Share |

‘আবার জমবে মেলা বটতলা-হাটখোলা...’

মোফাজ্জল করিম
মুক্তিযুদ্ধের সময়ের যে কালজয়ী গানগুলো সীমাহীন দুঃখ ও অপার শঙ্কার মধ্যেও আমাদের অনুপ্রেরণা জোগাত, আশা জাগাত মনে, তেমনি একটি গানের একটি চরণের অংশবিশেষ ধার করে আজকের নিবন্ধটির নামকরণ করলাম ‘আবার জমবে মেলা বটতলা-হাটখোলা’। এমন অনেক গান আমাদের দারুণভাবে উদ্দীপ্ত করত একাত্তরে, সাহস জোগাত বাঁচার। পাঠক নিশ্চয়ই জানতে চাইবেন-আজকে হঠাৎ কী কারণে আমার মধ্যে কিসের উদ্দীপনা সঞ্চারিত হলো। বলছি শুনুন।
কোদালকে কোদাল বলতে অভ্যস্ত এই আমি গত বেশ কিছুদিন ধরে আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা ক্ষেত্রে উন্নয়নের কথা, এবং তার পেছনে কৃষক-শ্রমিক-গার্মেন্টকর্মী ও বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী অগণিত ‘আনঅনার্ড, আনসান্গ্’ নারী-পুরুষের রক্ত জল করা শ্রমের কথা গর্বের সঙ্গে বলে আসছি। এবং এটা আমি বলি আমার মধ্যে নিহিত এক গভীর বিশ্বাস থেকে। স্বাধীনতার পর থেকে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের এই দেশের এঁটেল মাটির পাঁকের মধ্যে মাঝে মাঝেই দেবে যাওয়া অর্থনীতির শকটটিকে এরাই অহর্নিশ কাঁধ দিয়ে ঠেলে তোলে, যখন আমরা অনেকেই শুচিতা রক্ষা করে দূরে দাঁড়িয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসি। আর শকটটি যেই একটু হেলেদুলে চলার উপক্রম করে, অমনি আমরা একে সচল করার সবটুকু কৃতিত্ব নিজেরা দাবি করতে শুরু করি। শুধু এতে থেমে থাকলেও আপত্তি ছিল না, একে পুঁজি করে, দেশের মালিক-মোখতার সেজে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী করা, অথবা ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করার লড়াই বাধিয়ে জনজীবন দুর্বিষহ করা যেন আমাদের বিধিলিপি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটাই নাকি রাজনীতি! এবং এই রাজনীতি নাকি করা হয় দেশের আপামর মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য। আরো খোলাসা করে বলা যায়, জনসেবা করার নাম নিয়ে, কিছু কিছু জনবিচ্ছিন্ন মানুষ শুধু ক্ষমতা লাভের উদ্দেশ্যে অশ্বারূঢ় গজারূঢ় হয়ে লড়াই করেন ময়দানে, আর তাদের বাহনগুলোর তলায় পড়ে চিঁড়েচ্যাপ্টা হয় মনুষ্যরূপী উলু-খাগড়া ও পোকা-মাকড়রা, যাদের জীবন থেকে নির্বাসিত হয় সুখ-শান্তি-স্বস্তি।
এরই ভেতর শাওয়ালের চাঁদের মত তাদের জীবনাকাশে উদিত হয় যাবজ্জীবন নির্বাসন থেকে প্যারোলে মুক্তি পাওয়া কয়েদির মত নির্বাচন। তাকে পেয়ে আনন্দে মেতে ওঠে সুখ-শান্তি, আনন্দ-উল্লাস বিস্মৃতপ্রায় দেশবাসী। চার বছর আগে যে নির্বাচন তাদের স্বপ্ন দেখিয়েছিল অনাবিল সুখ-শান্তিতে পরিপূর্ণ এক জীবনের, সমৃদ্ধির সুবাতাস বইয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে নির্বাচন, চার বছর ফেরারি থাকার পর ঢক্কা-নিনাদে দশ-দিগন্ত কাঁপিয়ে সে আবার ফিরে আসে।
২০১৪ সালের অজস্র প্রশ্নের তীরবিদ্ধ এক ভোটারবিহীন নির্বাচনের পর আবার ফরমান জারি হয়েছে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আবার সাধারণ মানুষ কিছুদিন ধরে পথে-ঘাটে, হাটে-বাজারে, এমনকি বদনা হাতে শৌচাগারে যাওয়ার পথেও সালাম পেতে থাকবে অসাধারণ কিছু মানুষের, যাঁরা তাদের এবং তাদের বৌ-বাচ্চাদের, এমনকি বাড়ির দাসী-চাকর ও কুকুর-বিড়ালেরও কুশলাদি জানতে চাইবে বিনয়ে বৈষ্ণব হয়ে। আর ভোটের দিন? সেদিন তো সাধারণ মানুষটিও বাদশাহ নামদার। এক দিনের বাদশাহ! এই বাদশাহীটা সে উপভোগ করবে তারিয়ে তারিয়ে। তারপর? তারপর নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার পর যা হয় তা আমাদের সিলেট অঞ্চলের একটি প্রবাদ বাক্যে সুন্দরভাবে ব্যক্ত হয়েছে : ঘাট পারইলে খেওয়ানি আমার হালা (খেয়া পার হওয়ার পর খেয়ানৌকার মাঝি আমার শ্যালক)। তবুও মানুষ উল্লসিত হয় নির্বাচন আসছে শুনলে। আবার সে আশায় বুক বাঁধে, এবার যদি পোড়া কপালে একটু সুখের মুখ দেখা যায়। গতবার হয়নি, তাতে কী হয়েছে, গতবার হয়নি বলে যে এবারও হবে না এমন তো কোনো কথা নেই। অতএব, খাও-দাও ফুর্তি কর। অবশ্যই তেনাদের পয়সায়। ‘আহা, কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে’।
আর এই ভোটের সুবাদে দেশের হতদরিদ্র মানুষগুলোর হাতে যে দুটো কাঁচা পয়সা আসে জাতির গাঁটকাটাদের কাছ থেকে, সেই ‘উইন্ডফল ইনকাম’-টার জন্য আমি মোটেই বিচলিত নই। বরং এতে যদি লোকটির অরক্ষণীয়া কন্যাটির একটা সুগতি হয়, ক্ষয়কাশে ধুঁকতে ধুঁকতে মরণোন্মুখ স্ত্রীটির মুখে ওঠে এক ফোঁটা ওষুধ, কেনা যায় একটা হালের বলদ, তাহলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে কারো কোনো ক্ষতি হবে বলে মনে হয় না। হ্যাঁ, এই কৃষ্ণবর্ণের টাকার মালিককে যদি আপনারা শাস্তি দিতে চান দিন। কিন্তু তার সেই অর্থ যদি চিরবঞ্চিত গরিব-গুবরোর সামান্য উপকারে আসে তো মন্দ কী। এ তো গেল দরিদ্র অভাজনদের কথা, যাদের কাছে কিছু নগদপ্রাপ্তির চেয়ে বড় কিছু নেই। গ্রামে স্কুল হবে, না পদ্মা নদীর ওপর আরো দু-তিনটা সেতু হবে, নাকি দেশের সব শিক্ষিত বেকার যুবকের চাকরি হবে, তাতে তার কিছু যায় আসে না। তার জীবন মানে ‘অন্নচিন্তা চমৎকারা’। সে ভোট দিতে যাবে কেবল দুটো নগদ নারায়ণের জন্য। অবশ্য যদি আদৌ সে সুযোগ পায়। আর যদি কেউ বলে, ‘চাচা, আপনি আর কষ্ট করে ভোট দিতে গিয়ে কী করবেন, আপনার ভোট আমিই দিয়ে দেবো, চাচির ভোটও দেওয়ার ব্যবস্থা করব’, তা হলে তো বলার কিছু নেই। বলবে কী আবার। বলতে গেলে জানটাই হয়তো বাজে খরচ হয়ে যাবে।
