Share |

সাবেক স্ত্রীর দাবি : সেনাবাহিনীর পরিকল্পনামত ইমরান ক্ষমতায়

৩০ জুলাই : একসময়ের প্লেবয় ইমরান খান পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। কিন্তু ইমরান খানের দ্বিতীয় স্ত্রী রেহাম খান প্রশ্ন তুলেছেন, তাঁর দল কীভাবে জয়ী হলো। এর পেছনে সেনাবাহিনীর হাত দেখছেন সাংবাদিক রেহাম খান। তিনি বলছেন, ইমরান খান হবেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ‘আদর্শ হাতের পুতুল’। সেনাবাহিনী যা যা বলবে, সেটা অনুসরণ করেই চলতে হবে ইমরানকে। পিটিআইয়ের প্রধানকে ক্ষমতায় বসানোর প্লট সাজানো হয় দুই বা তিন বছর আগেই।
ইমরান খানের সাবেক স্ত্রী ও সাংবাদিক রেহাম খান এখন যুক্তরাজ্য আছেন। ভারতের দ্য হিন্দুকে লন্ডন থেকে টেলিফোনে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সুহাসিনি হায়দারকে দেওয়া সেই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে রেহাম অভিযোগ করেন এবারের জালিয়াতির নির্বাচনে বেশি সুবিধা পেয়েছে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। এ  ছাড়া পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হবে, বিশেষ করে ভারতে ইস্যুতে ইমরান খানের নীতি কী হবে, দেশটির সেনাবাহিনীর ইচ্ছাই সেখানে প্রাধান্য পাবে বলেই মনে করছেন রেহাম খান।
রেহাম খানের আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়েছে এ মাসেই। রেহামের বইটি প্রকাশের আগেই পাণ্ডুলিপির কিছু অংশ অনলাইনে ফাঁস হয়ে যায়। রেহাম অনেক আগেই ইমরানের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতন, কুৎসিত যৌনাচারের অভিযোগ এনেছিলেন। বইটিতে ইমরানকে ভণ্ড, মিথ্যাবাদী, বেরোজদার, এমনকি নামাজও পড়েন না বলে উল্লেখ করেন রেহাম। তিনি অভিযোগ তোলেন, নিজ দলে বড় পদ দেওয়ার লোভ দেখিয়ে নারী কর্মীদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতেন ইমরান।
পাঁচটি আসনে ইমরান খান জয়ী হওয়া এবং নির্বাচনে পিটিআইয়ের ফলাফল সম্পর্কে রেহামের প্রতিক্রিয়া জানতে চান সুহাসিনি হায়দার। জবাবে রেহাম বলেন, ফল কী হবে তা আমি আগেই জানতাম। আমি এ-ও জানি, নির্বাচন যদি অবাধ ও সুষ্ঠু হতো, তাহলে ইমরানের জেতার কোনো সুযোগ থাকত না। খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশসহ কয়েকটি স্থানে পিটিআই এত ভালো করা অসম্ভব। কারণ, ওই সব স্থানে পিটিআইয়ের প্রাদেশিক সরকারের কোনো জনপ্রিয়তাই নেই। লাহোর ও করাচির মতো জায়গায় যা ঘটেছে, তা অবিশ্বাস্য। কারণ, এসব জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদেরা পিটিআইয়ের নতুনদের কাছে পরাজিত হয়েছেন।
ইমরান খানকে সেনাবাহিনীর প্রার্থী বলে অভিহিত করেন রেহাম খান। পাকিস্তানের ক্ষমতায় যাঁরা আসছেন, তারা সবাই কি সেনাবাহিনীর আশীর্বাদ পেয়েছেন? এর উত্তরে রেহাম খান বলেন, অবশ্যই পেয়েছেন। ২০১৩ সালের কথা মনে করে দেখুন। আপনার মনে থাকার কথা, তখন ইমরান খান বলেছিলেন নওয়াজ শরিফ হলেন সেনাবাহিনীর মদদপুষ্ট। তাই তিনি বুঝতে পেরেছেন এটা কেমন ব্যাপার। আমার মনে হয়, সেনাবাহিনী এবার তাদের ক্ষমতা দেখাতে চেয়েছে। সেটা করেছে ইমরানকে বেশি বেশি সমর্থন দিয়ে। কারণ, নওয়াজ শরিফ যখন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে চেষ্টা করে যাচ্ছেন এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের চালুর দিকে যাচ্ছিলেন, তখন সেনাবাহিনী হতাশ হয়েছে। তখনই নওয়াজ শরিফের বিদায়ের পথ তৈরি করতে থাকে সেনারা। আর এই সময়ে ইমরান হয়ে ওঠেন তাদের হাতের পুতুল। জটিল অনেক ইস্যু সম্পর্কে তার কোনো জানাশোনাই নেই এবং ইমরানকে সেনাবাহিনীর ইচ্ছা অনুসরণ করতে হবে।
