Share |

প্রবাস জীবনে ভিসাই সবকিছু

ইংল্যান্ডে অভিবাসন (ইমিগ্রেশন) আইনজীবী হিসেবে কাজ করা কতটা চ্যালেঞ্জিং তা হয়তো অনেকেই অনুভব করতে পারেন না। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ইংল্যান্ডে অভিবাসন বিষয়ক আইনজীবী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে অনেক বিচিত্র ও মর্মপীড়াদায়ক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। বুঝেছি প্রবাসজীবনে ভিসাই মানুষের সবকিছু। এমন কিছু বিরল ঘটনা ঘটে যা শুধু একজনের নয়; বরং তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুরো পরিবারের জন্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। দীর্ঘ অপেক্ষা আর নানা সংগ্রামের পর আদালতে ভিসাপ্রাপ্তির লড়াইয়ে সফল হলে পুরো পরিবার খুঁজে পায় স্বপ্নের নতুন বাস্তবতা। আর যদি ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয় পুরো পরিবারইই ডুবে যায় দুঃস্বপ্নের অতল গহিনে।
আইন পেশার কঠিন গোপনীয়তা রক্ষার খাতিরে আমরা যারা ইংল্যান্ডে প্র্যাকটিস করছি, ইচ্ছা থাকলেও অনেক বড় বড় সফল মামলার কৃতিত্ব প্রকাশ করার সুযোগ তেমন নেই। তবে কিছু কিছু মামলার আবেগ সৃষ্টিকারী কাহিনি আছে। সেগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষগুলোর নাম পরিচয় প্রকাশ না করেও দু-একটা মামলার চিত্র তুলে ধরে, আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে বাধা নেই। তেমনি একটি কাহিনি সংক্ষিপ্ত করে বলছি, যা আপনাদের ভালো লাগতে পারে।  
বেশ কিছুদিন আগের ঘটনা। লন্ডনের একটি ইমিগ্রেশন-অ্যাসাইলাম ট্রাইব্যুনালে একটা আপিল মামলার শুনানি ছিল। বেশ কঠোর হিসেবে পরিচিত একজন নারী অভিবাসন বিচারকের সামনে শুনানি করতে হবে। তিনি সহজে আপিল মেনে নেন না; বরং নিয়মিত ডিসমিস করে দেন। এই বিচারকের সামনে গেলাম ভীষণ একটা অনিশ্চয়তার ঝুঁকি নিয়ে । সাধারণত কোন বিচারকের সামনে একজন মক্কেলের আপিল মামলার শুনানি হবে তা জানা যায় মামলার দিন সকালে। বিচারক পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুতর কারণ ছাড়া সম্ভব নয়। কোনো কারণ দেখিয়ে শুনানির দিন পরিবর্তনের সুযোগও সীমিত। মক্কেল ও হোম সেক্রেটারি বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (অভিবাসনবিষয়ক মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ হোম সেক্রেটারি)চ্চউভয় পক্ষকে আপিলের সঙ্গে সম্পৃক্ত কাগজপত্র শুনানির কয়েক দিন আগেই আদালত ও সব পক্ষকে পাঠিয়ে দিতে হয়। আদালতে শুনানির দিনে নতুন প্রমাণপত্র উপস্থাপন করে অপরপক্ষকে চমক দেখানোর সুযোগ নেই। মামলার ব্যাকগ্রাউন্ড ও সাক্ষীর সংখ্যার ওপর শুনানি ৩০ মিনিট থেকে ৫ দিনও চলতে পারে। অ্যাসাইলাম আইনের ওপর আমার একটা মামলা তিন দিন চলেছিল। সেই দিনের মামলার শুনানি শেষ হওয়ার আগের মুহূর্তে যা ঘটে গেল তা এবং সেদিনকার অনুভূতির কিছুটা শেয়ার করার জন্যই এত কিছু বলে ফেলা।  
আপিল মামলাটি ছিল সুন্দর ছোট্ট একটা পরিবারের অভিবাসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে। যার সঙ্গে যুক্ত তাদের দুই তরুণী মেয়ের (অনেকটা কিশোরী বলা চলে) পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ। মেয়ে দুটো অত্যন্ত মেধাবী। তাদের বাবা শিক্ষার্থী ভিসায় ইংল্যান্ডে আসেন প্রায় নয় বছর আগে। সঙ্গে মা ও দুই মেয়ে। কয়েকবার ভিসা মেয়াদ বাড়ানো হলেও বাবার কিছু ভুলের কারণে শেষবার ভিসা প্রত্যাখ্যান হয় সপরিবারে। এতে তাদের জীবনে নেমে আসে বিরাট অনিশ্চয়তা। কাজ করার অনুমতি হারান বাবা। এর মধ্যে দুই কন্যার ইংল্যান্ডে থাকার সময়কাল সাত বছর পূর্ণ হয়েছে। প্রসঙ্গত, ব্রিটিশ অভিবাসন আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো ছেলেমেয়ে সাত বছর যুক্তরাজ্যে বসবাস করলে তারা স্থায়ী হওয়ার অনুমতি পায়। সেই সুবাদে তাদের বাবা-মাকেও ব্রিটেনে থাকার অনুমতি দেওয়ার বিধান আছে। তবে তা অতটা সহজ নয়। কারণ এর জন্য বেশ বড় অঙ্কের সরকারি ফি দিয়ে আবেদন করতে হয়। মাথাপিছু ফি ১ হাজার ৫৩৩ পাউন্ড। কিছু বিরল পরিস্থিতে ফি মওকুফের বিধান আছে। আরও কিছু শর্ত পূরণ করতে হয় যা মোটামুটি কঠিন। এসব আবেদনের অনেকগুলো প্রত্যাখ্যান হয়। পরে বাধ্য হয়ে আবেদনকারীকে আদালতে আপিল করতে হয়। এ আপিলও সহজ কিছু নয়। জিততে হলে উপযুক্ত কারণ থাকার পাশাপাশি খুব ভালোভাবে প্রচ্চুতি নিতে হয়। কারণ আদালত কক্ষে যুক্তিতে হোম অফিসের আইনজীবীকে হারাতে পারলেই মিলবে ভিসা। বর্ণিত এই পরিস্থিতির সবকিছুই ঘটে এই পরিবারটির ক্ষেত্রে।  
সব ধাপ পেরিয়ে নির্ধারিত দিনে তাদের নিয়ে এলাম ট্রাইব্যুনালের শুনানিতে। সকাল ৯টায় ট্রাইব্যুনাল রিসেপশনে ওই দিন প্রথম সাক্ষাতে দেখলাম, বাবা-মা ও দুই মেয়ে কারও মুখে হাসি নেই। নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন বোঝা যায়। তবে, সবাইকে বেশ স্মার্ট লাগছিল। আমি তাদের পক্ষে যে কাগজপত্র দাখিল করি তার মধ্যে ছিল, আদালতকে উদ্দেশ্য করে বড় মেয়ের কলেজের অধ্যক্ষের হৃদয়গ্রাহী এক