Share |

বাস্তবতা আড়াল করতে মরিয়া সরকার : ইন্টারন্টে সৌা, সাংবাদিকদের মারধর

০৫ আগস্ট: ক্যামেরা দেখলেই তেড়ে আসছিলেন তাঁরা। তাঁদের মাথায় হেলমেট আর হাতে লাঠিসোঁটা, রড। কারও হাতে রামদা-কিরিচের মতো ধারালো দেশীয় অস্ত্র। পুলিশের সঙ্গে সঙ্গে সহযোগী হিসেবে চলছিল এ যুবকের দল। নিরাপদ সড়কের দাবিতে মাঠে নামা শিক্ষার্থীদের ধরে ধরে পেটাচ্ছিলেন তাঁরা। রাজধানীর ধানমন্ডিতে এ রকম পরিস্থিতির মধ্যে তথ্য সংগ্রহ করার সময় অন্তত পাঁচজন সাংবাদিককে মারধর করেছেন ওই যুবকেরা।
আর রোববার বেলা ২টার দিকে ধানমন্ডির ১ নম্বর সড়কে (সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়) লাঠিসোঁটা হাতে যুবকদের হাতে মারধরের শিকার হন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। এ সময় প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আহমেদ দীপ্ত। দীপ্ত জানান, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ছিলেন ধানমন্ডির ১ নম্বর সড়কে। সেখানে তিনিসহ কয়েকজন সংবাদকর্মী দাঁড়িয়েছিলেন। এ সময় ঢাকা কলেজের দিক থেকে লাঠিসোঁটা হাতে আসা ছাত্রলীগের একটি মিছিল শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করে। ধাওয়ায় সেখানে কর্মরত সংবাদকর্মীরা দৌড় দিলে হামলাকারীদের একজন তাঁর পায়ে রড দিয়ে আঘাত করলে তিনি পড়ে যান। এরপর ২০-২৫ জন মিলে লাঠিসোঁটা ও রড নিয়ে ব্যাপক মারধর করেন তাঁকে। মারের কারণে দীপ্তর মাথার হেলমেট ভেঙে যায়। মাথা বাঁচাতে গিয়ে হাতে আঘাত পান দীপ্ত। তাঁর পুরো শরীরে কালশিটে রক্তাক্ত দাগ।
সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকাতেই আরও মারধরের শিকার হন এসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) ফটো সাংবাদিক এ এম আহাদ, দৈনিক ‘বণিক বার্তা’র পলাশ শিকদার ও ফ্রিল্যান্স ফটোসাংবাদিক রাহাত করিম। আহত সাংবাদিকদের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছ। হামলাকারীরা রাহাতের ক্যামেরা ছিনিয়ে নেন। রড, লাঠি দিয়ে মারধর করে তাঁকে রক্তাক্ত করা হয়। লাঠিসোঁটা হাতের যুবকদের মধ্যে মহানগর উত্তরের ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ছিলেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। 
ইন্টারনেট সৌা : শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ঠেকাতে মারমুখি অবস্থান নিয়েছে সরকার। পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা একযোগে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। আর এই হামলার খবর গোপন করতেই দেশে ইন্টারনেট সেবা ধীরগতির (সৌা) করে দিয়েছে সরকার। অনেকটা প্রকাশ্যে সরকারের মন্ত্রীরা এ কথা স্বীকার করেছেন। সরকারের পক্ষ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার জন্য ফেসবুককে দায়ী করা হয়েছে। যে কারণে আন্দোলন থামাতে সরকার একদিকে বিক্ষোভকারীদের ওপর এলোপাতাড়ি হামলা চালাচ্ছে, অন্যদিকে এসব হামলার খবর গোপন রাখতে ইন্টারনেট সেবা সৌা করে দিয়েছে সরকার।  
নারী সংবাদকর্মীকে হেনস্থা : ৬ আগস্ট সেমবার রামপুরার আফতাবনগরে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের কর্মীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এবং সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহের সময় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ কর্মীরা প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক নাসরিন আকতারকে হেনস্তা করেছেন। এ সময় পুলিশের কয়েকজন নারী সদস্য নাসরিনকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন।
বেলা একটার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে ঘটনার সংবাদ সংগ্রহের কাজ করছিলেন নাসরিন। এ সময় পাঁচ-ছয়জন লোক এসে তাঁর কাছে জানতে চান, তিনি সেখানে কী করছেন। নাসরিন নিজেকে সংবাদকর্মী ও প্রতিষ্ঠানের নাম বললে ওই ব্যক্তিরা তাঁর কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেন। তাঁরা নাসরিনকে ধাক্কা দিয়ে ওই স্থান থেকে সরিয়ে দেন। 
এ সময় পুলিশের সদস্যরা নাসরিনকে শিক্ষার্থী হিসেবে চি?িত করে নারী পুলিশ ডেকে নিয়ে আসেন। পরিচয় দেওয়ার পরও পুলিশের একজন সহকারী কমিশনারের (এসি) নেতৃত্বে তাঁকে বাড্ডা পুলিশ ফাঁড়ির ভেতরে নেওয়া হয়। ফাঁড়ির ভেতরে নাসরিন আকতারকে হেনচ্চা করেন পুলিশের নারী সদস্যরা। তাঁরা তাঁকে বলেন, ‘এখানে কী করতে আসছিস? চুরি করতে আসছিস?’ এরপর তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। পুলিশ সদস্যরা নাসরিনের ব্যাগ তল্লাশি করেন।
গালিগালাজ ও হেনচ্চা করার ১৫ মিনিট পর নাসরিন আকতারকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ সময় বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক পুলিশ কনস্টেবল নাসরিনের মুঠোফোনটিও ফেরত দেন।
এ বিষয়ে বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে গুলশানের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (বাড্ডা) মনতাজুল আহসান হুমায়ুন কবীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঝামেলায় আছি, একটু পরে ফোন দেন।’