Share |

শাপলা বিল : হাওরে সূর্যোদয়!

মুনিরা পারভীন
 সত্যিই মনোমুগ্ধকর ছিলো সেদিনের সূর্যদয়। অন্যরকম ভালো লাগা আর উচ্ছ্বাসে ভরা ছিলো ডিসেম্বরের চব্বিশ তারিখের প্রথম প্রহরটি। পুব আকাশে রক্তিম আভা ছড়ানো সূর্যটি যখন উদিত হচ্ছিল, তার সাথে সাথে যেন আবির রাঙা হচ্ছিল মন। রবির প্রথম আলোটি লাল রঙের শিশির ভেজা শাপলায় যখন ঠিকরে পরে চিক  চিক করছিলো, অদ্ভুত এক ভালোলাগা আন্দোলিত করছিলো অন্তরকে। সিলেটের সীমান্তঘেষা ডিবিরহাওর যেনও বাংলার অপরূপ রূপ নিয়ে সেদিন হাজির হয়েছিল আমার সামনে। এই হাওরের শাপলার বিলের কথা শুনে শুনে যে ভালোলাগা তৈরি হয়েছিল সেটাই সেদিন লাভ করে পরিপূর্ণতা। ইচ্ছের বাস্তবায়নে অনুরণিত হতে হতে অস্ফুট সুরে গেয়ে উঠি ‘আমার সোনার বাংলা। আমি তোমায় ভালোবাসি।’ অন্যরাও কণ্ঠ মেলান আমার সাথে। জাতীয় ফুলের রাজ্যে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের এই মনোমুগ্ধকর সকালটি চিরদিনের মতো তখনই গেঁথে গেছে অন্তরের অন্তস্থলে! আমরা যারা দূর প্রবাসে থাকি, জননী-জন্মভূমির প্রতি আমাদের আবেগ-উচ্ছ্বাসের মাত্রাটা একটু বেশিই বলা যায়। কারন ইচ্ছে হলেই আমরা ছুটে আসতে পারিনা স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোতে। রাখতে পারিনা মায়ের বুকে মাথা। এই অতৃপ্তি কি-যে বেদনার সেটা প্রবাসীমাত্রেই উপলব্ধি করেন মর্মে মর্মে। দেশের উন্নতি, অগ্রগতির খবরে আমরা অতিমাত্রায় উদ্বেলিত হই। তখন আনন্দাশ্রু আমাদেরকে আপ্লুত করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে ভালো- মন্দের খবর এখন মুহুর্তেই পাওয়া যায়। তাই দেশের সাথে এখন সেই অর্থে তেমন একটা দূরত্ব নেই কারোরই! ব্যবধান যেটা সেটা অবস্থানগত। অন্য অনেক কিছুর মতো জৈন্তার সীমান্তবর্তী ডিবির হাওরও তাই আমার কাছে পরিচিত! ফেসবুকের কল্যাণে এই স্থানটার সৌন্দর্য্য দেখে দেখে শাপলার বিলের প্রতি অদ্ভুত এক ভালো লাগা তৈরি হয়। সিদ্বান্ত নেই, দেশে গেলে অবশ্যই প্রত্যক্ষ করবো  ডিবির হাওরের সৌন্দর্য্য। সিলেটে একক আবৃত্তি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন, ভাইয়ের বিয়ের নানা আনুষ্ঠানিকতা, স্বজনদের দাওয়াত সব মিলিয়ে মহাব্যস্ততায় কাটছিলো এবারের একেকেটি দিন। কিন্তু এই ব্যস্ততার মাঝেও প্রতিদিনই মনের মাঝে উকি দিচ্ছিল ডিবির হাওর। সমস্যা একটাই, যেতে হলে উঠতে হবে খুব ভোরে। অর্থাৎ সূর্য উঠার আগেই রওয়ানা হতে হবে। শহর সিলেট থেকে ডিবির হাওরের দুরত্ব চল্লিশ কিলোমিটার হওয়ায় এ ছাড়া অন্যকোন গত্যন্তর ছিলোনা। কারণ সূর্যের প্রখর তাপে গুটিয়ে যায় শাপলা, তাই সূর্যদয়ের সাথে সাথেই অবলোকন করতে হয় সৌন্দর্য্যরে এই লাল গালিচা। সুবিদবাজারে আমাদের বাসা থেকে তাই রাত পোহাবার আগেই সেদিন রওয়ানা হতে হয়। জৈন্তাযাত্রায় আমার সঙ্গী হন খালা সাবিনা সুলতানা, মামা রুমেল আজিজ, ছোটো বোন নাদিরা পারভীন চমন, ভগ্নিপতি জসিম উদ্দিন আরমান এবং আত্মজা আফরা খন্দকার নিধি। কনকনে শীত আর কুয়াশার