতি বছরও সমপরিমান টাকার বৃত্তি প্রদান করা হয়। এ বছর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের এক লাখ টাকা করে বৃত্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এবং বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া  একজন শিক্ষার্থীকে এক লাখ টাকার চেক প্রদান করা হয়।  
সংগঠন সেক্রেটারি মহিব চৌধুরী জানান, জগন্নাথপুর উপজেলায় ২২টি উচ্চ বিদ্যালয়, ৫টি কলেজ এবং ২০টি আলিয়া মাদ্রাসা রয়েছে। এই সবগুলো প্রতিষ্ঠানের গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা বৃত্তি প্রদান করে জগন্নাথপুর এডুকেশন ট্রাস্ট। তিনি বলেন, প্রতি বছর এই ট্রাস্টের শিক্ষা বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও মন্ত্রীরা উপস্থিত থাকেন বলে এই বৃত্তি নিয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহও বেশি।   
এডুকেশন সেন্টার
হাওর এলাকা জগন্নাথপুরে অত্যাধুনিক এডুকেশন রিসোর্স সেন্টার গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে জগন্নাথপুর এডুকেশন ট্রাস্ট। সংগঠনের নেতৃবৃন্দ জানান, চলতি বছরের শুরুতে প্রস্তাবিত এডুকেশন সেন্টারের জন্য জমি নির্দিষ্ট করা হয়েছে। জমিটি দান করেছেন ট্রাস্টের এক সুহৃদ ট্রাস্টি হাসনাত হোসেন। ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে সেন্টারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনও করা হয়েছে। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বাংলাদেশ সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান। এ অনুষ্ঠানে যুক্তরাজ্য থেকে ৩০ জনের বেশি ট্রাস্টি যোগ দেন।
 ৩ তলা বিশিষ্ট এই এডুকেশন সেন্টারে গ্রন্থাগার, কম্পিউটার ল্যাব, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ শিক্ষামূলক নানা সুবিধা থাকবে। স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য এসব সুবিধা উন্মুক্ত থাকবে।  
এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় ৫ কোটি টাকা। এরমধ্যে ২ কোটি টাকা জগন্নাথপু এডুকেশন ট্রাস্টের তহবিল থেকে পর্যায়ক্রমে যোগান দেয়া হবে। আর বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে  ৩ কোটি টাকার।
 মহিব চৌধুরী জানান, জগন্নাথপুর এডুকেশন ট্রাস্ট্রের ধারাবাহিক কার্যক্রম এবং স্বচ্ছতা দেখে বাংলাদেশ সরকার প্রস্তাবিত এডুকেশন সেন্টারের জন্য ৩ কোটি টাকা মঞ্জুরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। গত মাসে জগন্নাথপুরের এমপি এবং বাংলাদেশ সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান এক কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ করেন। ওই টাকা ইতিমধ্যে ট্রাস্টের অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে। বাকী টাকা ক্রমান্বয়ে বরাদ্দ দেয়া হবে বলে জানা মহিব চৌধুরী।  তিনি বলেন, এটি একটি যৌথ উদ্যোগের ফসল।
এডুকেশন সেন্টারের কাজে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যে বিশাল সহায়তা পাওয়া গেছে, সেজন্য সংগঠনের ট্রাস্টিরা  প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নানকে ধন্যবাদ জানান এবং তাঁর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।  
  শৃঙ্খলায় অনন্য এই সংগঠন  
এডুকেশন ট্রাস্ট গঠনের যে প্রকৃত উদ্দেশ্য সেই উদ্দেশ্যেই অটল রয়েছে জগন্নাথপুর এডুকেশন ট্রাস্ট। কার্যক্রমে স্বচ্ছতা এবং কল্যাণের লক্ষ্যে স্থির থাকার কারণে এই সংগঠনটিতে কখনো কোনো নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে দেখা দেয়নি। যুক্তরাজ্যে বিভিন্ন সংগঠনে অহরহ যেসব বিভক্তির কথা শোনা যায়, সেই দিক বিবেচনায় জগন্নাথপুর এডুকেশন ট্রাস্ট অনন্য।  
কেননা এই সংগঠন কখনো বিভক্ত হয়নি। মামলা মোকদ্দমায় জড়ায়নি। সংগঠনের কল্যাণমূলক কাজ অব্যাহত রাখার প্রশ্নে সবার মধ্যে জোর ঐক্যমত। যে কারণে একজনকে ৭ বার বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করার বিরল নজিরসহ ঐক্যমতের আরও ানেক উদাহরন রয়েছে এই সংগঠনে। মুহিব চৌধুরী বলেন, তাঁদের সংগঠনের নিয়মিত বৈঠক হয়। সলা পরামর্শ করেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রতি মাসে নির্বাহী কমিটির বৈঠক হয়। প্রতি বছর সদস্যদের যুক্ত করে হয় সাধারণ সভা (এজিএম)। আর দুই বছর পর পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।  
তিনি বলেন, এই সংগঠনের সকল কার্যক্রমে হলো নিজেদের শিকড়ে। অথ্যাৎ জগন্নাথপুরে। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত জগন্নাথপুরবাসী বাংলাদেশে ফেলে আসা নিজ এলাকার মানুষের শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করতে তুমুলভাবে উৎসাহী। তাঁরা এ ব্যাপারে বেশ সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। আর ১৫৪ জন ট্রাস্টি জনপ্রতি প্রায় দুই হাজার পাউন্ড করে দিয়ে সংগঠনের কার্যক্রমকে বহুগুন গতিশীল করে তুলেছেন।
 তিনি বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে সবাই নিজেদের শিকড়ের জন্য কাজ করছি। বাংলাদেশে আমরা সবাই দান-খয়রাত করি। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি শিক্ষার অগ্রগতির জন্য দান করা হবে সবচেয়ে বড় দান। এটা আমাদের মাতৃভূমিকে সঠিক পথে এগিয়ে নেবে।’