Share |

বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাশ : ঔপনিবেশিক আমলে ফেরা

নানা মহলের তীব্র আপত্তি আর বিরোধিতা আগ্রাহ্য করে বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাশ হয়েছে। অথচ শুরু থেকেই বাংলাদেশের সম্পাদক পরিষদ এই আইনের নেতিবাচক দিকগুলো প্রত্যাখ্যান করেছিলো। এছাড়া সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোর আপত্তি আর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিরামহীনভাবে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এসেছে। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা কিছুতেই গা করেননি।
এই আইন প্রবর্তিত হলে তা যে শুধু স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে বিষয়টি এমন নয়। এই আইন চালুর বিরোধীতাকারীরা বলছেন, নতুন আইনের কিছু কিছু ধারা মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করবে।
অথচ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অপরিহার্য শর্ত হচ্ছে বাকস্বাধীনতা। জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে অনেক গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। আর এর মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগনেল চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছিল। এই স্বাধীনতা আগে বার বার হোঁচট খেলেও এবারে আইনটি রাষ্ট্রের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ালো।  
এই আইনের সবচেয়ে অগ্রহণযোগ্য দিকটি হচ্ছে, ঔপনিবেশিক আমলের ‘অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট’কে এতে যুক্ত করা হয়েছে। দুর্নীতি ও অত্যাচারের খবর আড়ালে রাখতে আর সত্যকে ধামাচাপা দিতে এই কুখ্যাত ঔপনিবেশিক আমলে অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট করা হয়েছিল। উপনিবেশের দাসত্ব থেকে মুক্তির পর কম সময় তো পার করিনি আমরা। অথচ একটি স্বাধীন দেশে সেই অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্টকে আবার জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হলো। কেনো? কী উদ্দেশে?
দ্বিতীয়ত: এ আইন নিয়ে এর আগে আইনমন্ত্রী এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিমন্ত্রীর সাথে অনুষ্ঠিত সম্পাদক পরিষদের নেতাদের একাধিক বৈঠকে দুই মন্ত্রীই এই আইন নিয়ে সৃষ্ট উদ্বেগের বিষয়গুলো আমলে নিয়ে তা পুনর্বিচেনার জন্য আশ্বাস দিয়েছিলেন। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন জনগণের মৌলিক অধিকার-বিরোধী ও গণমাধ্যমবিরোধী কোন ধারা এই আইনে থাকবে না। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষিত হয়নি।  
এই আইনের সমালোচকরা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের উদাহরণ তুলে ধরে বলছেন, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের ৬৬/এ ধারাটি বাতিল করে দিয়েছে। বিচারক রায়ে বলেছেন, ধারাটি অসাংবিধানিক। বাকস্বাধীনতার পরিপন্থি, অস্বচ্ছ ও পরিণামে ভয়ঙ্কর।  
সংসদে নিছক সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে পুঁজি করে কণ্ঠভোটে এ আইন পাস করিয়ে নিয়ে সরকার আখেরে কোন লাভ করতে পারবে সেটি সময়ই বলবে। তবে জোর-জবরদস্তির কোন কাজই সুফল বয়ে আনেনা সেটি তো আর আমাদের কারো অজানা নয়।  
বাংলাদেশের পুলিশ আচরণ আর দুর্নীতি সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। অথচ নতুন এ আইনের বিধান অনুসারে, পুলিশ কর্মকর্তারা কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়াই যেকোনো লোককে তল্লাশি ও গ্রেফতার করতে পারবে। এ আইনের কিছু ধারার অপরাধকে জামিনের অযোগ্য অপরাধ বিবেচনা করা হয়েছে।
সুতরাং এই আইন করে জনগণকে হয়রানীর নতুন আরেকটি অস্ত্র পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এটি কি জনস্বার্থ রক্ষার খেয়ালে নাকি আরো কঠোর হস্তে সমালোচনা দমনের অভিপ্রায়ে?
ইতিহাস সাক্ষী, যখনই সমালোচনাকে প্রতিহিংসা ভেবে দমনের চেষ্টা হয়েছে তখনই তা বুমেরাং হয়েছে।