Share |

শ্রদ্ধায়-ভালবাসায় সৈয়দ আশরাফকে স্মরণ

লন্ডন, ২১ জানুয়ারি : আওয়ামী লীগ নেতা ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম স্মরণে লন্ডনে এক নাগরিক শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ২০ জানুয়ারি রোববার পূর্ব লন্ডনের ব্রাডি আর্ট সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই স্মরণসভায় কমিউনিটির সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধায়-ভালবাসায় সৈয়দ আশরাফ স্মরণ করেন। সৈয়দ আশরাফ বাংলাদেশের রাজনীতিক হলেও তাঁর শিক্ষা জীবন কাটে লন্ডনে। যুক্তরাজ্যের বাঙালি কমিউনিটির সাথে তাঁর যোগাযোগ ছিল অবিচ্ছেদ্য। গত ৩ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন আওয়ামী লীগের এই তুখোড় নেতা।  
লন্ডনের শোকসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিম। তিনি সৈয়দ আশরাফের মেয়ে রিমা ইসলামকে বাবার শূন্যস্থান পূরণে রিমাকে বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে রাজনীতির হাল ধরার আহবান জানান।  আলতাব আলী ফাউন্ডেশন ওই শোক সভার আয়োজন করে। ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান নূর উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আনসার আহমেদ উল্লার পরিচালনায় অনুষ্ঠিত এই নাগরিক স্মরণ সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন হাউস অব লর্ডসের সদস্য পলা মঞ্জিলা উদ্দিন, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের নির্বাহী মেয়র জন বিগস, যুক্তরাজ্য আওয়ামী  লীগের সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরীফ, লন্ডনের কমিউনিটি আন্দোলনে সৈয়দ আশরাফের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা এবং টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের সাবেক ডেপুটি লীডার রাজন উদ্দিন জালাল, গ্রেটার লন্ডন এসেম্বলীর সদস্য কাউন্সিলার উমেশ দেশাই, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের সাবেক লীডার হেলাল আব্বাস, সৈয়দ আশরাফের ভাই সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, মেয়ে রিমা ইসলাম, কমিউনিটি এক্টিভিষ্ট রাজু নাথন, লয়েড ঘি, আজাদ বখত চৌধুরী, রুহুল আমীন, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ নেতা নঈমুদ্দিন রিয়াজ, যুক্তরাজ্য শাখা ঘাতক, দালাল নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক জামাল খান এবং বঙ্গবন্ধু স্কুলের শিক্ষক আইলা উইলসন ও রোজি ওয়াকার প্রমুখ।  
সৈয়দ আশরাফকে সময়ের ব্যতিক্রমী রাজনীতিক উল্লেখ করে হাই কমিশনার মুনা তাসনিম বলেন, দৈহিক মৃত্যু হলেও এমন রাজনীতিকদের আদর্শ আমাদের বাঁচিয়ে রাখা উচিত। তিনি বলেন, সমাজের সুবিধা বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিলো সৈয়দ আশরাফের রাজনীতির লক্ষ্য। তাঁর লোকান্তরিত হওয়ার পর সেই সুবিধাবঞ্চিত মানুষ যেন নেতৃত্বহীন হয়ে না পড়ে সেদিক বিবেচনা করে হলেও আশরাফ কন্যা রিমার বাংলাদেশে ফিরে যাওয়া উচিত।  
মুনা তাসনিম বলেন, প্রয়াত সৈয়দ আশরাফ যে জনতার নেতা ছিলেন সেটি কিশোরগঞ্জে তাঁর নামাজে জানাজায় লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিই প্রমাণ করে।   ব্যারোনেস পলা উদ্দিন সৈয়দ আশরাফকে একজন প্রকৃত মানবপ্রেমিক রাজনীতিক হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, একটি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার কথা কখনও ভুলতে পারতেন না আশরাফ। আর তাই শুধু কোন একটি ভূখন্ড নয় মানবজাতির সুবিধা বঞ্চিত অংশের পক্ষেই তাঁর কণ্ঠ সব সময় উচ্চকিত ছিলো প্রতিটি ফোরামে। ব্যারোনেস উদ্দিন সৈয়দ আশরাফের পাশাপাশি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন আশরাফ পতœী শিলা ইসলামের কথাও।  
টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র জন বিগস বলেন, সমাজে সাম্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আশরাফ ছিলেন সামনের কাতারের একজন যোদ্ধা। তাঁর এই যুদ্ধ নির্দিষ্ট কোন ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ ছিলো।  লন্ডনে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি যেমন ছিলেন তাঁর কমিউনিটির পাশে, ঠিক নিজের জন্মমাটি বাংলাদেশের সুবিধা বঞ্চিত মানুষের পাশেও ছিলো তাঁর সরব উপস্থিতি। মেয়র বলেন, এত সাদামাটা, জৌলুসহীন ও আত্মপ্রচারবিমূখ জীবন ছিলো তাঁর যে, কমিউনিটি আন্দোলনে তাঁর সহযোদ্ধা হওয়ার পরও ১৯৯৪ সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্মলগ্ন ও রাজনীতিতে আশরাফের গৌরবোজ্জল পারিবারিক অবস্থান আমি জানতাম না।
টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের সাবেক ডেপুটি লীডার রাজন উদ্দিন জালাল বলেন, বর্তমান ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অফ কমন্সে প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন তিন বাঙালি নারী। এই যাত্রা শুরু হয়েছিলো সেই বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের পথ ধরেই। আর এই যাত্রায় আশরাফ ভাই আমাদের অন্যতম সংগঠক ও নেতা ছিলেন। অনেক বাঙালি কাউন্সিলার তৈরি করতেও তিনি প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখেন। বাঙালিদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের অন্যতম নেতা হওয়া স্বত্তেও আশরাফ ভাইয়ের মাঝে কেনোদিন ক্ষমতার লোভ দেখিনি।  
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরীফও সৈয়দ আশরাফকে স্মরণ করতে গিয়ে আবেগ প্রবণ হয়ে উঠেন। ৭৫ পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চারনেতার হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের আন্দোলনে তরুণ সহকর্মী সৈয়দ আশরাফের সক্রিয়তার কথা স্মরণ করেন তিনি।  
সভার সভাপতি নূর উদ্দিন আহমদ বলেন, ব্রিটেনের মূলধারায় বাঙালির ক্ষমতায়নের এক নেপথ্য নায়ক ছিলেন সৈয়দ আশরাফ। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, সোনার বাংলা গড়তে সোনার মানুষ চাই। আশরাফ ছিলেন সেই সোনার মানুষ। এই সোনার মানুষ চিনতে পেরেছিলেন বলেই বঙ্গবন্ধু কন্যা ১৯৯৪ সালে আশরাফকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।  
সভায় সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুতে শোকাভিভূত কমিউনিটির সর্বস্তরের মানুষের স্বাক্ষর সম্বলিত একটি শোক বই হস্তান্তর করা হয় আশরাফ কন্যা রিমা ইসলাম ও তাঁর পরিবারের হাতে। মাওলানা শফিকুর রহমান বিপ্লবী সৈয়দ আশরাফের রুহের মাগফেরাত কামনা করে দোয়া পরিচালনা করেন।