Share |

আরিফই সিলেটের মেয়র

সিলেট, ১৩ আগস্ট : কাউন্সিলরদের মধ্যে সংঘর্ষ-গুলি, মেয়র পদে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে ভোটকেন্দ্র দখলের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ মিলে উত্তেজনার সব অনুষঙ্গই ছিল সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। কিন্তু দুটি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত হওয়ায় সেদিন মেয়র পদে কাউকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়নি। ৩০ জুলাইয়ে ওই নির্বাচনে ১৩৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৩২টিতে ভোটের হিসাবে এগিয়ে ছিলেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী  আরিফুল হক চৌধুরী। গাণিতিক হিসাবে শেষ দুটি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষীণ একটা সুযোগ ছিল, যদিও বাস্তবে তা ছিল প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। বরং প্রচারের শুরু থেকে নির্বাচনে ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা প্রকাশ করে যাওয়া আরিফুল হক চৌধুরীর বিজয়ী হওয়া ছিল প্রায় নিশ্চিত। শেষ পর্যন্ত অপেক্ষার প্রহর পেরিয়ে গত শনিবার (১১ আগস্ট) আরিফুলই সিলেটের মেয়র কামরানের হারে লাভ দেখছে আ.লীগ!
সিলেট, ১২ আগস্ট : সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় মেয়রপ্রার্থী হারবেন-এমনটা ভাবেননি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। আবার বরিশালে হঠাৎ করেই বিএনপির প্রার্থী কোনো প্রতিরোধ ছাড়া হাল ছেড়ে দেবেন, তাও ভাবেনি শাসক দল। তবে সিলেটে দলীয় প্রার্থী হারায় লাভই দেখছেন তাঁরা। অন্যদিকে, বরিশালে বিএনপির প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করার আগে চার ঘণ্টায় মাত্র ১৩ হাজার ভোট পাবেন-এমনটাও ভাবেননি তাঁরা।
শাসক দলের সভাপতিমণ্ডলীর দুই সদস্য, একজন যুগ্ম সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক এবং দুই সিটি  পদে নির্বাচিত হয়েছেন।
এ নিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো সিলেটের নগরপিতা হলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আরিফুল। তিনি মোট ছয় হাজার ১৯৬ ভোটের ব্যবধানে কামরানকে পরাজিত করেন। মেয়রের চেয়ার পুনরুদ্ধারের জন্য কামরানকে স্থগিত দুটি কেন্দ্রের মোট চার হাজার ৭৮৭টির মধ্যে চার হাজার ৭০৭টি ভোট পেতে হতো। স্থগিত দুটি কেন্দ্র মিলে আরিফুল পেয়েছেন দুই হাজার ৯২ ভোট। অন্যদিকে কামরান পেয়েছেন মাত্র ৫২২ ভোট। ফলে ধানের শীষ প্রতীকে আরিফুল মোট ৯২ হাজার ৫৮৮ ভোট পেয়ে সিলেটের মেয়র হয়েছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নৌকা প্রতীক নিয়ে কামরান পেয়েছেন ৮৬ হাজার ৩৯২ ভোট।
আরিফুল হক চৌধুরী তার বিজয় সিলেটবাসীকে উৎসর্গ করেছেন। বিজয়ী ঘোষণার পর শনিবার রাতে এক বিবৃতিতে তিনি সিলেটের সর্বস্তরের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেছেন, সমগ্র দেশের মধ্যে সিলেটের মানুষ যে ব্যতিক্রম ও অনন্য, তা আজ আবার প্রমাণিত হলো। আজকের ঐতিহাসিক বিজয় সিলেটের জনগণের বিজয়। আজকের এই বিজয় গণতন্ত্রের বিজয়।
আরিফুল বলেন, ’এবারের নির্বাচনে সিলেটবাসী আমার প্রতি যে অভূতপূর্ব সমর্থন জানিয়েছেন, তা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। আজ আমার জীবন ধন্য। উন্নয়নকামী সম্মানিত সিলেটবাসীকে আমি আমার বিজয় উৎসর্গ করলাম। সিলেটবাসীর এ ভালোবাসা, এই সমর্থন আমার দায়িত্ববোধকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সবার সহযোগিতা নিয়ে সিলেটকে একটি পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে আমি আবারও অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি।’
অন্যদিকে, কামরান পরাজয় মেনে নিয়েছেন। শনিবার তিনি বিজয়ী প্রার্থীকে শুভেচ্ছা জানান। এ ছাড়া পৃথক বিবৃতিতে তিনি সংশ্নিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান।
সকালে টানা বর্ষণের মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে শনিবার সিলেটে ১৬ কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। তার মধ্যে স্থগিত দুটি কেন্দ্রে মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে নির্বাচন হয়। বাকি ১৪টি কেন্দ্রে নগরীর সংরক্ষিত ৭ নম্বর ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর পদে শুধু ভোট গ্রহণ করা হয়। দিনভর শান্তিপূর্ণভাবেই ভোট গ্রহণ হয়েছে। আরিফুল দাবি করেছেন, গত ৩০ জুলাই এভাবে নির্বাচন হলে তিনি আরও বড় ব্যবধানে বিজয়ী হতেন।
গত ৩০ জুলাই নির্বাচনে ১৩২ কেন্দ্রে চার হাজার ৬২৬ ভোটে এগিয়ে ছিলেন আরিফুল। দুটি কেন্দ্র ছাড়া আরিফুল হক চৌধুরী ৯০ হাজার ৪৯৬ ভোট পেয়েছিলেন। অন্যদিকে কামরান পেয়েছিলেন ৮৫ হাজার ৮৭০ ভোট। শনিবারের চূড়ান্ত ফলে কামরানের সঙ্গে তার ভোটের ব্যবধান আরও বেড়েছে। শনিবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় সিলেট সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার মো. আলীমুজ্জামান আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করেন। ২০১৩ সালের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত আগের নির্বাচনে আরিফুল ৩৫ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে কামরানকে পরাজিত করেছিলেন। সিলেটে এবার প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত মেয়র নির্বাচনে জয়ের ধারা অব্যাহত রাখলেন আরিফুল।
গত ৩০ জুলাই প্রাথমিক ফলে এগিয়ে থাকার পরদিন কামরানের বাসায় সপরিবারে গিয়েছিলেন আরিফুল। প্রকাশ্যে তাদের মধ্যে সৌহার্দ্য বিরাজ করলেও নির্বাচনে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেছেন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাজধানীতে গিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে স্থগিত দুটি কেন্দ্রের মৃত ও প্রবাসী ভোটারদের ভোট ঠেকানোর অনুরোধ করেন আরিফুল।
সরেজমিনে ভোটের চিত্র: সুরমা নদীর এক তীরে হবিনন্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আরেক তীর ঘেঁষে গাজী বুরহানউদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শনিবার সকাল ৮টায় অঝোর বৃষ্টির মধ্যে এ দুটি কেন্দ্রে শুরু হয় ভোট গ্রহণ। বেলার বাড়ার সঙ্গে বৃষ্টি বন্ধ হলে কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি বাড়ে। দুপুরে দুটি কেন্দ্রে নারী ভোটারের লম্বা লাইন দেখা যায়। তবে দুপুরের পর থেকে দুটি কেন্দ্রে আবার ভোটারদের উপস্থিতি কমে যায়। বিকেল ৪টায় ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত দু-একজন করে এসে ভোট দিয়ে ফিরে যান। জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টাকালে পাঁচজনকে আটক করা হলেও পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
শনিবার হবিনন্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বিপুল সংখ্যক পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি মিলে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়। এ ছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মাঠে ছিলেন। দুপুরে মহানগর পুলিশের ক্রাইসিস রেসপন্স টিম-সিআরটির সদস্যরা দুটি কেন্দ্রে মহড়া দেন। সকালে হবিনন্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র পরিদর্শনে এসে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার পরিতোষ ঘোষ বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণের জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। বিকেলে তিনি জানিয়েছেন, কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এই কেন্দ্রে মেয়রের পাশাপাশি সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ভোট গ্রহণ করা হয়।
একই চিত্র ছিল সুরমা নদীর উত্তরপাড়ের গাজী বুরহানউদ্দিন গরম দেওয়ান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে। বেলা বাড়ার সঙ্গে এ কেন্দ্রের দোতলায় নারী ভোটারের লম্বা লাইন দেখা যায়। এ কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার কৃপেশ রঞ্জন দাস সমকালকে জানান, দুপুর ১২টা পর্যন্ত এই কেন্দ্রে প্রায় ৮০০ জন ভোট দিয়েছেন। এই কেন্দ্রে মোট দুই হাজার ২২১ জন ভোটার রয়েছেন। সকালে এই কেন্দ্রে জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টাকালে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পাঁচজনকে আটক করেন। তবে বিকেলে ভোট গ্রহণ শেষে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। সিলেট মহানগর পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপকমিশনার মুহম্মদ আবদুল ওয়াহাব জানিয়েছেন, কোনো গোলযোগ ছাড়াই ভোট গ্রহণ হয়েছে।
এদিকে, সকালের টানা বর্ষণ বন্ধ হওয়ার পর কামরান ও আরিফুল দুটি ভোটকেন্দ্রই পরিদর্শন করেন। স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দুটি কেন্দ্র পরিদর্শন করলেও অন্য মেয়র প্রার্থীদের কাউকে দেখা যায়নি। শনিবার সকালে হবিনন্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে একজন মেয়র ও তিনজন কাউন্সিলর প্রার্থীর এজেন্টকে বের করে দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী মহানগর জামায়াতের আমির জুবায়েরের এজেন্ট সুমন আহমদ সমকালকে বলেছেন, তিনি এ কেন্দ্রের ভোটার নন বলে তাকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কাউন্সিলর প্রার্থীদের আরও তিনজন এজেন্টকে বের করে দেওয়া হয় বলে জানান তিনি। এই কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার মাহবুবুর রহমান এর সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন, কেন্দ্রের ভোটার না হলে এজেন্ট হওয়ার নিয়ম নেই।