চিঠি। যাতে তিনি এই ছাত্রীটিকে এ লেভেলের ‘বেষ্ট অলরাউন্ডার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং আগামী বছর এই ছাত্রী ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডে ব্যাচেলর ডিগ্রিতে ভর্তি হবে বলে বিশাল আশাবাদ দেন তিনি। অন্য মেয়েটির ব্যাপারেও তার কলেজ অধ্যক্ষের প্রায় এই ধরনের একটা চিঠি ছিল।  
যথারীতি শুনানি শুরু হলো। বড় মেয়েটির খুব ভালো আবেগময় সাক্ষ্য নিলাম। সাফল্যের ব্যাপারে বেশ আশাবাদী বলে মনে হলো নিজেকে। এরপর বাবার সাক্ষ্য ছিল হতাশাজনক। বিচারক তাঁর ওপর বেশ বিরূপ ভাব দেখালেন। মনটা ভেঙে গেল। মনে হচ্ছিল উচ্চ আদালতে যেতে হবে। আফসোস করছিলাম এমন একটা ভালো আপিল মামলার কঠিন অবস্থা দেখে। মনে মনে বলছিলাম, ছাড়ব না. এই মামলায় শেষ পর্যন্ত ওপরে গিয়ে জিতে আসব। তবে আমার সাবমিশনটি খুব ধারালো করব ঠিক করলাম। মেয়ের সাক্ষ্য দেওয়ার সময় নিয়ম অনুযায়ী বাবা-মা বাইরে ছিলেন। তবে বাবার সাক্ষ্য দেওয়ার সময় বড় ও ছোটচ্চদুই মেয়েই আদালত কক্ষে পেছনে বসে শুনছিল। আর বড় মেয়েটি ছিল ভীষণভাবে নার্ভাস। তাকিয়ে দেখি তার দুই চোখ বেয়ে অনবরত অশ্রুধারা। অপর মেয়েটাও অঝোরে কাঁদছিল চুপচাপ।  
যুক্তরাজ্যে তাঁদের ভবিষ্যৎ, পড়াশোনা, সহপাঠীদের ছেড়ে যাওয়ার কথা কল্পনা করেই হয়তো তারা ব্যাকুল। অনেক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পরে সুযোগ পেয়ে কয়েক বছর এখানকার গ্রামার স্কুলে পড়ালেখা করছে। দেশেই যদি চলে যেতে হয়, সেখানে কী ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজ পাবে? নয় বছরে তারা অনেক বন্ধু বান্ধব বানিয়েছে, সবাইকে কী ছেড়ে যেতে হবে?
 ইংল্যান্ডে তাদের এলাকার স্থানীয় সংবাদপত্রে তাদের প্রতিভা নিয়ে অনেক প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। বিদ্যালয় ও কলেজে প্রশংসাও পেয়েছে শিক্ষকদের। সবাই তাদের নিয়ে গর্বিত। একটা স্থানীয় সংবাদপত্র বড় মেয়েটিকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ এমপি বলে মন্তব্য করেছে। কারণ সে পড়াশোনার পাশাপাশি অনেক কমিউনিটি কাজের সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় এমপির সঙ্গে কাজ করেছে। এতসব অর্জন কী ধুলায় মিশে যাবে? ইমিগ্রেশন আইন নামক এই দানবটি কী তাদের সুন্দর স্বপ্ন চুরমার করে দেবে। কী অপরাধ এই দুই মেয়ের? বাবা মার ভুলের কারণে ইমিগ্রেশন আইনের আওতায় অবৈধ হয়ে গেল আর তাই এখানে থেকে উচ্চ শিক্ষার সুযোগটি হারাবে?
আইনজীবী হিসেবে মক্কেলদের জীবনের আবেগ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে হয়। কিন্তু যেখানে সারা জীবন শিশু-কিশোরদের শিক্ষার অধিকারকে অলঙ্ঘনীয় মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতির জন্য সংগ্রাম করেছি, সেখানে ওই দুই কিশোরীর কান্না কেন আমাকে বিচলিত করবে না? আমার প্রতিপক্ষ সরকারি তরুণী আইনজীবী কিছুটা মনে হয়ে আঁচ করতে পেরেছিলেন ওই মুহূর্তে আমার চেহারার দিকে তাকিয়ে। তাঁর দায়িত্ব সরকারি সিদ্ধান্তটা আইনসিদ্ধ ও বৈধ বলে আপিলকে ঠেকানো।
বাবার পর মাকে শেষ সাক্ষী হিসেবে ডাকলাম। তাঁর সাক্ষ্য শুরুর একটু পরেই কঠোর বলে পরিচিত এই বিচারক মনে হয় আর নিজেকে শক্ত করে রাখতে পারছিলেন না। ঘন ঘন তাঁর বিপরীতে আদালতের পেছনে চেয়ারে বসা ক্রন্দনরত দুই মেয়ের দিকে তাকাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে হঠাৎ করে আমাকে ও সরকারি আইনজীবীকে উদ্দেশ করে আবেগজড়িত কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘আমি এই পরিবারটিকে আর টর্চার করতে চাই না, অনেক হয়েছে আর না, এটি এমন একটি মামলা যেখানে হোম সেক্রেটারি অত্যন্ত অন্যায় করেছেন, এই দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি। এরা ব্রিটিশ সমাজে সর্বাত্মকভাবে একীভূত (ইন্টিগ্রেটেড)। তাদের ব্রিটেন থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। আর তাই আপিলটি মেনে নেওয়া (অ্যালাউ করে) হলো।’
 এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আদালত কক্ষে একটি আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়ে গেল। পুরো পরিবারটি একে অপরকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে আনন্দের কান্না করলেন। মনে হলো তাদের ওপর থেকে বিশাল একটা ঘন কালো মেঘ সরে গেল। এ যেন অনেক সংগ্রামের কাঙ্ক্ষিত বিজয়ের আনন্দ। আমি সৃষ্টিকর্তার প্রতি অনেক কৃতজ্ঞতা জানাতে থাকলাম মনে মনে।
এখন তারা জানেন, তাদের ভবিষ্যৎ এখানেই। এই ইংল্যান্ডেই যেভাবে স্বপ্ন ছিল সেভাবেই গড়াবে। পরিবারের সবাইকে আনন্দের কান্না করতে দেখে বিচারক ও সরকারি আইনজীবীটিও আবেগাপ্লুত হয়ে গেলেন। এই প্রথম দেখলাম একজন অভিবাসন বিষয়ক বিচারক তাঁর নিজের চোখের পানি সংবরণ করতে পারছিলেন না।
শুনানি শেষ, আমার এবার বিদায়ের পালা। সেদিন আমার মক্কেল পরিবারটি অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানালেন আমাকে তাদের দীর্ঘদিনের আইনজীবী হিসেবে।
সাধারণত ইমিগ্রেশন আপিল মামলার শুনানির শেষে বিচারক কয়েক দিন পরে রায় দেন। তবে মাঝেমধ্যে কিছু কিছু মামলায় একই দিনে ফলাফল বলে দেন। ওপরের ঘটনাটি বলতে গিয়ে, গোপনীয়তার খাতিরে মক্কেলদের পরিচয়, লোকেশন, কান্ট্রি অব অরিজিন বা এথনিসিটি প্রকাশ করিনি। সাত বছর যুক্তরাজ্যে অবস্থানের পর অর্জিত অধিকার বিষয়ে অনেক মামলা আমরা প্রতিনিয়ত করছি। সফলও হচ্ছি। তবে এই পরিবারটির ঘটনা একেবারে বিরল, যা আদালতে উপস্থিত সকলের হৃদয়কে স্পর্শ করে।
 ভিসা আবেদনের সিদ্ধান্ত প্রবাসজীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যা ওই পরিবারটির ঘটনা থেকে স্পষ্ট। আর হ্যাঁ, ওই বিষয়ে আমার মক্কেলদের জয়ী হওয়ার পরে হোম অফিস আর উচ্চ আদালতে যায়নি। পরিবারটি ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি পেয়ে গেছে। বাবা-মা দুজনই ভালো চাকরি করেছেন। আর দুই মেয়ে খুব নিশ্চিন্ত মনে তাদের পড়ালেখার পাশাপাশি গানবাজনা, খেলাধুলা ও সাহিত্যকর্মসহ নানা কিছু চালিয়ে যাচ্ছে। এদের অভিবাসন সমস্যার সুরাহা হওয়ায় বাংলাদেশে তাদের পরিবার-পরিজনেরও নাকি স্বস্তি মিলেছে।  
 লেখক : ব্যারিস্টার, অভিবাসন আইনজীবী যুক্তরাজ্য।