Share |

থমকে গেছে ব্রেক্সিট সমঝোতা : স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তিতে যাবেন না মে

পত্রিকা রিপোর্ট
লন্ডন, ২৪ সেপ্টেম্বর : ভবিষ্যত সম্পর্ক নির্ধারণ নিয়ে যুক্তরাজ্য যে প্রস্তাব করেছে সেটি প্রত্যাখান করে দিয়েছে ইউরোপিয় ইউনিয়ন (ইইউ)। গত বৃহস্পতিবার (২০ সেপ্টেম্বর) ইইউর প্রেসিডেন্ট ডোনা? ট্রাস্ক এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য যে কমন রুল বুক নীতির প্রস্তাব করেছে, তা কাজের নয়।  
তাঁর ওই বক্তব্যের পর কার্যত থমকে গেছে ব্রেক্সিট সমঝোতা। এ পরিস্থিতি যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন মহল  ব্রেক্সিট বিষয়ে পুনরায় গণভোটের দাবি তুলেছেন। তারা বলছেন, এতে জনগণ নিজেদের ভুল শুধরে ব্রেক্সিটের সিদ্ধান্ত বদলের সুযোগ পাবে।  এদিকে ব্রেক্সিট সমঝোতায় যুক্তরাজ্যের প্রতি আরও সম্মানজনক আচরণ করতে ইইউ (ইউরোপিয় ইউনিয়ন) নেতাদের সতর্ক করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। গত শুক্রবার (২১ সেপ্টেম্বর) প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক ওই বক্তব্যের পরদিন শনিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্টও একই সূরে কথা বললেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ব্রিটিশদের ভদ্রতাকে যেন দূর্বলতা মনে করা না হয়। অষ্ট্রিয়ার শহর সলসবার্গে গত ১৮ ও ১৯ সেপ্টেম্বর দুদিনের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হয়েছিল ইইউভুক্ত দেশগুলোর সরকারপ্রধানরা। সেখানে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বিচ্ছেদ (ব্রেক্সিট নামে পরিচিত) পরবর্তী সম্পর্ক নির্ধারণে চলমান সমঝোতা নিয়ে আলোচনা করেন নেতারা। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মে তাঁর প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন  আদায়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু সম্মেলন শেষে অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে ইইউ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাস্ক এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাজ্যের প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। এরপর তিনি নিজের ইন্ট্রাগ্রামে থেরেসা মে’র সঙ্গে কেক খাওয়ার একটি ছবি পোস্ট করেন, যাতে লেখা-‘অ্যা পিস অব কেক, পারহেল্প? সরি, নো চেরিস’ (শুধুই কেক, সম্ভবত? দুঃখিত, কোনো চেরি নেই)। ছবির ওই কথার অনেক গভীর অর্থ আছে। ইইউ শুরু থেকে অভিযোগ করে আসছে- যুক্তরাজ্য ‘চেরি পিকিং’ করছে। অর্থ্যাৎ ইইউ’র কেবল ভাল ভাল জিনিসগুলো ধরে রাখতে চাইছে যুক্তরাজ্য।
ফলে প্রস্তাব প্রত্যাখানের পাশাপাশি অমন ছবির পোস্ট ব্রিটিশদের গায়ে জ্বালা ধরায়। একে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রতি চরম অবমাননাকর আচরণ বলে সমালোচনা হয়। বিতর্ক চলে থেরেসা মে’র নেতৃত্বের পক্ষে-বিপক্ষে। ২৪ ঘন্টার মাথায় প্রধানমন্ত্রী মে অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে জাতীর উদ্দেশে ভাষণ নিয়ে হাজির হলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার‌্যালয় থেকে টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত ওই ভাষণের আসল উদ্দেশ্য ইইউকে পাল্টা জবাব দেয়া। তিনি ইইউ নেতাদের উদ্দেশে বলেন, ব্রেক্সিট সমঝোতার শুরু থেকেই যুক্তরাজ্য সম্মানজনক আচরণ করে আসছে। যুক্তরাজ্যও তাঁদের কাছ থেকে একই রকম সম্মান আশা করে। তিনি বলেন, সমঝোতার এ পর্যায়ে এসে কোনো বিকল্প প্রচ্চাব না দিয়ে এবং কোনো বিস্তারিত ব্যাখা ছাড়াই অন্যপক্ষের প্রস্তাব প্রত্যাখান করা গ্রহণযোগ্য নয়। ইইউ’র অগ্রহনযোগ্য আচরণের কারণে সমঝোতা থমকে গেছে বলে উল্লেখ করেন মে। তিনি বলেন, ‘এখন আলোচনা সচল করতে ইইউ’কেই এগিয়ে আসতে হবে। যুক্তরাজ্যের প্রস্তাব প্রত্যাখানের বিস্তারিত কারণ এবং বিকল্প প্রস্তাব উত্থাপনের মাধ্যমে সেটি করতে হবে।’ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় কণ্ঠে জানিয়ে দেন, ব্রেক্সিটের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে তিনি কখনো পুনরায় গণভোটের দাবি মেনে নেবেন না। যুক্তরাজ্যের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তিও তিনি করবেন না। তাঁর দেশ প্রয়োজনে চুক্তিবিহীন বিচ্ছেদে প্রস্তুত এবং সে ক্ষেত্রে নর্দান আয়ারল্যান্ড সীমান্তের শান্তি রক্ষায় সম্ভাব্য সবকিছু করবে। তিনি ইইউ নেতাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এখনকার আচরণই ইইউ’র সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারণ করবে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এমন উত্তপ্ত প্রতিক্রিয়ার পর ইইউ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাস্ক শুক্রবার রাতে এক বিবৃতিতে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের প্রস্তাবকে তাঁরা গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর মে’র নেতৃত্বকে সবসময়ই সম্মানের চোখে দেখে আসছেন। ছাড়ের মানসিকতা নিয়ে এগোলে নভেম্বরের মধ্যেই একটি সফল চুক্তি সম্পাদনের বিষয়ে তিনি এখনো আশাবাদী। ডোনাল্ড টাস্কের ওই বিবৃতি ব্রিটিশদের মন নরম করতে পারেনি। শনিবার সকালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট বলেন, ব্রিটিশদের ভদ্রতাকে ভুল করে যেন দুর্বলতা ভাবা না হয়। তিনি বলেন, ‘তোমরা যদি আমাদের কঠিন পরিস্থিতিতে ফেল, আমরা আমাদের মত করে দাঁড়িয়ে যাব-আমরা ওই ধরণেরই দেশ’। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে অসম্মান করে, মানুষকে মিথ্যাবাদী বলে-এই কঠিন পরিস্থিতির সমাধান মিলবে না। প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র নেতৃত্ব নিয়ে তাঁর নিজ দলেই বেশ সমালোচনা ছিল। কিন্তু শুক্রবারের ভাষণে বলিষ্ঠ অবস্থান তুলে ধরে তিনি বেশ প্রসংশিত হচ্ছেন।
২০১৯ সালের ২৯ মার্চ ইইউ থেকে বেরিয়ে যাবে যুক্তরাজ্য। ওই বিচ্ছেদের পর তাদের ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সম্পর্ক কি হবে তা নিয়ে চলছে সমঝোতা। গত প্রায় দুই বছর যাবত আলোচনা চালালেও তাঁরা কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি। এর আগে সলসবার্গে ইইউ নেতাদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে বলেছেন, ব্রেক্সিট (ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বিচ্ছেদ) বিষয়ে চুক্তি হোক বা না হোক সমঝোতার সময় বাড়াবে না তাঁর দেশ। নির্ধারিত সময়ে মাত্র ছয় মাসের মাথায় আগামী বছরের ২৯ মার্চ বিচ্ছেদ ঘটে যাবে।  আয়ারল্যান্ড সীমান্ত নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে নর্দান আয়ারল্যান্ডকে ইইউ’র ‘সিঙ্গেল মার্কেট’ এবং ‘কাস্টমস ইউনিয়ন’র অধীন রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী মে ওই প্রস্তাবে আপত্তির কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, এক দেশে দুই নিয়ম চালু প্রস্তাব কোনোভাবেই গ্রহনযোগ্য হতে পারে না। বরং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ‘কমন রুল বুক’ (সমান নিয়ম) মেনে চলার যে প্রস্তাব যুক্তরাজ্য করেছে সেটিকেই সর্বোত্তম সমাধান বলে যুক্তি তুলে ধরেন তিনি।
যুক্তরাজ্যের অংশ নর্দান আয়ারল্যান্ডে শান্তি বজায় রাখতে স্বাধীন আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে সীমানা উন্মুক্ত রাখার চুক্তি করে ব্রিটিশরা। ‘গুড ফ্রাই ডে অ্যাগ্রিমেন্ট’ নামে পরিচিত সেটি। স্বাধীন আয়রল্যান্ডের ইইউ’র সদস্য। ইইউ’র সঙ্গে বিচ্ছেদের পর অভিবাসন ও পণ্যের আদান-প্রদানে ব্রিটিশ সীমান্তে চেকপোস্ট বসবে-এমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আয়ারল্যান্ড সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে গেলে সেটি হবে ‘গুড ফ্রাই ডে অ্যাগ্রিমেন্ট’ এর লঙ্ঘণ এবং তা নর্দান আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার দাবিকে পুনারায় জাগিয়ে তুলতে পারে। ব্রেক্সিট সমঝোতায় এটাই যুক্তরাজ্যের বড় দুর্বলতা।   একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিই কেবল আয়রল্যান্ড সীমান্তের যোগ্য সমাধান দিতে পারে। যুক্তরাজ্য সেটিই চাইছে। কিন্তু ইইউ তেমন চুক্তিতে নারাজ। কারণ তা অন্যান্য সদস্য দেশকেও জোট ছেড়ে বেরিয়ে যেতে উৎসাহিত করবে।