আর ভোটের বাজারে কিছু বড় দাঁও মারার জন্য আরেক দল ওত পেতে থাকে। তারা চারটা বছর প্ল্যান-প্রোগ্রাম করেছে, দল গঠন করেছে, দলের সদস্যদের ট্রেনিং দিয়েছে, ছোটখাটো ‘অপারেশন’ করেছে। এভাবে প্রস্তুতি নিয়েছে জাতীয় নির্বাচন নামক এই বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টের। তারা কোন টিমের হয়ে খেলবে, কে তাদের ‘হায়ার’ করবে, তা নিয়ে দর কষাকষি মন কষাকষি করেছে গত কয়েক বছর। এখন টুর্নামেন্টের ফিকচার ঘোষণা হয়ে গেছে, আর বসে থাকার সময় নেই। এখন বিভিন্ন সভা-সমাবেশের আয়োজন করে, জয়-জিন্দাবাদ শ্লোগান দিয়ে গলা ফাটিয়ে, বিপক্ষ দলকে হুমকি-ধমকি, তাদের নেতাকর্মীদের মাঝে মাঝে গা-মালিশ করে, কখনো-সখনো পকেট থেকে ‘কালা মামু’ বের করে ভয়-ভীতি দেখিয়ে মাঠ দখলের লড়াইয়ে এগিয়ে থাকতে হবে। আর বসন্তকাল এলে যেমন গাছে গাছে পত্রপু?ের বর্ণাঢ্য সমারোহ দেখা যায়, শোনা যায় পাখপাখালির ডাক, কোকিলের কুহুধ্বনি, নির্বাচনের আগমনী-বার্তা ঘোষিত হওয়ার আগে থেকেই তেমনি শহর-বন্দর এমনকি হাট-বাজার ছেয়ে যায় রঙ-বেরঙের পোস্টারে-ব্যানারে। আর কোকিলের কুহুধ্বনির অভাব মেটায় কাংস্যবিনিন্দিত ধ্বনি দ্বারা কর্ণপটহে মুহুর্মুহু আঘাতকারী মানবসভ্যতার এক বিচিত্র আবিষ্কার মাইক্রোফোন নামক একটি যন্ত্র। এ যন্ত্রটি যখন রাতে-বিরেতে হঠাৎই পাড়ায়-মহল্লায় ‘ভাইসব’ বলে তার সদম্ভ উপস্থিতি ঘোষণা করে, তখন প্রথমেই মনে পড়ে নির্বাচন জাগ্রত দ্বারে। তবে এই যন্ত্রের উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে এর আবিষ্কর্তার মুণ্ডুপাত করেননি এমন বঙ্গসন্তান মেলা ভার। যা হোক, সব উপদ্রব-অত্যাচারের মধ্য দিয়ে রাজসিক আয়োজনে নির্বাচনের আগমনী বাঙালিজীবনে বয়ে আনে আনন্দের হিল্লোল। অভাব-অনটন ও নানাবিধ আতঙ্কের ভেতর জবুথবু সাধারণ মানুষ মেতে ওঠে ভোট উৎসবে। এমনিতে উৎসবপ্রিয় বলে সুনাম ও হুজুগে বলে অখ্যাতি আছে বাঙালির। তাদের ঘরে ঘরে ১২ মাসে ১৩ পার্বণ লেগে থাকুক-এটাই তারা চায়। এই দেশ তাই গানের দেশ প্রাণের দেশ। সেখানে বেঁচে থাকার হাজার সংগ্রামের পাশাপাশি যদি সংবৎসর কেবল খুন-জখম, গুম আর সড়ক দুর্ঘটনার খবরই সংবাদপত্রের পাতাজুড়ে ছাপা হতে থাকে, যদি পাড়ার মাস্তানের কবল থেকে কুমারী কন্যাসন্তানটিকে রক্ষা করার চিন্তায় চিন্তায় ঘুম হারাম হয়, তাহলে জীবন থেকে আনন্দ-উল্লাস তো হারিয়ে যাওয়ারই কথা। এরই ভেতর মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত বাঙালির নিরানন্দ সংসারে নির্বাচনী কোলাহল অবশ্যই এক ধরনের পুলক সঞ্চার করে। আর সবচেয়ে বড় আনন্দ বোধ করি ভোট দেওয়ার আনন্দ। দেশের সংবিধানে যে অধিকার দেশের কেষ্টবিষ্টুদের দেওয়া আছে, সেই একই অধিকার দেওয়া আছে ফকির-মিসকিন আতুর-ল্যাংড়া সবাইকে। বিশাল গাড়িতে চড়ে যে লাটসাহেব ভোট দিতে আসেন, তার যেমন মাত্র একটি ভোট, তেমনি হামাগুড়ি দিয়ে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে আসা লুলা ফকিরেরও ভোট একটিই। ভোটের বাক্সের সামনে দুজনের দামই এক। অতএব, এই অভাবনীয় সাম্যে গরিব-গুবরো মানুষটি খুশি হবে না কেন? সে যখন ভোটের আগে হঠাৎই একদিন একটা রঙিন জামা গায়ে দিয়ে হাট থেকে ফেরে, তখন তার বৌ চোখ কপালে তুলে এই বাহুল্য খরচের কারণ জানতে চাইলে সে রীতিমত একটা ভাব নিয়ে জবাব দেয় : এইটা