Share |

‘নো-ডিল’ নিয়ে ভয়ঙ্কর সতর্কতা

পত্রিকা রিপোর্ট
লন্ডন, ১৭ সেপ্টেম্বর : ইইউর সঙ্গে বিচ্ছেদের ক্ষণ ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু এই বিচ্ছেদের পর যুক্তরাজ্য ও ইইউর মধ্যকার ভবিষ্যত বাণিজ্য সম্পর্ক কেমন হবে, তা নিয়ে এখনো কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি উভয় পক্ষ। এই অবস্থায় চুক্তিবিহীন  ব্রেক্সিট হলে যুক্তরাজ্যে ঘরবাড়ির দাম মারাত“কভাবে কমে যাওয়ার পাশাপাশি দৈনন্দিন পণ্য-দ্রব্যের দাম বাড়বে। ব্রিটিশরা ইইউভুক্ত দেশে গিয়ে মোবাইলের রোমিং চার্জের শিকার হবেন। সেখানে ব্রিটিশ লাইসেন্সধারীরা গাড়িও চালাতে পারবেন না বলে আশঙ্কা।  যে কারণে জোরালো হয়ে উঠেছে পুনরায় গণভোটের দাবি। যাতে ব্রিটেনের জনগণ ক্ষতিকর ওই পরিস্থতি ঠেকাতে মতামত দিতে পারেন।
 দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় নদীর মাছ ধরা থেকে শুরু করে মহকাশ গবেষণা এবং দৈনন্দিন ব্যবসা-বাণিজ্য- সবক্ষেত্রে ইইউর একক নীতি মেনে চলেছে ব্রিটেন।  বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সবকিছুতেই ছেদ পড়বে। বিশেষ করে কার্যকর কোনো চুক্তি ছাড়া যদি বিচ্ছেদ হয়, তবে তা যুক্তরাজ্যের ব্যবসা-বাণিজ্য শুধু নয়; যুক্তরাজ্যের সাধারণ মানুষের ওপর তার ভয়ঙ্কর প্রভাব পড়বে। বিচ্ছেদের ক্ষণ এগিয়ে আসায় এবং চুক্তি সম্পাদনের বিষয়ে ইতবাচক কোনো খবর না থাকায় সেই আতঙ্ক এখন আরও জোরালো হয়েছে।   এখন চুক্তি সম্পাদনের চাইতে চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বেশি। কেননা, মত পার্থক্য নিরসনের সময় আর বেশি নেই। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ কলহের কারণে প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে নতুন করে আর ছাড় দিতে পারবেন না। আর প্রধানমন্ত্রীর ‘চেকার্স ডিল’ (ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কান্ট্রিহাউজ চেকার্সে নেয়া সর্বশেষ সিদ্ধান্ত) মেনে নিতে অস্বীকৃতি আছে ইইউ নেতাদের।
এমন পরিস্থিতিতে চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের বিষয়ে ব্রিটিশ  সরকার বারবার নিজেদের প্রস্তুতির কথা জানান দিচ্ছে। সরকার বলছে, তারা একটি সফল চুক্তি চান। তবে কোনো খারাপ চুক্তির চাইতে চক্তিহীন বিচ্ছেদকেই বেছে নেবেন তারা। চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট হলে জনগণ অসুবিধার মুখে পড়তে পারেন- এমন আরও ৫০টি বিষয়ে গত বুধবার নির্দেশনা প্রকাশ করে ব্রিটিশ সরকার। এতে বলা হয়েছে, চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ নাগরিকরা ইইউভুক্ত দেশে গেলে মোবাইলের রোমিং চার্জ দিতে হতে পারে। তাদের বিদ্যমান ড্রাইভিং লাইসেন্স ইইউতে কার্যকর নাও থাকতে পারে। ইইউ’র সঙ্গে ট্রেন ও বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সীমান্তে আটকে যেতে