চাদর ভেদ করে আমাদের মাইক্রোবাসটি এগিয়ে চলে জৈন্তার উদ্দেশ্যে। শীতের শিহরণ উবে যায় বহুল প্রত্যাশিত শাপলার রাজ্যে হারিয়ে যাওয়ার উন্মাদনায়। শিক্ষাজীবনের স্মৃতিজিড়িত এমসি কলেজকে বামপাশে রেখে এগিয়ে চলে আমাদের গাড়ী। মেয়ে নিধিকে যখন মুরারী চাঁদ কলেজটি দেখিয়ে বলছিলাম, এটাই তোমার মায়ের কলেজ, এখান থেকেই অনার্স কমপ্লিট করেছি আমি তখন অদ্ভুত এক আত্মশ্লাঘা অনুভব করি। ফিরে যাই সেইসব দিনগুলোতে, হয়ে পড়ি স্মৃতিকাতর। সেই ঘোর কাটে ডিবির হাওরের রাস্তা ফেলে কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার কারনে রুমেল মামা আর ড্রাইভারের কথোপকথনে। ভুলবশত ডিবিরহাওরের রাস্তাটি প্রায় ১ কিলোমিটার পেছনে ফেলে এগিয়ে যাই আমরা। পিছনে ফিরে, মূল সড়ক থেকে যখন কাঁচা রাস্তা ধরে এগুতে থাকি হাওরের রাস্তায়, গ্রামীন জনপদে তখনও শুরু হয়নি ভোরের ব্যস্ততা। আমাদের অনুমান ছিলো, আমরাই এদিন সকলের আগে পৌছাবো শাপলার বিলে। কিন্তু না, গাড়ি থেকে নেমে আরও অনেক ভ্রমনপিপাসুর উপস্থিতি দেখে চনমনে হয়ে উঠে মন। চোখ জুড়িয়ে যায় শাপলাময়তায়। এত এত শাপলা। তাও আবার লাল। সূর্যের রক্তিম আভাও যেন ঔজ্জ্বল্য হারাচ্ছে শাপলার রাজ্যে! পরম এক আত্মতৃপ্তি তখন আন্দোলিত করে মনকে। এর আগে একসাথে এত শাপলা দেখা হয়নি কখনো। নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমি যেন ভাসছিলাম হাওয়ায়। খানিকটা পায়ে হেটে পৌঁছাই বিলের ঘাটে। পুরো বিল ঘুরে দেখতে এখান থেকেই ভাড়া নিতে হয় নৌকা। মাঝিদের সাথে আলাপ করে জানা গেলো, চল্লিশ মিনিটে ঘুরে দেখা যায় বিলটি। এজন্য নাবিককে দিতে হয় তিনশ থেকে সাড়ে তিনশ টাকা। আলোচনা সাপেক্ষে একটি নৌকা ভাড়া করি আমরা। আমাদের নিয়ে নৌকাটি শাপলার মাঝ দিয়ে এগিয়ে চলে। নৌকার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর পাখির কলরব যেন সংগীতময়তায় স্বাগত জানায় আমাদের। নানান আকার শাপলা ভাসছে বিলের জলে, সেগুলোকে যখন স্পর্শ করে দেখছিলাম তখন সমস্ত শরীর জুড়ে অদ্ভুত এক ভালোলাগা তৈরি হয়, তা ভাষায় প্রকাশ করার নয়। এ আবেগ, এ উচ্ছ্বাস শব্দ দিয়ে বর্ণনা করা সত্যিই কঠিন।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী চারটি বিলের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে ডিবির হাওর। শীতের আগমনের সাথে সাথেই ফুলে ফুলে পরিপূর্ণ হয়ে উঠে এই হাওরটি। প্রকৃতি যেন আপন মনের মাধুরি দিয়ে নান্দনিকতায় সাজিয়ে তুলেছে হাওরটিকে। শাপলার রাজ্যকে হঠাৎ দেখলে মনে হবে এ যেন প্রকৃতির লাল গালিচা। যেখানে বাতাসের সাথে দোল খায় অফুরাণ সৌন্দর্য্য। খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড়ের পাদদেশে এই হাওরের অবস্থান হওয়ার কারনে মোহনীয় হয়ে আছে এর চারপাশ। পাহাড়ের পাশ ঘেষে রয়েছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী খাসিয়া সম্প্রদায়ের আবাস। খাসিয়াদের পান-সুপারির বাগান দূর থেকে দেখলে মনে হবে, শিল্পীর তুলিতে আঁকা নকশিকাঁথার মাঠ।
সীমান্তের এই এলাকাটিকে আরও একটি কারনে নান্দনিক মনে হয়, সেটি হলো দূর থেকে দেখলে মনে হবে আকাশের গায়ে বোধহয় হেলান দিয়েছে পাহাড়। হাওরে দেশীয় মাছের দৌড়াদৌড়ি কিংবা পানকৌড়ির জলকেলী ভ্রমনার্থী মাত্রেই মুগ্ধ করে। সবমিলিয়ে সৌন্দর্য্যরে এক ব্যতিক্রমী পশরা সাজিয়ে মুগ্ধতার আবেশ ছড়াচ্ছে ডিবির হাওর।
বাংলার প্রকৃতির এমন রূপ মাধুর্য্যে বিমোহিত হয়েই কবি লিখেছিলেন, ‘ধন, ধান্য পুস্পভরা, আমাদেরই বসুন্ধরা। এমন দেশটি কোথাও খোঁজে পাবেনাকো তুমি/সকল দেশের রাণী সেযে আমার জন্মভূমি...।’ সত্যিই ফুলে ভরা আমাদের দেশ। এত এত ফুল। ঋতুবৈচিত্রের সাথে সাথে প্রকৃতি হরেক ফুলের ডালি নিয়ে হাজির হয়। গন্ধ ছড়ায়। শাপলায় সেই রকম যদিও গন্ধ নেই, তবে তার আছে আবিষ্ট করার সক্ষমতা; আছে সন্মোহনের শক্তি। সেটাই যেন আমার মেয়েকে আকৃষ্ট করলো। যে বাংলার আলো বাতাসে বড় হয়নি ,সেই নিধি যখন নৌকাতে বসে শাপলা ফুল স্পর্শ করে আবেগপ্রবহন হয়ে উঠে তখন রক্তের উত্তারাধিকারের যথার্থতা উপলব্ধি করি। মনের অজান্তেই ডিবির হাওরে গড়িয়ে পড়ে কয়েক ফোটা অশ্রু। উপলব্দি করি জাতীয় ফুলের শক্তি। দুই হাতের মাঝে শাপলা নিয়ে ছবি ওঠার মুহূর্তে আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে নিধি যখন ‘ওয়াও’ বলে ওঠে তখন মনে হয়, স্বার্থক হলো আমার এই আগমন।
পুরো বিল ঘুরে দেখার পর ঘাটের উদ্দেশ্যে নৌকা নিয়ে রওয়ানা হয় মাঝি। খালা সাবিনা সুলতানা এই মুহূর্তটিকে আরও উপভোগ্য করে তোলেন, তাঁর নৌকা ডুবানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টায় প্রথমে আতংক ছড়ালেও ছন্দপতন ঘটায় ফিরে আসার বিষন্নতায়। নৌকাটি যখন মাঝি রাস্তার পাশে এনে হাওর ঘুরে দেখার ইতি টানে তখন অমোঘ এক কষ্টে হাহাকার করে উঠে বুক। থেকে যেতে ইচ্ছে করে, ইচ্ছে করে বিলের স্ফটিক জলে পা ভেজাতে, বিলের জলে নাইতে। বেলা বাড়তে থাকে। রোদের তীব্রতায় ঘর্মাক্ত হয় শরীর। ভাড়া মিটিয়ে গাড়ীতে উঠি। ফিরে আসার সময়, বার বার মনে হচ্ছিল জীবনানন্দ দাশের সেই কবিতা। যেটি বহুবার বহু অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করেছি আমি। কিন্তু আজ যেনও সেটা ভিন্নভাবে আমার সামনে উপস্থিত। ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাইনা আর...।’ সত্যিই সুন্দর আমার সোনার বাংলা। সত্যিই এমন দেশটি আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। হঠাৎই নিধির অনুরোধ, মা রূপশী বাংলাটা আবৃত্তি করোনা। চমকে উঠলাম। সে কি করে বুঝলো আমার মনের কথা। শুরু করলাম। পরপর আবৃত্তি করলাম দেশাত্ববোধক কয়েকটি কবিতা। শেষ করলাম জীবনান্দ দিয়েই। ‘আবার আসিবো ফিরে, ধানসিড়িটির তীরে এই বাংলায়...হয়তো মানুষ নয়, হয়তোবা শঙ্খচিল শালীখের বেশে।’ আবৃত্তি করতে করতে কখন যে ফিরে আসি শহর সিলেটে টেরই পাইনি। ফিরে এলেও মন পড়ে থাকে ডিবির হাওরে, শাপলার সৌন্দর্য্য, হাওরে সূর্যদয়ের এই স্মৃতি হৃদয়ে অমলীন থাকবে চিরকাল।