Share |

নির্মমতা : ঝরে গেলো আরেকটি সস্তা (?) প্রাণ

না, কোন সংঘর্ষ কিংবা শত্রুতার জের ধরে এই প্রাণহানি নয়। দুর্ঘটনাতেও মৃত্যু হয়নি সাইদুরের। বরং স্র্রেফ নিষ্ঠুরতাই কেড়ে নিয়েছে এই তরুণ প্রাণ।
তিনি যানজটে থেমে থাকা বাস থেকে নেমেছিলেন। যানজট কিছুটা কমায় বাস চলতে শুরু করেছে দেখে সাইদুর দৌড়ে বাসে উঠতে চান। আর তখনই পড়ে গিয়ে নাকে-মুখে আঘাত পেলে রক্তাক্ত হন তিনি। এটি নিছক একটি দুর্ঘটনা। সভ্য সমাজে এ ধরনের পরিস্থিতি কিন্তু দ্রুত চিকিৎসা দাবী করে।
কিন্তু কী দুর্ভাগ্য সাইদুরের! আর কী সস্তা বাংলাদেশের মানুষের প্রাণ! একটা বাসের হেলপার আর ড্রাইভার ধারণা করলো একজন মানুষ মারা গেছেন আর ঝামেলা বিদায় করতে পরিকল্পনা করে সেতু থেকে তাকে নদীতে ফেলে দিলো। এটি কল্পনা করাও কোন সুস্থ মানুষের পক্ষে অসম্ভব।  বিভিন্ন মিডিয়ার রিপোর্ট মতে, গত ২১ জুলাই রাতে হানিফ এন্টারপ্রাইজের একটি বাসে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়েছিলেন সাইদুর। পথে নারায়ণগঞ্জের মদনপুর এলাকায় ‘বাথরুম’ পেয়েছে বলে যানজটে থেমে থাকা বাস থেকে নেমেছিলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাইদুর রহমান পায়েল। পরে আবার বাসে উঠতে গিয়ে আহত হন। কিন্তু রক্তাক্ত একজন যাত্রীকে চিকিৎসা দেওয়ার বদলে বাসটির চালক, সুপারভাইজার ও চালকের সহকারী মিলে একটি সেতু থেকে নদীতে ফেলে দেন। আদালতে এই স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বাসের সুপারভাইজার ফয়সাল। ২৩ জুলাই মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার ভবের চরে নদীতে তাঁর লাশ পাওয়ার পর হানিফ পরিবহনের বাসচালক জালাল, সুপারভাইজার ফয়সাল ও সহকারী জনিকে আটক করে পুলিশ। 
হানিফ পরিবহনের চালক ও কর্মীরা নৃশংসভাবে সাইদুরকে খুন করেছে বলে গত ২৯ জুলাই এক মানববন্ধনে বক্তারা দাবী করেছেন। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ মানববন্ধনে হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান, দ্রুত বিচার আইনে মামলা পরিচালনা, পরিবহনশ্রমিকদের মধ্যে মানবিকতা জাগ্রত করা, হানিফ পরিবহন বর্জন এবং সাইদুরের পরিবারকে হানিফ পরিবহনের পক্ষ থেকে ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবিও জানানো হয়েছে।
আমরা জানি না, এসব দাবির কয়টি পূরণ হবে কিংবা আদৌ হবে কী না। তবে এটি নিশ্চিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণ পায়েল আর মায়ের কোলে ফিরবেন না। পৃথিবীর কোন শক্তিই এই শূন্যতা পূরণে সক্ষম নয়। 
এটি জেনে আমরা বিস্মিত যে, ঘটনার নয় দিন পার হলেও এখন পর্যন্ত হানিফ পরিবহনের পক্ষ থেকে পায়েলের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়নি। মানুষের প্রাণের প্রতি অবমাননা কতো গাঢ় হলে এই ধরণের আচরণ সম্ভব সেটি আসলেই ভেবে দেখার বিষয়।  পায়েলের সতীর্থরা মানববন্ধন করে পরিবহনশ্রমিকদের মধ্যে মানবিকতা জাগ্রত করার দাবী জানিয়েছেন। আসলে সমাজের সবার মনেই এই বোধ জাগ্রত করার কাজটি করা দরকার। কারণ, পরিবহনশ্রমিকরা তো আর অন্য গ্রহ থেকে বাংলাদেশে আসেননি। তারা এই সমাজেরই অংশ। অন্যায় কর্মকাণ্ড, দুর্নীতি আর মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার মতো গর্হিত আচরণ যখন কোন সমাজে প্রশ্রয় পায় তখন কারো কাছেই কারোর জবাবদিহিতা থাকেনা। মানুষের প্রাণের দাম তখন অন্য সবকিছুর নীচে। এই পরিস্থিতিতে আহত একজন মানুষের প্রাণ বাঁচানোর চেয়ে তাকে অবলীলায় নদীতে ফেলে দিয়ে হত্যা করতে আরো কিছু মানুষ উদ্যত হবে- এ আর আশ্চর্য কি।