নিজের লেখা বইয়ে আপনি (রেহাম) বলেছেন ইমরান সেনাবাহিনীর সৃষ্টি। কিন্তু তিনি তো ২০০৮ সালে সেনাবাহিনীর অধীনে নির্বাচন বর্জন করেছিলেন। তাহলে সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্ককে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? এর জবাবে সাংবাদিক রেহাম খান বলেন, একজন স্ত্রী হিসেবে তাঁকে দেখেছি। তাঁর কথাও শুনেছি। ইমরান সব সময় সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক থাকা নিয়ে কথা বলতেন। ২০০৮ সালে তিনি নির্বাচন বর্জন করেছিলেন বিরূপ পরিস্থিতিতে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তারা তাঁকে সমর্থন করবে না। কিন্তু যখন জানতে পারলেন, তখন তিনি সব সময়ই তাদের সমর্থনের কথা বলতেন। তিনি অনেকটাই নিশ্চিত ছিলেন যে একদিন প্রধানমন্ত্রী হবেন। আমি মনে করি, তাঁকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য এ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল দুই থেকে তিন বছর আগেই।
অনেকেই অভিযোগ করেন, আপনার বইয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অনেক এজেন্ডা আছে। আপনি কি আশা করেন, এটা নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে? রেহাম খান বলেন, হ্যাঁ। অনেকেই বলেছেন, বইটি নওয়াজ শরিফের পক্ষে আমি লিখেছি। কিন্তু কথাটি অসত্য। সাংবাদিক হিসেবে আমি নওয়াজ শরিকে প্রথমবার চিনতে পারি তার সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময়। ইমরানের বিরুদ্ধে বা তাঁর পক্ষে নির্বাচনে প্রভাবের জন্য আমি বই লিখিনি। আমি জেমিমা গো?স্মিথ হতে চাইনি। নির্বাচনে যখন জয়ী হননি, তখন আমি ইমরান খানকে বিয়ে করেছিলাম। আমি পাকিস্তানি। একজন আত্মনির্ভরশীল নারী। আমি জেমিমার মতো নয়। ইমরান যখন ব্লাসফেমি আইন নিয়ে হঠকারিতা করেন, তখন তাঁর পাশে আমি থাকতে চাইনি। পাকিস্তানে ফিরবেন কি না এবং রাজনীতিতে যোগ দেবেন কি না- এর জবাবে হাসতে হাসতে রেহাম খান বলেন, পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে আমি বাঁচতে পারি না। আমি ফিরব। তবে, এ জন্য আমার বাচ্চারা আমাকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে। কিন্তু আমি পাকিস্তানে ফিরে আসব। আর রাজনীতি নিয়ে এখনো ভাবিনি।
পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ফল অনুযায়ী, ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দল ১১৭ আসনে জয়ী হয়েছে। কারাবন্দী নওয়াজ শরিফের গড়া দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ (এন) পেয়েছে ৬৩টি আসন। আর বিলওয়াল ভুট্টো জারদারির পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) জয়ী হয়েছে ৪৩টি আসনে। এ ছাড়া মুত্তাহিদা মজলিশ আমল (এমএমএ) পেয়েছে ১১টি আসন, গ্র্যান্ড ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (জিডিএ) দুটি ও মুত্তাহিদা কওমি আন্দোলন-পাকিস্তান (এমকিউএম-পি) ছয়টি আসনে জয়ী হয়েছে।
১১তম সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান ইমরান পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের আগেই শপথ নিতে চান। ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস।