Share |

শহিদুল আলমের মুক্তি চাইলেন অর্ধশত ব্রিটিশ শিল্পবোদ্ধা

পত্রিকা রিপোর্ট
লন্ডন, ৩ সেপ্টেম্বর : বাংলাদেশের কারাগারে আটক বিশিষ্ট আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের মুক্তি দাবি করেছেন যুক্তরাজ্যের সৃজনশীল জগতের অর্ধশত শিল্পবোদ্ধা। লেখক, স্থপতি, ভাস্কর ও জাদুঘরের পরিচালকসহ ব্রিটিশ শিল্পাঙ্গনের ৪৯জন শিল্প ব্যক্তিত্ব ২ সেপ্টেম্বর রোববার পর্যন্ত শহিদুল আলমের মুক্তির দাবিতে লেখা এক খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন।
উল্লেখ্য, গত ৫ আগস্ট ঢাকায় আটক হন শহিদুল আলম। ৪ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার তাঁর জামিনের বিষয়ে শুনানীর কথা রয়েছে। ব্রিটিশ শিল্পজগতের বিশিষ্টজনরা শহিদুল আলমের ন্যায়বিচার ও তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে স্বচ্ছতার দাবি জানিয়েছেন।
শহিদুল আলমের ভাগনি যুক্তরাজ্যে বসবাসরত সোফিয়া করিম ওই চিঠি লেখেন। সোফিয়া করিম নিজেও  একজন স্থপতি। চিঠিতে শহিদুল আলমের অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে আছেন, লেখক চার্লি ব্রুকার, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার আকরাম খান, হোয়াইটচাপেল গ্যালারির পরিচালক ইয়োনা ব্লেইজ উইক, শিল্পী ও ছবি নির্মাতা জন অ্যাকমপ্রাহ, ন্যাশনাল প্রোট্রেইট গ্যালারির পরিচালক নিকোলাস কিউলিনান, ব্রিটেনের জাতীয় চিত্রশালা টেইট মর্ডানের কিউরেটর ফ্রান্সিস মরিস, গেটসহেডের বাল্টিক সেন্টার ফর কনটেম্পোরারি আর্টের ডিরেক্টর সারাহ মুনরো, ম্যাগনাম ফটোজের সোফি রাইট এবং ভাস্কর অ্যান্টনি গোর্মলি ও অনীশ কাপুরসহ নামিদামি শিল্পবোদ্ধারা।    
চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশ নিজেকে গণতান্ত্রিক বলে পরিচয় দেয়, অথচ দেশটি শহিদুল আলমের অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ। চিঠিতে শহিদুল আলমের মত সমান অভিযোগে আটক সকল নাগরিকেরও মুক্তি দাবি করা হয়েছে।   
শহিদুল আলমের সমর্থনে দেয়া বার্তায় নিকোলাস কালিনান বলেন, “মত প্রকাশের স্বাধীনতা, শৈল্পিক প্রকাশ এবং ক্ষমতাবানের সামনে সত্য বলার মত বিষয়গুলো সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। ন্যায্য ও সহনশীল সমাজের এসব ভিত্তির বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো ব্যক্তির প্রতি আঘাত মানে আমাদের সকলের প্রতি আঘাত।”
ভাস্কর অ্যান্থোনি গোর্মলি বলেন, “শহিদুল একজন শিল্পী এবং সময়ের একজন স্বাক্ষী হিসেবে দেশে ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য ক্ষমতাসীনদের সত্য দিয়ে মোকাবেলা করতে চেয়েছেন। তাঁর প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন আছে।”
গতকাল রোববার বিকালে সোফিয়া টেলিফোনে প্রথম আলোকে বলেন, শহিদুল আলমের মুক্তির দাবিতে ব্রিটিশ শিল্পাঙ্গনের এত বিপুল বিশিষ্টজনের সমর্থন অত্যন্ত সম্মানের। তিনি বলেন, মুক্তি দাবিকারী বিশিষ্টজনদের অনেকেই ব্যক্তিগত বার্তা পাঠিয়ে শহিদুল আলমের বলিষ্ঠ ও ইতিবাচক কাজের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের কোনো ব্যক্তির জন্য ব্রিটিশ শিল্পাঙ্গনের ব্যক্তিদের এমন সমর্থন এক বিরল ঘটনা। এর আগে বিখ্যাত কলামিস্ট নোয়াম চমস্কি, আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু, হলিউড অভিনেত্রী ও মানবাধিকার কর্মী শ্যারন স্টোনসহ প্রখ্যাত বিশ্ব ব্যক্তিত্বরা বাংলাদেশের গুণী এই আলোকচিত্রীর মুক্তি দাবি করেছেন, যাদের মধ্যে আছেন ১১ জন নোবেল বিজয়ী।
যুক্তরাজ্য সংসদে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তিন এমপি-রুশনালা আলী, রূপা হক এবং টিউলিপ সিদ্দিকও শহিদুল আলমের দ্রুত মুক্তি দাবি করে বিবৃতি দিয়েছেন।
 টিউলিপের বিবৃতি
সাংবাদিক শহিদুল আলমকে মুক্তি দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তার ভাগনি ও ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক। বলেছেন, তার খালা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদের নেতৃত্বাধীন সরকার  শহিদুল আলমকে আটক করেছে। এটা গভীর উদ্বেগের এবং অবিলম্বে এর ইতি ঘটা উচিত। লন্ডনের অনলাইন দ্য টাইমস পত্রিকা এ খবর জানিয়েছে। ‘এমপি আর্জেজ আন্ট টু রিলিজ বাংলাদেশ ফটোগ্রাফার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। টিউলিপ সিদ্দিক হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ট কিলবার্ন আসনে বিরোধী লেবার দলের এমপি।
শহিদুল আলম ব্রিটেনে নিয়মিত প্রদর্শনী করেন। ওই রিপোর্টে তাকে একজন ফটোসাংবাদিক ও আর্টিস্ট হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়েছে। শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তারে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে তার সঙ্গে যোগ হলেন টিউলিপ সিদ্দিক। তিনি বলেছেন, নিজের নাগরিকদের প্রতি ন্যায়বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অবশ্যই বাংলাদেশকে সমুন্নত রাখতে হবে। আমি আশা করবো যে দেশটিকে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখা হয় তাদের কাছে কড়াভাবে এই বার্তাটি পৌঁছে দেবে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়- আমি এমনটা আশা করি।
উল্লেখ্য, গত ৫ই আগস্ট ৬৩ বছর বয়সী শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ।
আল জাজিরা টেলিভিশনকে ছাত্র বিক্ষোভ নিয়ে সাক্ষাৎকার দেয়ার পর তার বাসভবনে অভিযান চালায় ৩০ জনের বেশি নিরাপত্তা কর্মকর্তা। সেখান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বাংলাদেশের তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার অধীনে। এ আইনটিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অতিশয় কঠোর (ড্রাকোনিয়ান) হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। শহিদুল আলম অভিযোগ করেছেন, আটক করে তার ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। শহিদুল আলমের রয়েছে বৃটেনে বসবাসের অনুমতি। তিনি এখানে প্রদর্শনী করেছেন টেইট মডার্ন, হোয়াইটচ্যাপেল গ্যালারি, নিউ ইয়র্কের মোমা ও প্যারিসের পোম্পিডোউতে।