Share |

অধ্যক্ষ হুসন আরা আহমেদের ইন্তেকাল

লণ্ডন, ১৬ জুলাই : সিলেট মহিলা কলেজের সাবেক প্রিন্সিপাল হুসন আরা আহমেদ ইন্তেকাল করেছেন। সোমবার (১৬ জুলাই) নিউ ইয়র্ক লং আইল্যান্ডে ভোররাত স্থানীয় সময় ১টা ৪০ মিনিট তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ও ইন্নাইলাইহি রাজেউন। এসময় তাঁর সন্তান-স্বজনরা পাশে ছিলেন।
একাত্তরের শহীদ, সিলেট মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপক ডা. শামসুদ্দিন আহমেদের স্ত্রী এবং মুক্তিযোদ্ধা ও আমেরিকার স্বনামধন্য চিকিৎসক অধ্যাপক জিয়াউদ্দিন আহমেদের মাতা ছিলেন সিলেটের সবার প্রিয় প্রিন্সিপাল আপা।  
একজন শহীদের স্ত্রী এবং মুক্তিযোদ্ধার গর্বিত মাতা হিশেবে তাঁর প্রতি ছিলো সিলেটের সকল মানুষের আলাদা এক মমতামাখা শ্রদ্ধা।  সিলেটে নারী শিক্ষার প্রসারের ক্ষেত্রে কিংবদন্তীতূল্য এই বিদূষী নারী-ব্যক্তিত্বের অতুলনীয় অবদান সর্বজন সুবিদিত। নারী শিক্ষার প্রসারে ও উন্নয়নে তাঁর ব্রত শুরু হয়েছিলো ১৯৫০ সালের দিকে। তাঁর নেতৃত্বে সিলেট মহিলা কলেজ সুচনাকালীন ক্ষুদ্র অবয়ব থেকে ধীরে ধীরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করে। দীর্ঘ ৩২ বছর তিনি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠের অগ্রগমণে তাঁর মেধা, শ্রম ও স্বপ্ন বিনিয়োগ করেছেন, যার ফলে সিলেট সরকারী মহিলা কলেজ এই অঞ্চল তথা সমগ্র নারী প্রগতিতে রেখে চলেছে ধারাবাহিক অবদান।
বিদ্যায়তনিক শিক্ষার প্রসার ও মানোন্নয়নের পাশাপাশি নীতিবোধ ও মুল্যবোধের উৎকর্ষ সাধনে তাঁর অবদান অনন্য। পঞ্চাশ, ষাট ও সত্তরের দশক জুড়ে সিলেট অঞ্চলে বিভিন্ন সামাজিক-সাংগঠনিক উদ্যোগের আয়োজন ও নেতৃত্ব প্রদানে তিনি রেখেছেন বলিষ্ঠ ভুমিকা।  অধ্যক্ষ হুসন আরা আহমদের অনুপ্রেরণায় সিলেট সরকারী মহিলা কলেজে প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ’হুসন আরা আহমদ বৃত্তি ও শিক্ষক সম্মাননা’ সিলেটের কৃতবিদ্য ব্যক্তিদের স্মরণ ও সম্মানে পরিচালিত হয়ে আসছে গত ২০০৯ সাল থেকে। সিলেটের যেসব বিশিষ্টজনের নামে এই বৃত্তিপ্রদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে তাঁরা জাতির বেড়ে ওঠার বিভিন্ন কালপর্বে নিঃস্বার্থভাবে নারীর প্রগতি, শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজ উন্নয়নে অবদান রেখেছেন। পরিকল্পিত পদক ও বৃত্তিগুলো উৎসর্গ করা হয়েছে এগারোজন বিশিষ্ট ব্যাক্তির নামে, সমাজহিতৈষণায় যাঁদের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণযোগ্য। এঁরা সকলেই জন্মগ্রহন করেছেন এই এলাকায় এবং বেড়ে উঠেছেন এখানকারই মাটি-জল-হাওয়ায়। বহু উৎরাই -পেরুনো তাঁদের সমসময়ে আত্মস্বার্থে আবিষ্ট না থেকে তাঁরা বিলিয়ে দিয়েছেন নিজেদেরকে একটি স্বপ্নসম্ভব সমাজ ও সুন্দর আগামীর জন্য। কীর্তিমান এই ব্যক্তিগণ তাঁদের কৃত্য দিয়ে পথ দেখিয়েছেন পিছিয়ে থাকা নিজের সমাজকে। অধ্যক্ষ হুসন আরা আহমদ ফাউন্ডেশন প্রবর্তিত এই উদ্যোগ সমাজের সেইসব প্রচার এড়িয়ে চলা গুণীজনদের অবদান উত্তরপ্রজন্মের নিকট তুলে ধরতে সহায়ক।  
উল্লেখ্য, হুসন আরা আহমদের মাতা মিসেস মহিবুন্নেছা চৌধুরীর (১৯০৩-১৯৭১) জন্ম রক্ষণশীল একটি মুসলিম পরিবারে। স্বচেষ্টায় শিক্ষিত এই নারী স্মরণীয় শিক্ষার প্রতি তাঁর অনুরাগের জন্য। তৎকালীন রক্ষনশীল সমাজ-কাঠামোর নানাবিধ বাধার মুখে তিনি তাঁর কন্যা হুসন আরা আহমদকে উচ্চতর শিক্ষালাভের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিলেন। তাঁর সেই কন্যা হুসন আরা আহমদ পরে সিলেট অঞ্চলের বিশিষ্ট মুসলিম নারী যিনি জন্মস্থানের নারীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণে অনুপ্রেরণাদায়ী সিলেটের অন্যতম পথিকৃত হিসাবে আভির্ভূত হন।
উল্লেখ্য, তাঁর স্বামী মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবনোৎসর্গকারী শহীদ ডাঃ শামসুদ্দীন আহমদ এবং হুসন আরা আহমদ সমাজ ও মানুষের সেবায় একে অপরের পরিপূরক হয়ে কাজ করে গিয়েছেন আজীবন।