Share |

নিষ্ঠুরতার সীমা-পরিসীমা : সুবোধ কি পলাতকই থাকবে বাংলাদেশে?

বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের কোটা সংস্কার আন্দোলন দমাতে ক্ষমতাসীনদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের হিংস্রতা দিন দিন যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য।
এই ইস্যুতে কেবল ছাত্রলীগের হিংস্র আচরণ নিয়ে কথা বলেই শেষ করা যাবে না। ছাত্রলীগের এই চরম অসভ্য আচরণের সমর্থনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অভিভাবকরা যে ভাষায় কথা বলছেন বা আচরণ করছেন, তা যেকোন সভ্য মানুষকে বিব্রত এবং বিস্মিত করার জন্য যথেষ্ট। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসিরা সরকারের অনুগত হয়ে থাকলেও ক্ষমতাসীনদের পালিত ছাত্র সংগঠনের এসব অপরাধমূলক ও চরম সন্ত্রাসী তৎপরতাকে কি এমন নির্লজ্জভাবে প্রশ্রয় দিতে পারেন? তাদের বোধ-বিবেচনার কিছুই কি আর অবশিষ্ট নেই?
এটি সত্যিকার অর্থেই আতঙ্কের বিষয় যে, ছাত্রলীগের দৃর্বৃত্তদের রামদা, হাতুড়ি, লোহার পাইপ, বাঁশ ও লাঠির বেধড়ক আঘাতে গুরুতর আহত অবস্থায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র এবং বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক তরিকুল ইসলামকে চিকিৎসা শেষ না করেই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। চিকিৎসকরা কি তাহলে ওই দৃর্বৃত্তদের সাথে যোগ দেওয়ার অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হবেন না?
এই ঘটনাগুলো বাংলাদেশে বিরাজমান ভয়ানক পরিস্থিতির নির্দেশক। একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে যদি এভাবে সরকারের পোষা দুর্বৃত্তরা হাতুড়ি দিয়ে ঠেকাতে নামে, ডাক্তাররা গুরুতর আহত একজন মানুষকে যথাযথ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করে আর আন্দোলনের নেতাদের পুলিশ গ্রেপ্তার করতে নামে, তাহলে একটি সমাজের সর্বনাশের বাকী আর কী থাকে?
 সর্বশেষ তথ্যে জানা যায়, অসহ্য ব্যথার কারণে তরিকুলের কয়েক বন্ধু মিলে তাঁকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে গেছেন। কিন্তু নিরাপত্তার কথা ভেবে তাদেরকে হাসপাতালের নাম গোপন রাখতে হচ্ছে। সহপাঠীদের দশ-বিশ টাকা চাঁদা দিয়ে তার খরচ চলছে। এই পরিস্থিতিতে যেকোন সভ্য মানুষ বিপন্ন বোধ করবে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনে সরকারী পোষ্যবাহিনিগুলোর অপকর্মের কাহিনী এখানেই শেষ নয়। আক্রমণের শিকার আন্দোলনকারীদের সহায়তায় এগিয়ে আসা কিংবা এর প্রতিবাদে শহীদ মিনারে মানববন্ধনে যোগ দেওয়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে ন্যাক্কারজনক আচরণ ন্যূনতম বোধসম্পন্ন মানুষের মনে শুধুই ধিক্কারের জন্ম দিতে পারে। কিন্তু দেশ ও জাতির ভাগ্য নির্ধারণের দায়িত্ব আজ যাদের হাতে, তাদের দায়িত্বহীন এবং নির্বিকার মন্তব্য কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতোই মনে হয়।
প্রকৃতপক্ষে সমাজের সকল ক্ষেত্রে মানুষের এই বিবেক-বোধ বিলুপ্ত করতে করতে তলানীতে নিয়ে আসার জন্য প্রধানত দায়ী বাংলাদেশের নষ্ট-ভ্রষ্ঠ রাজনীতি।  
একটি টেলিভিশনের টক-শো’তে চোখ তুলে নেওয়ার হুমকিদাতা হিসেবে আলোচিত বর্তমান সরকারের মন্ত্রী বলছেন, ‘স্বাধীনতাবিরোধী চক্র কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে ষড়যন্ত্র করছে’। নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, রাজাকার আলবদরসহ স্বাধীনতা বিরোধীদের তালিকা তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি যারা সরকারি চাকরিতে থেকে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করছে তাদেরও তালিকা প্রণয়ন করা হবে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি সব ধরনের আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে এখন কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে নতুন করে ষড়যন্ত্র করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আখতারুজ্জামান কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের মধ্যে জঙ্গীদের ছায়া দেখছেন।
আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনীতির নামে দলীয় আনুগত্যে মোহগ্রস্ত হয়ে বাংলাদেশে নিষ্ঠুরতা সব সীমা-পরিসীমা অতিক্রম করবে আর সুবোধ কি কেবলই পালিয়ে বেড়াবে?