Share |

আনোয়ার চৌধুরীকে লন্ডনে পদায়ন : গভর্ণর পদ থেকে সরানো নিয়ে রহস্য

পত্রিকা রিপোর্ট
লন্ডন, ২৪ সেপ্টেম্বর :  কেইম্যান আইল্যান্ডের গভর্ণর পদ থেকে আনোয়ার চৌধুরীকে স্থায়ীভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (২০ সেপ্টেম্বর) দ্বীপরাষ্ট্র কেইম্যান আইল্যান্ডসের গভর্ণর অফিস বিবৃতিতে এ কথা জানায়। যুক্তরাজ্যের ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ দফতরের বরাতে দেয়া ওই বিবৃতিতে আনোয়ার চৌধুরীকে অপসারণের কোনো কারণ ব্যাখা করা হয়নি। তবে তাঁকে লন্ডনে নতুন করে পদায়ন করা হবে জানানো হয়।  অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিষয়টি নিয়ে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দফতর আর বেশি কোনো তথ্য দেবে না। ফলে রহস্যাবৃতই রয়ে গেল পুরো ঘটনা।
আনোয়ার চৌধুরী বাংলাদেশি পরিবারের সন্তান। ব্রিটিশ কূটনীতিক হিসেবে নাম লেখানো প্রথম কোনো বাংলাদেশি তিনি। যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রাধীন দ্বীপরাষ্ট্র কেইম্যান আইল্যান্ডসে তাঁকে গত মার্চ মাসে গভর্ণর হিসেবে পাঠানো হয়। মাত্র তিন মাসের মাথায় ১৩ জুন তাঁকে গভর্ণর পদ থেকে সাময়িক প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দফতর থেকে বলা হয়, তাঁর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ তদন্তে চার থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগবে। কিন্তু অভিযোগগুলো কি এবং কারা এসব অভিযোগ করেছেন- তা নিয়ে কিছুই প্রকাশ করা হয়নি। সেই তদন্তের দীর্ঘ ১৪ সপ্তাহ পার হওয়ার পর আনোয়ার চৌধুরীকে গভর্ণর পদ থেকে স্থায়ীভাবে অপসারণ করে লন্ডনে পদায়নের ঘোষণা এলো। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো কি এবং তদন্তেই বা কি পাওয়া গেল সেসব নিয়ে কোনো ব্যাখা নেই। কেইম্যান আইল্যান্ডসের স্থানীয় টিভি চ্যানেল ‘কেইম্যান কম্পাস’ বলছে, যুক্তরাজ্য সরকারের এমন সিদ্ধান্তে কেইম্যাবাসী ক্ষুব্ধ। তাঁরা আনোয়ার চৌধুরীকে অপসারণের কারণ জানতে চান।
দেশটির বিরোধী দলীয় নেতা এজার্ড মিলার এক বিবৃতিতে বলেন, অন্য গভর্ণররা যেখানে পাঁচ বছর দ্বায়িত্ব পালন করে কেইম্যানবাসীর মন জয় করতে পারেননি, সেখানে আনোয়ার চৌধুরী মাত্র তিন মাসে সবার মন জয় করে নিয়েছিলেন। অপসারণের কোনো ব্যাখা না দেয়াকে তিনি ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দফতরের ‘কর্তৃত্বপরায়ন’ আচরণ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, ‘পররাষ্ট্র দফতর সম্ভবত ভুলে গেছে ২০ শতকের শুরুর দিককার সময় থেকে আমরা অনেক এগিয়ে গেছি, যখন আমাদের উপনিবেশিক মাস্টারদের আদেশ বিনা প্রশ্নে মেনে নেয়া হতো।’ আনোয়ার চৌধুরী কেইম্যানবাসীর উদ্বেগ নিরসনে যেসব কাজ শুরু করেছিলেন এবং দুর্নীতি বন্ধে যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন-সেসব সম্পন্ন করতে গভর্ণর হিসেবে তাঁর মেয়াদপূর্তির সুযোগ দেয়ার আহবান জানান তিনি। এজার্ড মিলার আরও বলেন, আনোয়ার চৌধুরী যদি গুরুতর কোনো অপরাধ করতেন তাহলে তাঁকে লন্ডনে সরকারী কাজে পুনরায় পদায়ন করা হতো না। ‘কেইম্যান কম্পাস’ তাদের প্রতিবেদনে বলছে, তারা আনোয়ার চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং তদন্তের ফলাফল বিষয়ে বারবার ব্রিটিশ সরকারের কাছে জানতে চেয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশ ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিস এ বিষয়ে ব্যাখা দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।
