Share |

বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু এবার পেলেন পূর্ণ নাগরিকত্ব

উদয় শঙ্কর দাশ
 ‘‘২০১২ সালে ‘ফ্রেণ্ডস অফ লিবারেশন ওয়ার অনার’ সম্মাননা পাওয়া ছিল একটা বিরাট সম্মানের ব্যাপার কারণ আমি জানিনা আর কোনো দেশ এভাবে কোনোদিন ধন্যবাদ জানিয়েছে কিনা। তবে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়া আরো বেশী সম্মানের এই কারণে যে এটা অনেক বছর ধরে আমার বাংলাদেশে কাজ করার জন্য দেয়া হয়েছে। তবে আমি জানি এতোদিন ধরে যেসব সহকর্মী ও বন্ধুদের সঙ্গে কাজ করেছি তাঁরা না থাকলে আমার প্রতি কেউ নজরও দিতো না। তাই বাংলাদেশ সরকারের দেয়া এই স্বীকৃতি আমি আমার সব সহকর্মী ও বন্ধুকে উৎসর্গ করছি।’’
ব্রিটিশ নাগরিক জুলিয়ান হেনরি ফ্রান্সিস (তাঁর বাংলাদেশ নাগরিকত্ব সনদপত্রে এভাবে লেখা ছিল তাঁর পুরো নাম) আমাকে বাংলাদেশের পুরো নাগরিকত্ব লাভের পর এভাবেই তাঁর অনুভূতি জানিয়েছিলেন। গত ২৩ জুলাই ২০১২ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে একটি অনুষ্ঠানে এই সনদপত্র তুলে দেন জুলিয়ান ফ্রান্সিসের হাতে। জুলিয়ান ফ্রান্সিস হলেন সপ্তম বিদেশী যাকে বাংলাদেশের পূর্ণ নাগরিকত্ব দেয়া হলো। সেই অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাজ্যের সংসদ সদস্য রুশানারা আলী।
১৯৮০‘র দশকে প্রথম বাংলাদেশে কাজ করতে আসার পর  জুলিয়ান বাংলাদেশকে তাঁর দেশ হিসাবে গ্রহণ করেন মনেপ্রাণে। কানাডার একটি সংস্থার জন্য কাজ শেষ করে যুক্তরাজ্যে ফিরে আসার পর তিনি আবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন ১৯৯৮ সালে এবং এর পর থেকে বাংলাদেশেই বসবাস করছেন।
তিনি প্রথমে কাজ করেন আন্তর্জাতিক রেডক্রসের জন্য। এরপর ছয় বছর তিনি ‘আদর্শ গ্রাম’ নামে বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রকল্পে কাজ করেন। ২০০৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ডিএফআইডি’র ইউকেএইড এবং অস্ট্রেলিয়ার একটি সংস্থার অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকারের আরেকটি প্রকল্প ‘র্চস্ লাইভলিহুড প্রোগ্রাম’ এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।  
বাংলাদেশের প্রতি তাঁর অনুরাগ ১৯৭১ সাল থেকে, যখন তিনি বাংলাদেশ থেকে ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী শরণার্থীদের জন্য যুক্তরাজ্যভিত্তিক দাতব্য প্রতিষ্ঠান অক্সফ্যাম পরিচালিত ত্রাণ তৎপরতার প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। জুলিয়ান তখন বিহারে অক্সফ্যামের একটি প্রকল্পে কাজ করতেন। সেসময় শুরু হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। জুলিয়ান বিহারে বসেই বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের অংশবিশেষ শুনছিলেন বিবিসি’তে।  অক্সফ্যাম কলকাতায় তাদের ত্রাণ তৎপরতার সমন্বয় অফিস স্থাপন করে এবং সেখানেই এই তরুণ ইংরেজের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। তাঁকে দেখেছি দিনরাত শরণার্থীদের সাহায্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে। কলকাতার রাস্তায় একদিন হঠাৎ করে আমার স্কুলের (চট্টগ্রামের সেন্ট প্লাসিডস স্কুল ) প্রাক্তন প্রিন্সিপাল ব্রাদার রেমন্ডের সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যায়। তিনি আমাকে কেনিলওয়ার্থ হোটেলে নিয়ে যান, যেখানে ছিল অক্সফ্যামের ত্রাণ সমন্বয় অফিস। আমাকে জুলিয়ানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার পর ব্রাদার রেম- বললেন, আমি যেনো পর দিন থেকেই অক্সফ্যামের জন্য কাজ শুরু করি। মাসখানেক পর জুলিয়ান আমাকে অফিসে ডেকে আরো একটি বড় দায়িত্ব দিলেন। সেটা ছিল, পশ্চিমবঙ্গে অক্সফ্যাম পরিচালিত ত্রাণ শিবিরে গিয়ে সেগুলোর কাজ পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করা এবং সপ্তাহে একদিন অফিসে বসে শিবিরগুলোর কাজকর্ম নিয়ে প্রতিবেদন লেখা যেগুলো অক্সফোর্ডে অক্সফ্যামের সদরদপ্তরে পাঠানো হতো। জুলিয়ান সেই প্রতিবেদনগুলো দেখতেন এবং মাঝে মাঝে কিছু রদবদলও করতেন। তবে তাঁর সন্তুষ্টির একটি ছাপ আমি দেখতাম। আর নিজে শরণার্থী হয়ে এই কাজটাকে আমি বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়েছিলাম। জুলিয়ান ছিলেন আমার প্রণোদক ও অনুপ্রেরণাকারী।
দাতব্য এবং উন্নয়ন কাজে জুলিয়ানের উৎসাহ ছোটবেলা থেকে। ইংল্যান্ডের একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা উইলিয়াম ফ্রান্সিস ১৯৭০ সালে পেয়েছিলেন সিবিই খেতাব। জুলিয়ানের মা উরসুলা তাঁর জীবনে বড় প্রভাব ফেলেন - এ কথা তিনি সবসময় স্বীকার করেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর বৃটেনে বড় হয়ে ওঠেন জুলিয়ান। তিনি দেখেন তাঁর মা অক্সফ্যামের ত্রাণ তৎপরতায় সাহায্যের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতেন। জুলিয়ান ও তাঁর বন্ধুরা ছোটবেলায় প্রতিবেশীদের গাড়ি ধুয়ে যে অর্থ পেতেন, তা দাতব্য কাজে দান করতেন।  
জুলিয়ান ফ্রান্সিসের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগ বলা যেতে পারে তাঁর পরিবার-সূত্রে। তাঁর পূর্বপুরুষদের একজন হেনরি জেইমস ম্যাথিউ ভারতের বিভিন্ন সেনানিবাসে পাদ্রি হিসাবে নিয়োজিত ছিলেন এবং তাঁর সর্বশেষ নিয়োগ ছিল লাহোরের বিশপ হিসাবে (১৮৯০ এর দশকে)। আরেকজন ১৯২০ এবং ১৯৩০ এর দশকে বর্মায় ব্যবসা করতেন।  
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অক্সফ্যামের একটি বড় অবদান ছিল শরণার্থীদের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে প্রকাশিত দলিল ‘‘টেস্টিমনি অফ সিক্সটি অন ক্রাইসিস ইন বেঙ্গল’’। এই দলিল প্রকাশের এক সপ্তাহ পর ২৮ অক্টোবর ১৯৭১ এ সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি মার্কিন সিনেটে তা উপস্থাপন করেন এবং এই দলিল কংগ্রেশনাল রেকর্ডে প্রকাশিত হয়। এই দলিলের বিভিন্ন লেখা সংগ্রহে জুলিয়ান একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং তাতে তাঁর একটি লেখাও ছিল।
নিজ পরিবারেও জুলিয়ানের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শরণার্থীদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কর্মসূচী শেষে দেশে ফেরার আগে জুলিয়ানকে বিদায় জানাতে গিয়েছিলাম। ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম তাঁর সাহায্য ও অনুপ্রেরণার জন্য। কথায় কথায় বলেছিলাম, পড়াশুনার জন্য আমার যুক্তরাজ্যে যাবার আগ্রহের কথা। জুলিয়ান আমাকে সর্বাত্মক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তবে একটি শর্তে। সেটা ছিল ১৯৭২ এর মে মাসে কলকাতায় তাঁর বিয়েতে আমাকে উপস্থিত থাকতে হবে। জুলিয়ান যখন অক্সফ্যামের হয়ে গয়াতে কাজ করতেন, তখন তাঁর স্ত্রী সুস্মিতার সঙ্গে পরিচয়। জুলিয়ানের শ্বশুরের পূর্বসূরিদের বাড়ি ছিল বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জে কামারখাড়ায়। জুলিয়ানের বিয়েতে আমি গিয়েছিলাম, তাঁর স্ত্রীকে সুস্মিতা বৌদি সম্বোধন করায় খুব খুশি হয়েছিলেন। জুলিয়ানের দুই ছেলে নীল ও রোহিন। ছোট ছেলে রোহিন একজন কার্ডিওলজিস্ট, লন্ডনে থাকেন। বাবার মতোই এক বাঙালী মেয়েকেই বিয়ে করেছেন।
জুলিয়ান ফ্রান্সিস সত্যিই একজন অসাধারন ব্যক্তি। তাঁকে আমাদের অনেকের চাইতে বেশী বাংলাদেশী বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। বাংলাদেশকে নিজের দেশ হিসাবে গ্রহণ করেছেন এবং সেই দেশের লোকের জন্য কাজ করাই তাঁর জীবনের ব্রত। তাঁর আমায়িক আচরণের কারণে বাংলাদেশে তাঁর বন্ধুর সংখ্যা প্রচুর। তাঁর বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রাপ্তিতে তাঁরা খুবই উল্লাসিত এবং নিশ্চিত যে জুলিয়ান ফ্রান্সিস বাংলাদেশে তাঁর দিনগুলো কাটাবেন যাদের তিনি এতো ভালোবাসেন, তাঁদের কল্যাণে।
আমরা জুলিয়ান ফ্রান্সিসের সুস্বাস্থ্য এবং বাংলাদেশে তাঁর সব কর্মকাণ্ডে সাফল্য ও পরিপূর্ণতা কামনা করি।  লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও ক্রীড়া বিশ্লেষক।
লণ্ডন, ৩০ জুলাই ২০১৮