আমি কিনতে যামু ক্যান? অমুক সাবের মাইনষে কামিজটা গছাইয়া দিছে। বলতে বলতে ভিক্ষার ঝুলি থেকে ততোধিক রঙচঙা একটা শাড়ি বের করে বলে, আর এইটা দিছে তুমারে। তারপর বহুদিন পর স্বামী-স্ত্রী ভুলে যাওয়া আকর্ণবিস্তৃত হাসিতে মুখ রাঙায়। আর দিগ্বিজয়ী বীরের মত ঠোঁট বাঁকিয়ে ভিক্ষুক স্বামীটি পকেট থেকে একটা পাঁচশ’ টাকার কড়কড়ে নোট বের করে বলে, হেরা এই টাকাটাও দিছে, দিয়া বলছে অমুক মার্কায় ভুট দিতে।... মাননীয় রাজনীতিক নেতৃবৃন্দ-সরকারি কর্তৃপক্ষ, দোহাই আপনাদের, আপনাদের কার্যকলাপ দ্বারা এই অনির্বচনীয় আনন্দ থেকে গরিব-দুঃখী মানুষগুলোকে বঞ্চিত করবেন না।
আমি জানি, পাঠকদের মধ্যে অনেকেই আমার কথা শুনে আঁতকে উঠছেন, ভাবছেন, আমি নির্বাচনে কালো টাকার ছড়াছড়িকে উৎসাহিত করছি। না, ভুল বুঝবেন না। আমি মোটেই কালো টাকা ধলো টাকার ছড়াছড়ির নির্বাচনের পক্ষে নই। বরং আমি মনে করি, আমাদের রাজনীতিকে দুর্নীতি যেভাবে গ্রাস করেছে, তার মূল কারণ হচ্ছে নির্বাচনে টাকার খেলা। নির্বাচন কমিশন আইন করে দিয়েছে, কোনো প্রার্থী নির্বাচনে সাকুল্যে ২৫ লাখ টাকার বেশি খরচ করতে পারবেন না। করলে কী শাস্তি হবে তাও বলা আছে নির্বাচনী বিধি-বিধানে। এও বলা আছে, নির্বাচন শেষ হওয়ার কত দিনের মধ্যে নির্বাচনী ব্যয়ের সত্যায়িত হিসাবপত্র কমিশনে জমা দিতে হবে। এখানে অনেকগুলো প্রশ্নের জবাব নির্বাচন কমিশন তথা কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। প্রথম প্রশ্ন : ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ের এই ঊর্ধ্বসীমা কি বাস্তবসম্মত? বিগত নির্বাচনগুলোতে (২০১৪ সালের ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচন বাদ দিয়ে) এই শর্ত পূরণ করে কয়জন প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন? দ্বিতীয়ত, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর প্রার্থীরা সবাই কি নির্দিষ্ট সময়সীমা বা তার পরেও নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবপত্র জমা দেন? না দিলে আজ পর্যন্ত কি কোনো বিধি লঙ্ঘনকারী প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? তৃতীয়ত, নির্বাচনে টাকা ছড়ানোর অভিযোগে কি কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে আইনত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? চতুর্থত, দৃশ্যত যেখানে ২৫ লাখ টাকার সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা অবাস্তব, সেখানে তা পুনর্র্নিধারণের কি কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে? আর যদি মনে করা হয়, ২৫ লাখ টাকাতেই নির্বাচন করা সম্ভব (আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, অনেক বাহুল্য খরচ ও টাকার খেলা বন্ধ করতে পারলে এই টাকাতে অবশ্যই নির্বাচন করা সম্ভব) তাহলে তা বাস্তবায়নের জন্য আদৌ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি?
এত সব প্রশ্নের অবতারণা করার কারণ হলো, রাজনীতিতে দুর্নীতি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার সূত্রপাত হয় সব ধরনের নির্বাচন থেকে। সেটা জাতীয় সংসদ, সিটি করপোরেশন বা ইউনিয়ন পরিষদ, যে কোনো নির্বাচনই হোক না কেন। বিষয়টি একটু ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে। যেমন-প্রার্থীরা মনে করেন নির্বাচনে জয়লাভ করলে প্রভাব-প্রতিপত্তি, মান-মর্যাদা সবই বৃদ্ধি পাবে। আর অর্থযোগ, বিনা শুল্কে গাড়ি পাওয়া, রাজধানীর আবাসিক এলাকায় প্লট পাওয়া ইত্যাদি ব্যাপার তো প্রচ্ছন্নভাবে হলেও আছেই।
অতএব, যে করেই হোক নির্বাচনে জিততে হবে। বাই মিনস ফেয়ার অর ফাউল। আর যে-কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করতে হলে প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিনিয়োগ বা ইনভেস্টমেন্ট করতে হবে। সেটা খেলার মাঠেই হোক আর রাজনৈতিক অঙ্গনেই হোক। এই বিনিয়োগ মেধা, শ্রম ও অর্থের বিনিয়োগ। শিরোপা জিততে হলে একটি ফুটবল বা ক্রিকেট দলের জন্য ভালো কোচ, লাগাতার উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও পর্যাপ্ত পারিতোষকের ব্যবস্থা করতে হবে। এর জন্য বিনিয়োগে কার্পণ্য করলে চলবে না। এর সঙ্গে তুলনা করা চলে শিল্প-কারখানা স্থাপন বা ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার। বিনিয়োগ করো বুদ্ধি-বিবেচনা খাটিয়ে, তবেই ঈল্পিত ফল লাভ সম্ভব হবে। এককথায়, ফেলো কড়ি, মাখো তেল। ব্যবসার মূল কথাই এটা। আর এটা ভালো বোঝেন আমাদের রাজনীতিবিদরা, যাঁদের আবার বেশির ভাগই ব্যবসায়ী (মহামান্য রাষ্ট্রপতি জনাব আবদুল হামিদ বেশ কিছুদিন আগে যথেষ্ট খেদের সঙ্গে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, জাতীয় সংসদের শতকরা ৬৭ না ৬৮ ভাগ সদস্যই এখন ব্যবসায়ী)। প্রার্থীরা যখন কোটি কোটি টাকা (কেউ কেউ বলেন, ক্ষেত্র বিশেষে এই অঙ্ক ৫০, ৬০ বা ১০০ কোটি টাকা। শুনেই গায়ে কাঁটা দেয়।) খরচ করে নির্বাচিত হন, তখন ব্যবসার নিয়মেই তাঁদের প্রথম লক্ষ্য থাকে, যে করে হোক বিনিয়োগকৃত অর্থ তুলে নেওয়া। তারপর সব ব্যবসাতে যেমন, এখানেও তেমনি আছে মুনাফার প্রশ্ন।
সেটা বিনিয়োগকৃত অর্থের ওপর ২০%, ৫০%, ১০০% হতে পারে। অতএব, যে দুর্নীতির বিষবৃক্ষের বীজ বপিত হয়েছিল নির্বাচনের আগে, তা পত্রপু?পল্লবে সুশোভিত হয়ে অচিরেই বিরাট মহীরুহের আকার ধারণ করবে এ আর বিচিত্র কী। আর পচা কাঁঠালের আশপাশে যেমন মক্ষিকারা ঝাঁকে ঝাঁকে জুটে যায়, তেমনি একজন ক্ষমতাশালী দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকের চতুপার্শে ভিড় জমায় চ্যালা-চামুণ্ডা ও ফন্দিবাজ আমলারা। তারপর কী হয়? তারপর যা হবার তাই হয়। এক কোটি টাকার সরকারি কাজটি দশ কোটি টাকায়ও শেষ হয় না। আর সব সেক্টরে সরকারের লাভের গুড় এই পিঁপড়ারা (বঙ্গবন্ধু এদের নাম দিয়েছিলেন চাটার দল) খেয়ে নেয়।
দুই.
এতক্ষণ যা বললাম তা সবই বাস্তবতা। আমাদের নির্বাচন মানেই হৈচৈ, দৌড়ঝাঁপ, সভা-সমাবেশ-গণ্ডগোল, পেশিশক্তির দৌরাত্ম্য, টাকা-পয়সার ছড়াছড়ি। সব কিছু মিলিয়ে একধরনের উদ্দামতা, উন্মাদনায় মেতে ওঠে দেশ।  
এমন একটি মেলোড্রামা শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর সব অনুন্নত, স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশেই কমবেশি মঞ্চস্থ হয়ে থাকে। দাঙ্গা-হাঙ্গামা, রক্তপাতও হয়ে থাকে এ ধরনের সব দেশে। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যে সূক্ষ্ম-স্থূল কারচুপির ঘটনা এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশেও ঘটতে শোনা যাচ্ছে। তার পরও মানুষ নির্বাচনমুখী। সব দেশেই মানুষ চায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের ভেতর দিয়ে দেশের শাসনভার গ্রহণ করুক কোনো একটি দল বা গোষ্ঠী।
আমরাও অবশ্যই তাই চাই। দেশের মানুষ ক দল ক্ষমতায় আসবে না খ দল আসবে, তাতে যতটা না আগ্রহী, তার চেয়ে বেশি আগ্রহী একটি অংশগ্রহণমূলক, অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে। দেশের সামনে এখন এটাই একমাত্র ইস্যু। কোন দল কী বলল, কে কী প্রতিশ্রুতি দিলেন, কে কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে আসর মাত করলেন, মানুষ এগুলোতে থোড়াই উৎসাহ দেখায়। সাধারণ মানুষ এক দলের প্রতি আরেক দলের বিষোদগার, আক্রমণাত্মক ও উসকানিমূলক বক্তব্য, পেশিশক্তির প্রদর্শন ও ব্যবহার-এগুলো দেখতে দেখতে অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। তারা চায় এগুলো শিকেয় তুলে সব রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন মিলে একটি সুষ্ঠু, সুন্দর নির্বাচনের জন্য অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখুক। আর এ জন্য নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে অবশ্যই নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে। ‘কিছু কিছু অনিয়ম তো হবেই, ওটা বন্ধ করা যাবে না’-এ ধরনের নেতিবাচক মনোভাব ঝেড়ে ফেলে বলতে হবে, ‘না, কোনো প্রকার অনিয়ম হতে দেওয়া হবে না। আইনভঙ্গকারী যেই হোক, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ সেই সঙ্গে সবার জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পক্ষপাতিত্ব করবে না প্রশাসন বা নির্বাচন কমিশন। তাদের মনে রাখতে হবে : জাস্টিস শুড নট অনলি বি ডান, ইট মাস্ট বি শোন টু হ্যাভ বিন ডান। ন্যায়বিচার শুধু করলেই হবে না, তা দেশবাসীর কাছে দৃশ্যমান হতে হবে।
এ সবই হচ্ছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ, যা দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করার ওপর নির্ভর করছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাফল্য। এতে ব্যর্থ হলে ২০১৪ সালের যে কলঙ্কতিলকের দিকে সারা বিশ্ব উঠতে-বসতে কখনো প্রত্যক্ষ, কখনো পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত করছে, তা মোছা যাবে না।
তিন.
এত সবের মধ্যেও আমরা আশাবাদী হতে চাই। যে জাতি নয় মাসের নজিরবিহীন রক্তক্ষয়ী অসম যুদ্ধে জয়লাভ করে দেশকে স্বাধীন করতে পেরেছে, যাদের কোটি কোটি অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত নর-নারী তাদের সনিষ্ঠ শ্রম দিয়ে, অবিমিশ্র সততা দিয়ে, দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে ধাবিত করতে পেরেছে, তারা একটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে পারবে না-এটা আমি বিশ্বাস করতে চাই না। আমি বিশ্বাস করি, নির্বাচন নয়, যেন সামনে আসছে পহেলা বৈশাখের মত একটি সর্বজনীন আনন্দমুখর উৎসব, যে উৎসবে এ দেশের ধনী-গরিব, উচ্চ-নীচ সব মানুষ সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে, ঝেড়ে ফেলে সব সঙ্কীর্ণতা-মলিনতা ও পশ্চাদমুখিতা দৃপ্ত পদভারে এগিয়ে যাবে সম্মুখপানে। অনেক ঝড়-ঝাপ্টার পর ‘আবার জমবে মেলা, বটতলা-হাটখোলা...।’
আর ওটাই হবে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা।  
লেখক : সাবেক সচিব, কবি