Share |

গায়েবি মামলার আসামীদের পরিচয় জাতিকে লজ্জা দিয়েছে

গত সপ্তাহের একটি ছোট্ট খবর কিন্তু অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। এ সংবাদটির ভেতরে বেদনা, অসহায়ত্ব এবং আস্থাহীনতার বিষয় প্রকট হয়ে ফুটে ওঠেছে। খবরটির মর্মবস্তু হলো-গায়েবি মামলার আসামীদের পরিচয়। গত সেপ্টেম্বর থেকে দেড় মাসে ৪ হাজার ১৮২টি গায়েবি মামলা, আসামী ৮৮ হাজার। বাংলাদেশে গত ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ সময়টিতে এতসব গায়েবি মামলার হিসাব। এতে ভেবে নিতে পারেন-অন্যসময় এর মাত্রা কতটুকু। নিশ্চয় এর অর্ধেক হবে। পুলিশের এসব নিয়মিত সাজানো  মামলা সারা বছরই চলে, কিন্তু অনেকের নজরেই আসে না।
এই গায়েবি মামলার চর্চা কিভাবে এবং কি উদ্দেশে চালু হলো, তা সকলেই জানেন। এসব মামলা হাস্যকর হয়ে ওঠে, যখন দেখা যায় পঙ্গু এবং ভিক্ষুকরা আসামী বা ষাটোর্ধ কোনো অশীতিপর বয়োবৃদ্ধ হতদরিদ্র ব্যক্তিরা এসব মামলার আসামী।
মামলার হয়রানিমূলক দিকটি আরো বেশি হৃদয়বিদারক। হাইকোর্ট পর্যন্ত দৌঁড়। সম্প্রতি দেখা গেছে-রাজধানীতে হাইকোর্টের অ্যানেক্স ভবনের সামনের বড় গাছগুলোর তলায় মানুষের ছোট ছোট জটলা। ময়মনসিংহের গৌরীপুর ও মুক্তাগাছা, নেত্রকোনার বারহাট্টা, সিলেটের গোয়াইনঘাট, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, যশোরের মনিরামপুর, সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ, ঢাকার উত্তরাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছেন তাঁরা। প্রতিটি জটলায় আর চায়ের টেবিলে আলোচনার বিষয় গায়েবি মামলা। তাঁরা সবাই আসামি; এসেছেন জামিন নিতে। কারো পরনে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি, কারও হাতে পোঁটলা; তাতে বিস্কুট, চিড়া-মুড়ি বা পানের ডিব্বা। কেউ বয়সের ভারে ন্যুব্জ, চুল-দাড়ি সাদা।
আমরা জেনেছি, সুনামগঞ্জের পঙ্গু তারা মিয়ার গত সপ্তাহে হাইকোর্টে জামিন নেয়ার বিষয়টি। এই খবরে আরো রয়েছে- যশোরের মনিরামপুরের শহীদুল্লাহ সরদার, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থেকে আসা আশি-ঊর্ধ্ব আমির হামজা, গোয়াইনঘাটের তাজিমুলের কথা। এসব তথাকথিত আসামী নাকি বিস্ফোরক দ্রব্যবহন বা পুলিশের উপর আক্রমণসহ নানা নাশকতায় জড়িত। 
অথচ যারা আসামী হয়েছেন তাদের নীরিহ পরিচয়ে যে কেউ হতবাক হবেন। এদের কেউ ভিক্ষুক, কেউ দিনমজুর, চাষি, কেউবা পাথরকোয়ারির শ্রমিক। পুলিশের প্রশংসাই করতে হয় এই জন্য যে, তারা দেড়মাসে ১৮২টি মামলা রজু করতে পেরেছেন, আর এতে আসামী হয়েছেন ৮৮ হাজার যারা নীরিহ ও হতদরিদ্র।
তাদের এতো বাছবিচার করার সময় কই? তারা তো রাষ্ট্রের কাজ করেন, রাষ্ট্রকে রক্ষা করা তাদের দায়িত্ব। রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে গিয়ে বেছে বেছে আসামী করা সম্ভব হয়নি। তাদের বক্তব্য উপর থেকে নির্দেশ এলেই এদের বাদ দেয়া হবে।  এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, গণহারে আসামী করার মনোভাবটি তাদের দায়িত্বের অংশ হয়ে দাঁিড়য়েছে। অসহায় নীরিহ মানুষকে হয়রানি করার পরও পুলিশের নির্বিকার উত্তর কত ভয়ানক এবং আত“রক্ষামূলক।
সব নাগরিকের ভরসার জায়গাটি হওয়ার কথা রাষ্ট্রের। আমরা চাই- রাষ্ট্রের পুলিশ রাষ্ট্রেরই হোক, যে বাহিনির শপথনামায় রয়েছে- সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষা ও শান্তিময় পরিবেশ সৃষ্টি- মানুষকে হয়রানি করা  নয়।