Share |

টাওয়ার হ্যামলেটসের স্কুলে বাংলাভাষা রক্ষায় কমিউনিটিকে এগিয়ে আসতে হবে

গেল সপ্তাহে সাপ্তাহিক পত্রিকায় বিলেতবাসী বাঙালিদের জন্য একটি উদ্বেগজনক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ‘টাওয়ার হ্যামলেটস কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজ সার্ভিস বিলুপ্ত করে দেয়ার পরিকল্পনা’ শীর্ষক সংবাদটি এই উদ্বেগের কারণ। সংবাদে প্রকাশ ‘প্রায় তিনযুগ ধরে পরিচালিত টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজ সার্ভিস বিলুপ্ত করে দেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
সম্প্রতি স্থানীয় লেবার গ্রুপের সভায় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় বলে বাংলাদেশী টিচার্স এসোসিয়েশন ইউকের নেতৃবৃন্দ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। জানা গেছে, ১.২ দুই মিলিয়ন পাউন্ডের এই সার্ভিসের বাজেট ইতোমধ্যে কর্তন করে ৬শ হাজার পাউন্ডে নিয়ে আসা হয়েছে। উল্লেখিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত  হলে ৬শ হাজারের বাজেটও আর থাকছে না। আগামী ২/৩ বছরের মধ্যে এই বাজেট কেটে নিয়ে গোটা ল্যাঙ্গুয়েজ সার্ভিসকে বিলুপ্ত করে দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক নেতৃবৃন্দ।
ল্যাঙ্গুয়েজ সার্ভিস বিলুপ্ত হয়ে গেলে শতাধিক শিক্ষক চাকরি হারাবেন-এটা শংকার বিষয় হলেও, হাজারো শিক্ষার্থী কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজ শিক্ষা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হবেন-এ চিত্র সত্যিকার অর্থেই ভয়ংকর। শুধু তাই  নয়, এর ফলে কমিউনিটি সেবাদানকারি ৪৭টি স্থানীয় কমিউনিটি সেন্টারও বন্ধ হয়ে যাবে। এ সকল কমিউনিটি সেন্টার বাংলা ভাষা এবং বাঙালির সংস্কৃতি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে দীর্ঘদিন ধরে।  
এ ব্যাপারে  জরুরি করণীয় নির্ধারণে শিক্ষকরা স্থানীয় কমিউনিটি নেতৃবৃন্দকে নিয়ে গত ২১ ডিসেম্বর একটি সভার আয়োজন করেন। সভা আয়োজন অবশ্যই ইতিবাচক ঘটনা। কিন্তু শুধু শিক্ষকরা সোচ্চার হলে তেমন ফলোদয় হবে বলে মনে হয় না। কেননা, ব্রিটেনের স্কুলগুলোতে দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল হিসেবেই বাংলাভাষা পাঠের সুযোগ পেয়েছিলেন কমিউনিটির সন্তানরা।  
১৯৮২ সালে টাওয়ার হ্যামলেটস কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজ নামে এই সার্ভিস চালু হয়। কিন্তু ২০১৬ সালে আকস্মিকভাবে ১.২ মিলিয়ন পাউন্ডের এই তহবিল (ফান্ডিং) কেটে মাত্র ৬শ হাজার পাউন্ডে নিয়ে আসা হয়। এতে বাংলা ও অন্যান্য ভাষা শিক্ষার  সুযোগ থেকে কমিউনিটির ছেলেমেয়েরা বঞ্চিত হয়ে পড়ে। তহবিল কর্তনের কারণে টাওয়ার হ্যামলেটসের অধিকাংশ সেকেন্ডারি স্কুলে ইতোমধ্যে বাংলা ভাষা শিক্ষাদান বন্ধ হয়ে গেছে। জিসিএসই ও এ লেভেলেও বাংলা ভাষা শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে। এখন কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজ সার্ভিস সম্পুর্ণরূপে বিলুপ্ত করে দিলে গত তিন যুগ  থেকে চলে আসা প্রতিষ্ঠিত এবং অত্যন্ত সফল একটি কর্মসূচীকে বিলুপ্ত করা হবে।
 দু:খের বিষয়, অনেক ব্রিটিশ-বাঙালি কাউন্সিলর টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্বে থাকলেও, বাংলা ভাষা রক্ষার ব্যাপারে তাদের তেমন কোনো পদক্ষেপ  আমাদের চোখে পড়ে না।  
আমরা মনে করি, কাউন্সিলের এই অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। আর তার জন্য প্রয়োজন- ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক ও সংগঠকসহ সর্বস্তরের ব্রিটিশ বাংলাদেশীর সোচ্চার ভূমিকা। এ বিষয়টিকে  অত্যন্ত জরুরি মনে করেই সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা জানি, ভাষার মাধ্যমেই সংস্কৃতি টিকে থাকে, একটি জাতি টিকে থাকে। কমিউনিটির সন্তানদের বাংলাভাষা শিক্ষার সুযোগ তাদের মৌলিক অধিকারেরই অংশ। আমরা এও জানি, অধিকার কেউ কাউকে এমনি এমনি দেয় না। এ জন্য প্রয়োজন আন্দোলনের। সবাইকে মনে রাখতে হবে-ভাষা রক্ষার লড়াই বাঙালির শোনিত ধারায় দেদীপ্যমান, যার উজ্জ্বল ইতিহাসে রয়েছে দুনিয়া কাঁপানো।