Share |

মিয়ানমারের জঘন্য মিথ্যাচার : প্রয়োজন সম্মিলিত প্রতিরোধ

লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাকে জোরপূর্বক নিজ বাসভূমি থেকে বিতাড়িত করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার পর এবার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর এসেছে, মিয়ানমারে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের ওপর এখনো নানাভাবে নির্যাতন চালানো হচ্ছে। তাদেরকে মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার জন্য নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ফেরত নেবে কি না তা নিয়ে শুরু থেকেই অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। তাহলে কি তাদের সেই সন্দেহ সত্যে পরিণত হতে চলেছে- এমন প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।  
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গাবিরোধী সাম্প্রতিক মিথ্যা প্রচারণার পর বিষয়টি আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ‘আসল সত্য’ নামে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জনসংযোগ ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বিভাগ ১১৭ পৃষ্ঠার একটি বই প্রকাশ করেছে। তাতে মিথ্যা তথ্যের পাশাপাশি অনেক ভুয়া ছবিও ব্যবহার করা হয়েছে। এর কিছু নমুনা দেখা যাক। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনীর হাতে নিহত বাঙালিদের লাশ বুড়িগঙ্গায় ভাসছিল, যার ছবি তুলেছিলেন আলোকচিত্রশিল্পী আনোয়ার হোসেন। বইটিতে সেই ছবি ব্যবহার করে বলা হয়েছে, এগুলো ১৯৪০-এর দশকে রোহিঙ্গাদের হাতে নিহত বৌদ্ধদের মৃতদেহ। ১৯৯৬ সালে রুয়ান্ডার গণহত্যা থেকে বাঁচতে বহু মানুষ পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে গিয়েছিল। সেই ছবি দিয়ে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গারা এভাবেই ১৯৪৮ সালে মিয়ানমারে এসেছিল। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স অনুসন্ধান চালিয়ে বইটিতে ব্যবহৃত আটটি ছবির তিনটিকেই ভুয়া বলে চি?িত করেছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এ ধরনের অপপ্রচারের পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দেশটির ন্যূনতম কোনো সদিচ্ছা আছে বলে বিশ্বাস করা কঠিন। এদিকে, জাতিসংঘ এবার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে, মিয়ানমারে গণহত্যা হয়েছে। জাতিসংঘের নিজস্ব ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং মিশন বা সত্যানুসন্ধানী দল সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে এ কথা স্বীকার করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর ‘গণহত্যা’, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও ‘যুদ্ধাপরাধ’-সবই করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। কম করে হলেও ১০ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। গণহত্যার জন্য মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ও সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংসহ ছয়জন জেনারেলকে মূলত দায়ী করা হয়েছে। প্রতিবেদনে তাঁদের আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (আইসিসি) তদন্ত ও বিচারের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু এর পরও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর গড়িমসি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত গণহত্যার তথ্য নুতন নয়। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সসহ অনেক বার্তা সংস্থাই গণহত্যার প্রচুর তথ্য তুলে ধরেছে। রয়টার্সের দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য-প্রমাণে দেখা যায়, দেশটির ৩৩ ও ৯৯ ডিভিশন মূলত রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযান চালায়। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার এরই মধ্যে একটি ডিভিশনের প্রধানকে বরখাস্তও করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনেও বলা হয়, মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংসহ ১৩ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রোহিঙ্গা নিধনে সমন্বয়কের ভূমিকায় ছিলেন।  
বিশেষজ্ঞদের মতে, এত তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার পরও আইসিসিতে গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া শুরু না হওয়ার কোনো কারণই থাকতে পারে না। আর এই ইস্যূতে বিশ্ব জনমত সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য আমাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সক্রিয় হওয়া দরকার। কারণ, আমরা মনে করি, আরেকটি গণহত্যা প্রতিরোধে এবং?মিয়ানমারের উদ্ধত জেনারেলদের যেকোনো মূল্যে বিচারের আওতায় আনতে সম্মিলিত উদ্যোগের বিকল্প নেই।