Share |

বেলাল ভাইহীন এক বছর

হামিদ মোহাম্মদ
 লন্ডন, ২১ জানুয়ারি : সাপ্তাহিক পত্রিকা অফিসে কাজের ফাঁকে হৈ-চৈ, তর্ক-বিতর্ক আর তুমুল আড্ডা আজো নিয়মিত হচ্ছে। এই  আড্ডার  দীর্ঘদিনের  সাথী ছিলেন আমাদের প্রিয় বেলাল ভাই- শাহাব উদ্দিন আহমদ বেলাল। তাঁকে কেবল আড্ডার সাথী বললে পুরোটা বলা হয় না। তিনি ছিলেন আমাদের আড্ডার মধ্যমনি। ভাবতেই অবাক লাগছে- সেই প্রাণপ্রিয় বেলাল ভাইকে ছাড়া আমরা এক বছর কাটিয়ে দিয়েছি। দিন-তারিখ হিসাব করলে ২৬ জানুয়ারি বেলাল ভাই প্রয়াণের এক বছর পূর্ণ হবে।  
গত এক বছর বেলাল ভাইয়ের শারীরিক উপস্থিতি হয়তো ছিলো না। কিন্তু তাঁর উপস্থিতি আমার হৃদয়ে ছিল। প্রায় আড্ডার ফাঁকে কেউ না কেউ বলে উঠেন বেলাল ভাইয়ের কথা। এই লেখাটা যখন লিখছি তখন অনুজপ্রতীম তবারক বললো- সে নাকি বেলাল ভাইয়ের নম্বরটা এখনো তাঁর ফোন থেকে ডিলিট করেনি।  
আসলে সে ডিলিট করার সাহস করেনি। কিংবা তাঁর মন সায় দেয়নি বেলাল ভাইয়ের স্মৃতি মুছে ফেলতে। তবারুকের ওই কথার পর আমি নিজেও স্বরণ করলাম- আমি নিজেও বেলাল ভাইয়ের নম্বরটা রেখে দিয়েছি। বেলাল ভাই জার্নালিস্ট ফ্রেন্স নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলেছিলেন। সেই গ্রুপে এখনও টুং টাং করে ম্যাসেজ আসে। প্রতিবার শব্দের সাথে বেলাল ভাইয়ের অস্তিত্ব টের পাই।  
আড্ডা নিয়মিত হলেও, সেই হারজিতের ঝগড়াটা আর বাঁধে না,হুলস্থুল হয় না। যে আড্ডার  প্রাণ ছিলেন  তিনি, সে প্রাণ কি তাকে ছাড়া ফিরে আসে?
স্থানীয় বাংলা মিডিয়া অফিসগুলো তাঁর সরব উপস্থিতিতে হয়ে উঠতো প্রাণবন্ত। অনুজ মিডিয়াকর্মীদের প্রতি তাঁর পক্ষপাত, ভালোবাসা, পরামর্শদান ছিল অভাবনীয়। তাঁর কর্মনিষ্ঠা ছিল এমন, যা ঈর্ষণীয়ই বলা যায়। সেই  বেলাল ভাইকে আমরা কেউ অতিক্রম করতে পারিনি। তিনিই অতিক্রম করে চলে গেছেন-অন্যজগতে, তর্কের বাইরে।
লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২৭ জানয়ারি। শাহাব উদ্দিন  বেলাল  ক্লাবের নির্বাচন এলেই হয়ে উঠতেন কে জিতবেন- আর কে হারবেন তার যোগবিয়োগের ভাণ্ডার। তিনি  হিসেব নিকেশ করে দিতে  পারতেন জোতিষীর মত। এনিয়ে তিনি বাজিও ধরতেন। অবাক কাণ্ড হলো প্রায়ই সত্য হয়ে যেতো তাঁর হিসেব। বেলাল ভাই দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। মাসের অর্ধেক থাকতেন হাসপাতালে। বলতেন হাসপাতাল হলো তাঁর দ্বিতীয় বাড়ি। মশকারা করে বলতেন, তিনি ভাড়া তুলতে গেছেন সেখানে। জীবনকে এতটাই সহজভাবে নিতেন যে তিনি মনে করতেন নিজের হাসপাতালে যাওয়া-আসা নিয়ে হাস্যরস করতেন।  
তাঁর প্রয়াণের দুই সপ্তাহ আগে যখন তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়, তখন তাকে ফোনে কুশলাদি জিজ্ঞেস করতে গেলে আমাদের বলেন, বোধহয় আর বাঁচবো না রে। যে রুমে আনা হয়েছে এ রুম থেকে কেউ জীবিত বের হয় না। এরপরও মৃত্যু নিয়ে তাকে বিচলিত হতে দেখা যায়নি। সহকর্মী ও অনুজদের প্রতি তাঁর মায়ার কথা বলছিলাম। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ থেকে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের অন্যতম ভরসা। অনেককে অর্থ দিয়েও সহায়তা করেছেন। আইনি প্রণোদনা তো দিতেন অনেকটা অযাচিতভাবেই। কেউ যদি আইনি জটিলতায় ডিটেনশনের মত কোনো বিপদে পড়তেন তবে সেন্টার যত দূরেই হোক তিনি সান্তনা দিতে চলে যেতেন। প্রয়োজনে আইনি সহায়তা দিতেন। এরকম এক যাত্রায় তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিতসা নেন। এরপরও তিনি শঙ্কিত হননি।  
শাহাব উদ্দিন আহমদ বেলাল বিলেতে বর্ণবাদী আন্দোলনের  অন্যতম নেতা ছিলেন। তিনি ছিলেন টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাচিত কাউন্সিলর। শেখ বয়সে এসে লেখালেখিতে খুব বেশি মনযোগী হয়ে পড়েন। নিয়মিত কলাম লিখতেন। কমিউনিটির যে কোনো ইস্যুতে তিনি ছিলেন সরব। পরিচিত কাও বিপদ শুনলেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। অনেককে কাউন্সিলের ঘর পাইয়ে দিতে তিনি সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ছিলেন পরোপকারী এক বিরল ব্যক্তিত্ব। সমাজকর্মী হিসেবে তাঁর তুলনা হয় না। রাজনৈতিক হিসেবেও তাঁর ভুমিকা ঈর্ষণীয় ছিল। আশির দশকে যুক্তরাজ্য যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। এ সময় বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার যুক্তরাজ্যে নিরাপত্তা কাজে সতর্ক বেষ্টনী হিসেবে নিজেকে যুক্ত রাখেন।  
আমাদের সেই প্রিয় বেলাল ভাই ফিরে আসবেন না সত্য, কিন্তু আমরা তাঁকে ফিরে ফিরে স্মরণ করবো- কাজে, আড্ডায়, জীবনের কঠিন সময়ে বাঁকে। বেহেশতের সর্বোচ্চ আসনটাই বেলাল ভাইয়ের প্রাপ্য। নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তা তাঁকে সেখানেই রেখেছেন।