Share |

‘ওবিই’ খেতাব প্রাপ্তিতে জুলিয়ান ফ্রান্সিসকে অভিবাদন

উদয় শংকর দাশ
২০১২ সালে ‘ফ্রেন্ডস অফ লিবারেশন ওয়ার অনার’ সম্মাননা পাওয়ার পর জুলিয়ান ফ্রান্সিস এতোই অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন যে, তিনি তাঁর প্রতিক্রিয়ায় লিখেছিলেন, ‘এটা ছিল একটা বিরাট সম্মান। কারণ আমি জানি না, আর কোনো দেশ এভাবে কাউকে ধন্যবাদ জানিয়েছে কি না।’ ২০১৮ সাল ছিল একদিকে বড় চ্যালেঞ্জের অন্যদিকে অপ্রত্যাশিত কিছু প্রাপ্তির। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর প্রিয় কিছু কাজ সম্পন্ন করতে পারেননি। তবে ঢাকার কয়েকটা হাসপাতালে তাঁর সফল চিকিৎসার জন্য তিনি খুব কৃতজ্ঞ। জুলিয়ান ফ্রান্সিস যখন দক্ষিণ এশিয়ায় তাঁর পাঁচ দশকের উন্নয়ন ও ত্রাণকাজ তখন ২০১৮ সালের জুলাইয়ে তাকে দেয়া হলো বাংলাদেশের পূর্ণ নাগরিকত্ব। গণভবনে একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ হাতে তাকে নাগরিকত্ব সনদ প্রদান করেন। ঐ অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ লেবার এমপি  রুশনারা আলী ও বাংলাদেশে ব্রিটিশ হাইকমিশনার এ্যালিসন ব্লেক। ২০১৮ সালের শেষে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের নতুন বছরের সম্মাননা তালিকায় স্থান পান জুলিয়াস ফ্রান্সিস। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নে তাঁর অসাধারণ অবদানের জন্য তাকে‘ওবিই’ খেতাবে ভুষিত করা হয়। 
‘ওবিই’ খেতাবে ভুষিত হওয়ার খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়য় জুলিয়ান ফ্রান্সিস বলেন,‘আমি আজ যে অবস্থানে আছি, তা অনেক লোকের সংস্পর্শ ও প্রভাবের ফল-সেটা শুধু বাংলাদেশে নয়-আর এই সম্মাননা গ্রহণ করে আমি যাদের সঙ্গে দারিদ্র বিমোচনে কাজ করেছি তাদের জানাই বিশেষ ধন্যবাদ।’ 
আমি যখন তাঁকে অভিনন্দন জানাতে ফোন করি জুলিয়ান তাঁর স্বভাবসুলভ বিনয়ে আমাকে বললেন ‘আমি সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় ছিলাম, যা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। এই জন্য নিজেকে খুবই সৌভাগ্যবান মনে করি।’ 
১৯৮০‘র দশকে প্রথম বাংলাদেশে কাজ করতে আসার পর  জুলিয়ান বাংলাদেশকে তাঁর দেশ হিসাবে গ্রহণ করেন মনেপ্রাণে। কানাডার একটি সংস্থার জন্য কাজ শেষ করে যুক্তরাজ্যে ফিরে আসার পর তিনি আবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন ১৯৯৮ সালে এবং এর পর থেকে বাংলাদেশেই বসবাস করছেন।
তিনি প্রথমে কাজ করেন আন্তর্জাতিক রেডক্রসের জন্য। এরপর ছয় বছর তিনি ‘আদর্শ গ্রাম’ নামে বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রকল্পে কাজ করেন। ২০০৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ডিএফআইডি’র ইউকেএইড এবং অস্ট্রেলিয়ার একটি সংস্থার অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকারের আরেকটি প্রকল্প ‘র্চস্ লাইভলিহুড প্রোগ্রাম’ এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। 
বাংলাদেশের প্রতি তাঁর অনুরাগ ১৯৭১ সাল থেকে, যখন তিনি বাংলাদেশ থেকে ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী শরণার্থীদের জন্য যুক্তরাজ্যভিত্তিক দাতব্য প্রতিষ্ঠান অক্সফ্যাম পরিচালিত ত্রাণ তৎপরতার প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। জুলিয়ান তখন বিহারে অক্সফ্যামের একটি প্রকল্পে কাজ করতেন। সেসময় শুরু হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। জুলিয়ান বিহারে বসেই বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের অংশবিশেষ শুনছিলেন বিবিসি’তে।  অক্সফ্যাম কলকাতায় তাদের ত্রাণ তৎপরতার সমন্বয় অফিস স্থাপন করে এবং সেখানে এই তৎপরতার প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে তিনি কাজ শুরু করেন। এই তরুণ ইংরেজের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় সেখানে। আমিও অক্সফামের ঐ ত্রাণ তৎপরতায় যোগ দিই এবং নিজে শরণার্থী হয়ে এই কাজটাকে বড় চ্যালেঞ্জস হিসেবে নিয়েছিলাম। জুলিয়ান ছিলেন আমার বিশেষ অনুপ্রেরণাকারি। 
দাতব্য এবং উন্নয়ন কাজে জুলিয়ানের উৎসাহ ছোটবেলা থেকে। ইংল্যান্ডের একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা উইলিয়াম ফ্রান্সিস ১৯৭০ সালে পেয়েছিলেন সিবিই খেতাব। আর এখন ছেলে পেলেন ‘ওবিই’-অসাধারণ অর্জন। জুলিয়ানের মা উরসুলা তাঁর জীবনে বড় প্রভাব ফেলেন - এ কথা তিনি সবসময় স্বীকার করেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর ব্রিটেনে বড় হয়ে ওঠেন জুলিয়ান। তিনি দেখেন তাঁর মা অক্সফ্যামের ত্রাণ তৎপরতায় সাহায্যের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতেন। জুলিয়ান ও তাঁর বন্ধুরা ছোটবেলায় প্রতিবেশীদের গাড়ি ধুয়ে যে অর্থ পেতেন, তা দাতব্য কাজে দান করতেন।  এতো বছর বাংলাদেশে কাজ করার সুবাদে ঐ দেশের সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে একটা ভালো ধারণা হয়েছে। সেটা স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবন ধারণের বিভিন্ন প্রকল্পে বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে তাঁর কাজকে আরো সহজ করেছে। 
বাংলাদেশে তাঁর অসংখ্য সহকর্মী ও বন্ধুদের প্রতি জুলিয়ান তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাঁর অমায়িক আচরণের ফলে তিনি বাংলাদেশে সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর সহকর্মী ও বন্ধুদের সম্পর্কে জুলিয়ান বলেন, তারা আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন এবং সমাজে সুবিধাবঞ্চিত লোকদের জীবনমানের উন্নয়নে আমার চিন্তাধারা ও কাজে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন। 
আমরা এই অসাধারণ ব্যক্তিকে অভিবাদন জানাই। এবং তাঁর সুস্বাস্থ্য কামনা করি, যাকে বাংলাদেশে তাঁর সব কাজ তিনি আরো অনেক দিন অব্যাহত রাখতে পারেন।