পারে মালবাহী যান। এতে দ্রব্যমূল্যে বাড়তে পারে। এমন আরও অনেক কিছু ঘটতে পারে। এসব সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের প্রস্তুতির কথা তুলে ধরার পাশাপাশি জনগণকে মানসিক প্রস্তুতি রাখার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর মার্ক কার্নি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের পরিণতি হতে পারে ২০০৮ সালে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক মন্দার মত। বাড়ি-ঘরের দাম ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা। এতসব সতর্কতার ভিড়ে ব্রেক্সিট বিষয়ে পুনরায় গণভোটের দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। ব্রেক্সিট বিরোধীরা বলছেন, চুক্তি গ্রহণ বা বর্জন বিষয়ে আবার গণভোট করতে হবে- যাতে ক্ষতিকর চুক্তি বর্জনের সযোগ পায় জনগণ। সর্বশেষ লন্ডনের মেয়র সাদিক খান পুনরায় গণভোটের পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরে বলেছেন, চুক্তির বিষয়ে মতপার্থক্য নিরসনে এখন আর সময় নেই। ফলে এখন হয় কোনো ক্ষতিকর চুক্তি সম্পাদিত হবে। অথবা কোনো চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিট হবে। এই দুই পরিস্থিতি-ই ব্রিটেনের জন্য ক্ষতিকর। এই পরিস্থিতি ঠেকাতে পুনরায় গণভোট আয়োজনই সর্বোত্তম বিকল্প। 
আগামী ২৩ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর লেবার দলের বার্ষিক সম্মেলন। এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের সম্মেলন। আসন্ন সম্মেলনে পুনরায় গণভোটের প্রস্তাব পাশ করিয়ে নিতে জোর তৎপরাতা চালাচ্ছে ব্রেক্সিট বিরোধীরা।  বিপরীতে দল দুটির শীর্ষ নেতৃত্ব পুনরায় গণভোটের ওই দাবিকে নিরুৎসাহিত করছে। তারা ব্রেক্সিট চুক্তি গ্রহণ বা বর্জনের বিষয়ে এমপিদের ভোটভুটিই যথেষ্ট।
 এদিকে ব্রেক্সিটকে ঘিরে ব্রিটেনের রাজনীতি বিষাক্ত হয়ে উড়েছে। অন্তঃকলহে নাজেহাল ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ ও বিরোধী দল লেবার পার্টি।  প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে বিচ্ছেদ পরবর্তী সম্পর্ক নিয়ে ইউরোপিয় ইউনিয়নের (ইইউ) কাছে যে চূড়ান্ত প্রস্তাব তুলে ধরেছেন, সেটিকে ‘সুইসাইড ভেস্ট’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন সদ্য সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। এই প্রস্তাবের বিরোধীতা করে গত জুলাই মাসে মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের এই প্রভাবশালী রাজনীতিক। বরিস জনসন কট্টর ব্রেক্সিটপন্থী। ক্ষমতাসীন দলে কট্টর ব্রেক্সিটপন্থীদের প্রকাশ্য নেতৃত্ব দিচ্ছেন সংসদ সদস্য জেকব রিচ মগ। কয়েকদিন আগে তাঁর বাসার সামনে প্রধানমন্ত্রীর প্রচ্চাবের সমর্থকরা বিক্ষোভ করে। বিক্ষোভকারী জেকবের ছোট্ট শিশুদের সামনে পেয়ে বলে, ‘তোমরা কি জান, তোমাদের বাবা একজন ভীষণ বাজে লোক?’
বিরোধী দল লেবার পার্টিতে দলনেতা জেরেমি করবিনের আলাদা একটি সমর্থকগোষ্ঠী আছে-‘মোমেন্টাম’। ব্রেক্সিটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে করবিনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধাচারণ করেন- এমন এমপিদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আসনের মোমেন্টাম সদস্যরা অনাস্থা ভোটের আয়োজন করছেন বলে অভিযোগ। যাতে ওইসব এমপি আগামী নির্বাচনে সরাসরি মনোনয়ন না পেয়ে নতুন করে প্রতিযোগিতার মধ্যদিয়ে আসতে হয়। এতে বেজায় চটেছেন ব্রেক্সিট বিরোধী হিসেবে পরিচিত লেবার দলের প্রভাবশালী এমপি চুকা উমুন্না। গত সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলন করে তিনি জেরেমি করবিনের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনার কুত্তাদের সামলান’।
উপরের তিনটি ঘটনা বলে দিচ্ছে ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যের বিচ্ছেদ (ব্রেক্সিট নামে পরিচিত) কারযকর করা নিয়ে কতটা অন্তঃকলহে লিপ্ত ব্রিটিশ রাজনীতিকরা। রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা প্রশ্ন তুলেছেন- সভ্য, উদার গণতান্ত্রিক দেশটির রাজনীতি এতটা বিষাক্ত কি করে হলো? মতপার্থক্যের চাইতে রাজনীতিকদের ভাষা নিয়ে তাদের আপত্তি বেশি।
২০১৬ সালে এক গণভোটে যুক্তরাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ইইউ ত্যাগ করার পক্ষে রায় দেয়। মূলত জোটভূক্ত অন্য দেশগুলো থেকে অভিবাসীদের অবাধ প্রবেশ ঠেকাতে তাঁরা এমন সিদ্ধান্ত দেয়। সেই রায়ের বাচ্চবায়ন নিয়ে গত প্রায় দুই বছর ধরে চলছে আলোচনা। কিন্তু বিচ্ছেদের পর ইইউ’র সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য সম্পর্ক কি হবে এবং যুক্তরাজ্যের অংশ নর্দান আয়ারল্যান্ডের সাথে স্বাধীন আয়ারল্যান্ডের উন্মুক্ত সীমান্ত চুক্তি রক্ষার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেননি তারা।
তবে ২০১৯ সালের ২৯ মার্চ রাত ১১টায় ব্রেক্সিট কার‌্যকর হবে বলে দিনক্ষণ ঠিক করা আছে। সে অনুযায়ী আসছে অক্টোবরের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদনের প্রত্যাশা করা হচ্ছিলো। কিন্তু আলোচনা এক কদম আগায় তো তিন কদম পিছিয়ে যায়-এভাবেই চলছে। সর্বশেষ গত শুক্রবার যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট-বিষয়ক মন্ত্রী ডোমিনিক রাব এবং ইইউ’র পক্ষে প্রধান সমঝোতাকারী মিশেল বার্নিয়ে টেলিফোনে কথা বলেন। এরপর এক বিবৃতিতে ডোমিনিক রাব দাবি করেন, চুক্তির দিকে আলোচনা এগিয়ে গেছে। আয়ারল্যান্ড সীমান্ত নিয়ে ইতবাচক আলোচনার ইঙ্গিত দেন তিনি। তাঁর এ কথায় বিস্ময় প্রকাশ করেন ইইউ কূটনীতিকরা। মিশেল বার্নিয়ে টুইট করে জানিয়ে দেন, আয়ারল্যান্ড সীমান্ত এখনও বড় বাধা। ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনাও বেশ বাকী।
সমস্যা সমাধানে নর্দান আয়ারল্যান্ডকে ইইউ’র ‘সিঙ্গেল মার্কেট’ এবং ‘কাস্টমস ইউনিয়ন’ এর অধীনে রেখে দেয়ার প্রস্তাব করেছিল ইইউ। যুক্তরাজ্য তা প্রত্যাখান করে। প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে এ বিষয়ে কার্যকর বিকল্প উপস্থাপন করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তা এখনও করতে পারেননি বলে দাবি ব্রাসেলসের।
প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে তাঁর চেকার্স ডিলের প্রতি সমর্থন আদায়ের অব্যাহত চেষ্টার অংশ হিসেবে আগামী বুধবার অস্ট্রিয়ায় ইইউ নেতাদের একটি অনানুষ্ঠানিক সম্মলনে যোগ দেবেন। এমন তৎপরতার পাশাপাশি তিনি এও বলছেন, বিচ্ছেদের অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্য যে ৩৯ বিলিয়ন পাউন্ড পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিট হলে সেই অর্থ দেয়া হবে না। তিনি বলছেন, সবকিছু চূড়ান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো কিছুই চূড়ান্ত নয় (নাথিং ইজ অ্যাগ্রিড আনটিল এভরিথিং অ্যাগ্রিড)।