আনোয়ার চৌধুরী ১৯৮৫ সালে রয়্যাল নেভির ‘ইঞ্জিনিয়ারিং স্ট্র্যাটেজিস্ট’ হিসেবে সিভিল সার্ভিসে (সরকারি চাকরি) যোগ দেন। এরপর দ্রুত তাঁর ক্যারিয়ারের উন্নতি হতে থাকে। ২০০৪ সালে তিনি বাংলাদেশে ব্রিটিশ হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান। যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পাওয়া প্রথম দুই অশ্বেতাঙ্গর একজন আনোয়ার চৌধুরী।  বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে তিনি সিলেটে হজরত শাহজালাল মাজার প্রাঙ্গণে গ্রেনেড হামলার শিকার হন। ওই ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছিল। আর আহত হন আনোয়ার চৌধুরীসহ ৪০ জন। ওই গ্রেনেড হামলার অভিযোগে হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নানসহ তিন জঙ্গিকে গত বছর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
আনোয়ার চৌধুরী ২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ছিলেন। এরপর ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের অধীন ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট বিভাগের পরিচালক ছিলেন। ২০১৩ সালে তাঁকে লাতিন আমেরিকার দেশ পেরুতে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত করা হয়। ওই দায়িত্বের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁকে কেইম্যান আইল্যান্ডসের গভর্ণর করার খবর আসে।
যুক্তরাজ্যের অধীন ১৪টি বৈদেশিক ভূখণ্ড (ওভারসিস টেরিটোরি) রয়েছে। তার মধ্যে ক্যারাবিয়ান সাগরের পশ্চিমাংশে অবস্থিত কেইম্যান আইল্যান্ডস অন্যতম। তিনটি আলাদা দ্বীপ নিয়ে এই কেইম্যান আইল্যান্ডস গঠিত, যার মোট আয়তন ২৬৪ বর্গ কিলোমিটার। লোকসংখ্যা ৬০ হাজারের মতো। নির্বাচিত প্রিমিয়ার (প্রধানমন্ত্রী) নিজস্ব কেবিনেট গঠন করে প্রশাসন পরিচালনা করেন। আর গভর্ণর সর্বোচ্চ ব্যক্তি হিসেবে ব্রিটিশ সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে বোঝাপড়া এবং নজরদারির কাজটি করেন। কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য বিশ্বের অসৎ কোম্পানি ও ধনকুবেররা যে কয়েকটি দ্বীপরাষ্ট্রে (ট্যাক্স হেভেন নামে পরিচিত) কোম্পানি নিবন্ধন করেন, তার মধ্যে কেইম্যান আইল্যান্ডস অন্যতম। সম্প্রতি ব্রিটিশ সরকার কর ফাঁকি ঠেকাতে এর নিয়ন্ত্রণাধীন বৈদেশিক ভূখণ্ডগুলোতে নিবন্ধিত কোম্পানির মালিকানা প্রকাশ বাধ্যতামূলক করে আইন পাস করে। এ কারণে কেইম্যান আইল্যান্ডসের কোম্পানিগুলো অধিকতর গোপনীয় স্থানে সরে যেতে পারে এবং এতে কেইম্যান আইল্যান্ডসের অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়। গভর্ণরের মতো শীর্ষ পদে আসীন হলেও আনোয়ার চৌধুরী নিজের বন্ধুসুলভ আচরণ দিয়ে গত তিন মাসেই বেশ সাড়া ফেলেন। স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোকে তিনি বেশ কয়েকটি সাক্ষাৎকার দেন। যেখানে তিনি কেইম্যানবাসীর জন্য আমলাতান্ত্রিক বাড়াবাড়ি কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন।